প্রায় দুই মাসের ইউরোপ সফর শেষ করে অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছেছেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় রকশিল্পী জেমস। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সংগীত পরিবেশনের পর এবার সিডনির মঞ্চে উঠতে যাচ্ছেন তিনি। সেখানে তাঁর সঙ্গে থাকছেন পশ্চিমবঙ্গের সংগীতশিল্পী এবং ফসিলস ব্যান্ডের ভোকালিস্ট রূপম ইসলাম। দুই বাংলার রক সংগীতের দুই প্রভাবশালী শিল্পীর এই মিলনকে ঘিরে ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ।
আজ সিডনির নরওয়েস্ট কনভেনশনে অনুষ্ঠিত হবে বিশেষ এই কনসার্ট। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, অনুষ্ঠানটির সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। ফলে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলা ভাষাভাষী শ্রোতাদের জন্য এটি হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত একটি সংগীতসন্ধ্যা।
বাংলাদেশের রক সংগীতে জেমসের অবস্থান দীর্ঘদিনের। তাঁর স্বতন্ত্র কণ্ঠ, পরিবেশনার ধরন এবং মঞ্চে উপস্থিতি তাঁকে দেশের সংগীতাঙ্গনে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। কয়েক দশকের ক্যারিয়ারে তিনি এমন একটি শ্রোতাগোষ্ঠী তৈরি করেছেন, যার মধ্যে একাধিক প্রজন্মের মানুষ রয়েছেন। ভক্তদের কাছে তিনি পরিচিত ‘গুরু’ নামে।
অন্যদিকে রূপম ইসলাম পশ্চিমবঙ্গের বাংলা রক সংগীতের অন্যতম পরিচিত মুখ। ফসিলস ব্যান্ডের মাধ্যমে তিনি বাংলা রকের একটি আলাদা শ্রোতাভিত্তি তৈরি করেছেন। তাঁর গানের ভাষা, কণ্ঠ এবং মঞ্চ পরিবেশনা তরুণ শ্রোতাদের মধ্যে বিশেষ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। দুই শিল্পীর সংগীতের ধরন আলাদা হলেও বাংলা রকের প্রতি তাঁদের নিজস্ব দায়বদ্ধতা ও শ্রোতাদের সঙ্গে সংযোগ তাঁদের একই সাংস্কৃতিক পরিসরে নিয়ে এসেছে।
জেমসের প্রতি রূপমের ব্যক্তিগত শ্রদ্ধার কথাও বহুবার প্রকাশ পেয়েছে। তিনি জেমসকে শুধু বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় শিল্পী হিসেবে দেখেন না, নিজের সংগীতজীবনে প্রভাব রাখা একজন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী হিসেবেও মূল্যায়ন করেন। ভক্তদের কাছে ‘গুরু’ হিসেবে পরিচিত জেমসকে রূপম ‘মহাগুরু’ বলেও সম্বোধন করেছেন।
সিডনির কনসার্টের আগে দুই শিল্পীর একটি ভিডিও কথোপকথনও প্রকাশ্যে এসেছে। সেখানে তাঁদের বেশ স্বচ্ছন্দ পরিবেশে কথা বলতে দেখা যায়। রূপম জানান, জেমসের সঙ্গে আবার একই মঞ্চ ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ তাঁর কাছে বিশেষ আনন্দের। কনসার্টের স্লোগান হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ‘জয় গুরু, জয় রক, আমার বাংলা।’
রূপমের কথায়, যে শিল্পীর সংগীত একটি প্রজন্মকে প্রভাবিত করেছে এবং বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জায়গা করে নিয়েছে, তাঁর সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করে নেওয়ার অভিজ্ঞতা সব সময়ই আলাদা। কথোপকথনের সময় জেমসও হাসিমুখে জানান, অনেক দিন পর রূপমের সঙ্গে তাঁর দেখা হচ্ছে।
এরপর দুজনের আলাপে উঠে আসে পুরোনো স্মৃতি। রূপম বাংলাদেশের একটি রক ফেস্টে জেমসের সঙ্গে পারফর্ম করার কথা মনে করেন। তবে অনুষ্ঠানটি ২০০৭ সালে হয়েছিল, নাকি ২০১১ সালে—এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে কিছুটা বিভ্রান্তি দেখা যায়। দীর্ঘ সময় পর আবার দেখা হওয়ার বিষয়টি নিয়ে জেমসও মজা করেন।
দুই শিল্পীর সাম্প্রতিক যৌথ মঞ্চের আরেকটি স্মৃতি রয়েছে ২০২৪ সালে। কলকাতার একটি কনসার্টে তাঁরা একসঙ্গে পারফর্ম করেছিলেন। তবে সে সময় তাঁদের দেখা ও কথাবার্তা ছিল তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত। সিডনির অনুষ্ঠান তাই তাঁদের জন্য আবারও কিছুটা দীর্ঘ সময় একসঙ্গে থাকার এবং সংগীতের মাধ্যমে দর্শকদের সামনে নিজেদের উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি করেছে।
আড্ডার একপর্যায়ে রূপম পুরোনো একটি মজার প্রতিশ্রুতির কথাও মনে করিয়ে দেন। বাংলাদেশে গেলে জেমস তাঁকে নিজের গাড়িতে করে ঢাকার বিভিন্ন জায়গা ঘুরিয়ে দেখানোর কথা বলেছিলেন। কিন্তু সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়িত হয়নি—হাসতে হাসতে বিষয়টি স্মরণ করেন রূপম। কথোপকথনের এই অংশে দুই শিল্পীর পারস্পরিক স্বাচ্ছন্দ্য ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের একটি সহজ ছবি ফুটে ওঠে।
কনসার্টের আগে আরও একটি আবেগঘন মুহূর্তের দেখা মেলে। রূপম ইসলাম জেমসের পা ছুঁয়ে তাঁর আশীর্বাদ নেন। শ্রদ্ধা প্রকাশের এই মুহূর্তটি দুই শিল্পীর সম্পর্কের সাংস্কৃতিক ও ব্যক্তিগত দিকটিকেও সামনে নিয়ে আসে।
সিডনির অনুষ্ঠানটি শুধু একটি কনসার্ট নয়, দুই বাংলার বাংলা রক সংগীতের দুই প্রজন্ম ও দুই ভৌগোলিক পরিসরের শিল্পীর মিলনও বটে। একদিকে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের রক আইকন জেমস, অন্যদিকে কলকাতার বাংলা রক আন্দোলনের পরিচিত মুখ রূপম ইসলাম। তাঁদের সংগীতযাত্রার পথ আলাদা হলেও বাংলা ভাষার গান তাঁদের একই শ্রোতামহলের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
প্রবাসে বসবাসরত বাঙালিদের জন্য এমন আয়োজনের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। দেশ ও ভৌগোলিক সীমার বাইরে থেকেও বাংলা গান, বিশেষ করে রক সংগীত, কীভাবে মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও আবেগের সঙ্গে যুক্ত থাকে—সিডনির এই আয়োজন তারই একটি উদাহরণ। সব টিকিট বিক্রি হয়ে যাওয়ার খবরও অনুষ্ঠানের প্রতি শ্রোতাদের আগ্রহের বিষয়টি স্পষ্ট করেছে।
এবার সিডনির মঞ্চে জেমস ও রূপম ইসলাম কীভাবে তাঁদের জনপ্রিয় গান এবং নিজস্ব পরিবেশনার মাধ্যমে দর্শকদের মাতিয়ে তোলেন, সেটিই দেখার অপেক্ষা। দুই শিল্পীর আগের সাক্ষাৎ ও যৌথ পরিবেশনার স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন এক অধ্যায়। আর সেই অধ্যায়ের সাক্ষী হতে প্রস্তুত সিডনির বাংলা ভাষাভাষী সংগীতপ্রেমীরা।















