দেড় দশকেরও বেশি সময় পর আবার একই মঞ্চে উঠলেন বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের পরিচিত চার মুখ—সাইদুস সালেহীন খালেদ সুমন, ইব্রাহিম আহমেদ কমল, শিশির আহমেদ ও রাফা। একসময় অর্থহীনের ‘অসমাপ্ত ১’ অ্যালবামের আলোচিত লাইনআপের এই চার শিল্পীকে একসঙ্গে দেখার সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়েছেন পুরোনো শ্রোতাদের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের সংগীতপ্রেমীরাও।
ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে গত শুক্রবার রাতে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানটি ছিল রাফার নতুন অ্যালবাম ‘এত বোকা কেন তুমি’-এর প্রকাশনা ও শো। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে ঢাকা ব্রডকাস্ট। আয়োজনের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত হয়ে ওঠে অর্থহীনের পুরোনো লাইনআপের পুনর্মিলন। দীর্ঘ বিরতির পর চারজনকে পাশাপাশি মঞ্চে দেখে দর্শকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে উচ্ছ্বাস, আবেগ আর পুরোনো দিনের স্মৃতি।
ফরিদপুর থেকে এই অনুষ্ঠানে এসেছিলেন শ্রোতা রুশা খানম। তার প্রজন্মের অনেকেই অর্থহীনের সেই সময়ের চার সদস্যকে একসঙ্গে মঞ্চে দেখার সুযোগ পাননি। তাই প্রিয় শিল্পীদের একই মঞ্চে দেখে তাদের কণ্ঠে পুরোনো গান শোনার অভিজ্ঞতাকে তিনি বিশেষ বলে মনে করেন। তার কাছে এটি শুধু একটি কনসার্ট ছিল না, বরং বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়কে চোখের সামনে ফিরে পাওয়ার সুযোগ।
Table of Contents
‘অসমাপ্ত ১’ থেকে আলাদা পথ
২০০৩ সালে ‘ধ্রুবক’ অ্যালবাম প্রকাশের পর দীর্ঘ বিরতিতে যায় অর্থহীন। পাঁচ বছর পর, ২০০৮ সালে ‘অসমাপ্ত ১’ নিয়ে ফেরে ব্যান্ডটি। সেই সময়ের লাইনআপে ছিলেন সুমন, কমল, শিশির ও রাফা। অ্যালবামটি প্রকাশের পর অর্থহীনের গান নতুন করে শ্রোতাদের মধ্যে সাড়া ফেলে। চার শিল্পীর সম্মিলিত সংগীতচর্চাও তখন ব্যান্ডটির স্বতন্ত্র পরিচয়ের অন্যতম অংশ হয়ে ওঠে।
এরপর ‘অসমাপ্ত ২’ প্রকাশিত হলেও সময়ের সঙ্গে সদস্যদের পথ আলাদা হতে থাকে। সুমন অর্থহীনে থাকলেও কমল ও রাফা একপর্যায়ে ব্যান্ড ছাড়েন। শিশিরও ২০২৩ সালে অর্থহীন থেকে সরে গিয়েছিলেন। পরে চলতি বছর তিনি আবার ব্যান্ডে ফিরে আসেন।
বর্তমানে কমল ওয়ারফেজের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে রাফা নিজের নামে ‘অ্যাভয়েড রাফা’ ব্যান্ড গড়ে আলাদাভাবে সংগীতচর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে চার শিল্পীর নিজস্ব সংগীতযাত্রা অনেকটাই আলাদা হয়ে গেছে। এই কারণেই তাদের একই মঞ্চে ফেরার ঘটনা শ্রোতাদের কাছে এতটা তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০১২ সালের শুরুর দিকে সর্বশেষ চারজনকে একসঙ্গে মঞ্চে দেখা গিয়েছিল। এরপর পেরিয়ে গেছে এক যুগেরও বেশি সময়। দীর্ঘ এই ব্যবধানই এবারের পুনর্মিলনকে আরও আবেগঘন করে তুলেছে।
এক ঘণ্টার বেশি সময় পুরোনো গান
শুক্রবারের আয়োজনে এক ঘণ্টার বেশি সময় মঞ্চে ছিলেন চার শিল্পী। ‘অসমাপ্ত’, ‘আনমনে’ থেকে ‘অদ্ভুত সেই ছেলেটি’—একটির পর একটি পরিচিত গান পরিবেশন করেন তারা। শুধু শিল্পীরাই গান করেননি, অনেক সময় দর্শকদের কণ্ঠও মিশে গেছে গানের সঙ্গে।
সুমন বিভিন্ন সময় বলেছেন, অর্থহীনের গান গাওয়ার সময় অনেক ক্ষেত্রে শ্রোতারাই তার সঙ্গে কণ্ঠ মেলান। এবারের আয়োজন যেন সেই কথারই বাস্তব প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিল। গান শুরু হওয়ার পর দর্শকদের বড় একটি অংশকে শিল্পীদের সঙ্গে গলা মেলাতে দেখা যায়। পুরোনো শ্রোতাদের নস্টালজিয়ার পাশাপাশি তরুণদের উচ্ছ্বাসও ছিল চোখে পড়ার মতো।
এতে বোঝা গেছে, বহু বছর আগে প্রকাশিত গানগুলো শুধু সেই সময়ের শ্রোতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। নতুন প্রজন্মের শ্রোতারাও সেসব গান শুনছেন, মনে রাখছেন এবং সুযোগ পেলে শিল্পীদের সঙ্গে গাইছেন।
পুনর্মিলনের পরিকল্পনা রাফার
এই পুনর্মিলনের পেছনে মূল পরিকল্পনাটি ছিল রাফার। অর্থহীন ছাড়ার পর থেকেই তার মনে ছিল, একদিন যেন পুরোনো সহশিল্পীদের নিয়ে আবার মঞ্চে দাঁড়াতে পারেন। দীর্ঘদিন সেই ইচ্ছা বাস্তবায়িত হয়নি। পরে সময়ের সঙ্গে সেই স্বপ্ন আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
রাফা বিদেশি ব্যান্ডসংগীতের বিভিন্ন পুনর্মিলনের উদাহরণও সামনে রেখেছেন। পিংক ফ্লয়েডের ডেভিড গিলমোর ও রজার ওয়াটার্সের মতো শিল্পীরা ব্যান্ড থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার পরও বিভিন্ন সময়ে একসঙ্গে মঞ্চে উঠেছেন। তাদের ভক্তদের দীর্ঘ অপেক্ষা রাফাকে ভাবিয়েছে—বাংলাদেশেও কি এমন একটি পুনর্মিলন সম্ভব নয়?
২০১৫ সালে অর্থহীন ছাড়ার পর রাফা নিজের সংগীত নিয়ে আলাদা পথে এগিয়েছেন। অন্য সদস্যরাও নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু ২০২৩ সালের পর বিষয়টি নিয়ে তিনি নতুন করে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে শুরু করেন।
এর পেছনে ব্যক্তিগত একটি উপলব্ধিও কাজ করেছে। বাবাকে হারানোর পর জীবন নিয়ে তার ভাবনায় পরিবর্তন আসে। তখন তার মনে হয়েছে, কিছু স্বপ্ন ভবিষ্যতের জন্য রেখে দিলে সব সময় তা বাস্তবায়নের সুযোগ পাওয়া যায় না। সেই উপলব্ধি থেকেই পুরোনো সহশিল্পীদের সঙ্গে আবার মঞ্চে ওঠার পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেন তিনি।
‘এখন তো দর্শকেরা আমাদের আঙ্কেল বলে’
শুধু পুরোনো শ্রোতাদের জন্য নয়, নতুন প্রজন্মের সামনে সেই সময়ের গানগুলো তুলে ধরার ইচ্ছাও ছিল রাফার। তারা যখন এসব গান তৈরি করেছিলেন, তখন নিজেরাও ছিলেন তরুণ। এখন সেই গান শুনতে আসা অনেক দর্শকের কাছে তারা অন্য এক প্রজন্মের শিল্পী।
রাফার ভাষায়, এখনকার দর্শকেরা তাদের ‘আঙ্কেল’ বলে ফেলেছেন। সেই জায়গা থেকেই তার মনে হয়েছে, সময় থাকতে নতুন প্রজন্মের সামনে পুরোনো গানগুলো আবার করা দরকার। একসময় তারা কেমন ধরনের সংগীত করতেন, বর্তমান প্রজন্মের শ্রোতারা যেন সেটি সরাসরি মঞ্চে শুনতে পারেন—এটিই ছিল অন্যতম উদ্দেশ্য।
এই ভাবনার মধ্যে শুধু নস্টালজিয়া নয়, প্রজন্মের মধ্যে সংগীতের একটি সেতুবন্ধন তৈরির আকাঙ্ক্ষাও রয়েছে। পুরোনো গান নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছালে একটি ব্যান্ডের সংগীতজীবনের ধারাবাহিকতাও নতুন করে সামনে আসে।
শিশিরের কাছে ‘অন্য রকম’ অভিজ্ঞতা
অর্থহীনের বর্তমান সদস্য শিশির আহমেদের কাছেও এই পুনর্মিলন ছিল গভীর আবেগের। এত বছর পর একই লাইনআপের চারজন আবার মঞ্চে উঠবেন—এমন মুহূর্ত আসবে, তা তিনি নিজেও ভাবেননি বলে জানিয়েছেন।
পুরোনো গানগুলো আবার একসঙ্গে পরিবেশন করার সময় বহু বছরের স্মৃতি ফিরে আসে। শিল্পীদের মধ্যে যেমন আবেগ কাজ করেছে, দর্শকদের মধ্যেও একই অনুভূতি তিনি দেখতে পেয়েছেন। একজন সংগীতশিল্পী হিসেবে এত বছর পর পুরোনো সহশিল্পীদের সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করে নেওয়াকে জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন শিশির।
তবে ভবিষ্যতে চারজন আবার একসঙ্গে মঞ্চে উঠবেন কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। ফলে এবারের অনুষ্ঠানটি তার কাছে আরও মূল্যবান হয়ে উঠেছে। এত বছর ধরে পাশে থাকার জন্য শ্রোতা ও ভক্তদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তিনি।
আবার কি এক মঞ্চে দেখা যাবে চারজনকে?
পুনর্মিলনের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি কেবল একটি বিশেষ আয়োজন, নাকি ভবিষ্যতে আরও বড় কোনো পরিকল্পনার শুরু?
রাফা আপাতত কোনো নির্দিষ্ট ঘোষণা দেননি। তার মতে, কোনো বিষয় বারবার করা হলে তার বিশেষত্ব কমে যেতে পারে। একটি অপেক্ষা ও চাহিদা থাকা প্রয়োজন। এবারের আয়োজনের পর সেই চাহিদা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন তিনি। তাই ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে চারজনকে নিয়ে কিছু করার ইচ্ছা রয়েছে তার।
তবে সেটি কবে হবে কিংবা আদৌ নিয়মিত কোনো আয়োজনের রূপ নেবে কি না, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। আপাতত এবারের পুনর্মিলনের স্মৃতিই হয়ে থাকছে বড় প্রাপ্তি।
অনুষ্ঠানে রাফার নিজস্ব সংগীতজগতের শিল্পীরাও অংশ নেন। ‘চলো আরেকবার উড়ি’ গানটি তার সঙ্গে পরিবেশন করেন প্রীতম হাসান। আর ‘আমি আকাশ পাঠাব’ গানটিতে রাফার সঙ্গে যোগ দেন তার বড় ভাই সাদী মুক্তাফি।
দীর্ঘ বিরতির পর অর্থহীনের ‘অসমাপ্ত ১’ সময়ের চার সদস্যের এই ফিরে আসা তাই শুধু একটি রাতের সংগীত আয়োজন হয়ে থাকেনি। পুরোনো শ্রোতাদের জন্য এটি ছিল হারিয়ে যাওয়া এক সময়ের স্মৃতিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ, আর নতুন প্রজন্মের জন্য ছিল বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের একটি আলোচিত অধ্যায়ের শিল্পীদের সরাসরি দেখার অভিজ্ঞতা। মঞ্চে চারজনের উপস্থিতি যেন প্রমাণ করল—কিছু গান সময় পেরিয়ে গেলেও শ্রোতাদের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায় না।















