কখনো কারাগারের অন্ধকারে মৃত্যুর প্রহর গোনা মানুষের হাহাকার, কখনো বঞ্চিত শ্রমিকের ক্ষোভ, আবার কখনো প্রেম, বিরহ, আশা ও হতাশার টানাপোড়েন—জেমসের ভরাট, কর্কশ অথচ মায়াময় কণ্ঠে এসব অনুভূতি যেন নতুন প্রাণ পায়। তাঁর গানের স্বর ও পরিবেশনভঙ্গি কয়েক দশক ধরে বাংলা সংগীতের শ্রোতাদের আলাদা এক আবেগের জগতে নিয়ে গেছে।
তাঁর কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি যেমন উঠে এসেছে, তেমনি উঠে এসেছে মানুষের ব্যক্তিগত জীবনসংগ্রাম ও অনুভূতির নানা রং। প্রেমিকের গোপন আকুলতা থেকে শুরু করে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস—জেমসের গানে বারবার ফিরে এসেছে জীবনের পরিচিত গল্প। ‘আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেবো—তুমি আমার’ কিংবা ‘মা’-এর মতো গান শ্রোতাদের কাছে শুধু সংগীত নয়, বরং ব্যক্তিগত স্মৃতি ও আবেগের অংশ হয়ে আছে।
ফারুক মাহফুজ আনাম জেমস—বাংলা রক সংগীতের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র নাম। ভক্তদের কাছে তিনি ‘গুরু’, আর তাঁর সংগীতজগতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ‘নগর বাউল’ পরিচয়। চার দশকের বেশি সময় ধরে তিনি বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের অন্যতম পরিচিত মুখ হিসেবে সক্রিয় রয়েছেন।
১৯৬৪ সালের ২ অক্টোবর নওগাঁয় জন্ম জেমসের। তাঁর বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে। বাবা মোজাম্মেল হক ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি জেমসের গভীর আগ্রহ ছিল। তবে সংগীতকে পেশা হিসেবে নেওয়ার সিদ্ধান্ত পরিবারের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য হয়নি।
জীবনের সেই সময়েই চট্টগ্রামের আজিজ বোর্ডিং তাঁর সংগীতজীবনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত হয়ে যায়। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে শুরু হয় তাঁর সংগীতের পথচলা। তারুণ্যের সেই সময়েই ব্যান্ড সংগীতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি এবং ফিলিংস ব্যান্ডের প্রধান কণ্ঠশিল্পী ও লিড গিটারিস্ট হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করেন।
১৯৮৭ সালে প্রকাশিত হয় ফিলিংসের প্রথম অ্যালবাম ‘স্টেশন রোড’। প্রচলিত সংগীতধারার বাইরে থাকা অ্যালবামটি সে সময় প্রত্যাশিত বাণিজ্যিক সাফল্য না পেলেও বাংলা রক সংগীতের বিকাশে এর আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। পরের বছর, ১৯৮৮ সালে, একক অ্যালবাম ‘অনন্যা’ প্রকাশের পর জেমসের জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে বাড়তে থাকে।
এরপর একে একে প্রকাশিত হয় ‘জেল থেকে বলছি’, ‘নগর বাউল’, ‘লেইস ফিতা লেইস’ ও ‘কালেকশন অব ফিলিংস’। এসব অ্যালবামের মাধ্যমে জেমসের কণ্ঠ হয়ে ওঠে এক প্রজন্মের তারুণ্য, প্রেম, দ্রোহ ও জীবনবোধের অন্যতম প্রকাশভঙ্গি।
একক শিল্পী হিসেবেও তাঁর সংগীতভান্ডার সমৃদ্ধ। ‘পালাবে কোথায়’, ‘দুঃখিনী দুঃখ করোনা’, ‘ঠিক আছে বন্ধু’, ‘আমি তোমাদেরই লোক’, ‘জনতা এক্সপ্রেস’, ‘তুফান’ ও ‘কাল যমুনা’সহ বিভিন্ন অ্যালবাম তাঁর দীর্ঘ সংগীতযাত্রার সাক্ষ্য বহন করে।
জেমসের বিশেষত্ব শুধু তাঁর কণ্ঠে নয়। গিটারনির্ভর পরিবেশনা, গানের আবেগ এবং মঞ্চে নিজস্ব উপস্থিতি—সব মিলিয়ে তিনি বাংলা রক সংগীতের জন্য আলাদা একটি ধারা তৈরি করেছেন। ‘বাংলাদেশ’, ‘মা’, ‘তারায় তারায় রটিয়ে দেবো’, ‘দুঃখিনী দুঃখ করোনা’, ‘দুষ্টু ছেলের দল’, ‘পাগলা হাওয়া’ ও ‘গুরু ঘর বানাইলা কী দিয়া’র মতো গান দীর্ঘ সময় ধরে শ্রোতাদের মুখে মুখে ফিরেছে।
বাংলাদেশের বাইরেও জেমসের কণ্ঠ পরিচিতি পেয়েছে। বলিউডের ‘গ্যাংস্টার’ চলচ্চিত্রের ‘বিগি বিগি’ গানটি তাঁকে ভারতের বিস্তৃত শ্রোতৃমহলে পরিচিত করে তোলে। পরবর্তী সময়ে ‘ওহ লামহে’ এবং ‘লাইফ ইন এ… মেট্রো’সহ আরও কয়েকটি হিন্দি চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠ শোনা যায়। এর ফলে বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের একজন শিল্পী হিসেবে তাঁর পরিচিতি দেশের সীমানার বাইরেও বিস্তৃত হয়।
চলচ্চিত্রের গানেও জেমস পেয়েছেন উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি। ‘দেশা: দ্য লিডার’ চলচ্চিত্রের ‘আশছে দেশা আশছে’ গানের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা পুরুষ প্লেব্যাক শিল্পীর সম্মান পান। পরে ‘সত্তা’ চলচ্চিত্রের গানেও একই বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। তাঁর ঝুলিতে রয়েছে মোট দুটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।
তবে পুরস্কার কিংবা জনপ্রিয়তার পরিসংখ্যান দিয়ে জেমসের সংগীতের প্রভাব পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা কঠিন। তাঁর গান একেক শ্রোতার কাছে একেক রকম অর্থ বহন করে। কারও কাছে তা প্রেমের স্মৃতি, কারও কাছে বিচ্ছেদের সঙ্গী, আবার কারও কাছে তা প্রতিবাদ ও তারুণ্যের প্রতীক। ‘মা’ কিংবা ‘বাবা, কতদিন’-এর মতো গান পরিবারের প্রতি ভালোবাসা ও আবেগকে সামনে নিয়ে আসে। অন্যদিকে তাঁর রকধর্মী গানগুলো দীর্ঘদিন ধরে তরুণদের মধ্যে আলাদা উচ্ছ্বাস তৈরি করেছে।
বাংলা রক সংগীতের দীর্ঘ ইতিহাসে জেমসের অবস্থান তৈরি হয়েছে তাঁর নিজস্ব কণ্ঠ, সংগীতচর্চা ও পরিবেশনভঙ্গির মধ্য দিয়ে। তাঁর গানে যেমন বিদ্রোহের সুর রয়েছে, তেমনি আছে বিষণ্নতা, প্রেম, স্মৃতি ও জীবনের প্রতি গভীর টান। এই বৈচিত্র্যই তাঁকে কয়েক প্রজন্মের শ্রোতার কাছে পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য করে রেখেছে।
আজ ২ অক্টোবর, জেমসের ৬২তম জন্মদিন। দীর্ঘ সংগীতজীবনে তিনি একাধিক প্রজন্মের শ্রোতার সঙ্গে তৈরি করেছেন স্থায়ী সম্পর্ক। ‘গুরু’ ও ‘নগর বাউল’ নামে যে পরিচয় তিনি অর্জন করেছেন, তা এখন বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংগীত সংস্কৃতিরই একটি পরিচিত অংশ।
জেমসের জন্মদিনে তাই ভক্তদের শুভেচ্ছার সঙ্গে ফিরে আসে তাঁর অসংখ্য গানের স্মৃতি। তাঁর ভরাট কণ্ঠ, গিটারের সুর এবং নিজস্ব পরিবেশনভঙ্গি আরও বহু বছর শ্রোতাদের সংগীতজগৎকে সমৃদ্ধ করুক—জন্মদিনে এটাই ভক্তদের প্রত্যাশা।
শুভ জন্মদিন, জেমস।
শুভ জন্মদিন, গুরু।
শুভ জন্মদিন, নগর বাউল।














