হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বিশাল ভুবনে কিছু রাগ আছে, যেগুলি শুধু সুর বা স্বরবন্ধ নয় — যেন সময়, প্রকৃতি, অনুভূতি ও দর্শনের প্রতিচ্ছবি। রাগ ‘মিয়া কি টোড়ি’ সেই বিরল ধারার একটি। এটি একদিকে যেমন দার্শনিক মনন এবং গভীরতা বহন করে, তেমনি অন্যদিকে অন্তর্মুখী সৌন্দর্য ও প্রভাতের পবিত্র উদ্ভাস প্রকাশ করে।
এই রাগটির নামের মধ্যেই জড়িয়ে আছে হিন্দুস্থানী সংগীতের সর্বজনস্বীকৃত মহারথী মিয়া তানসেন-এর নাম, যিনি সম্রাট আকবরের দরবারে সঙ্গীতকে পৌছেছিলেন দেবীয় উচ্চতায়। কথিত আছে, তিনি নিজের আবিষ্কৃত এই সুরবন্ধে ভোরের সেই মুহূর্তকে বন্দী করতে চেয়েছিলেন, যখন রাতের নিভৃততা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় সূর্যের প্রথম আলোয়। তাই এই রাগের ভেতর ঘুরে বেড়ায় গাঢ় বিষণ্ণতা, স্নিগ্ধতা এবং এক অনন্ত শান্তির আভা।
রাগটির মূল ঠাট টোড়ী, এর স্বরসংগঠনে কোমল মধ্যম, কোমল ঋষভ, কোমল গান্ধার, এবং কোমল ধৈবতের সূক্ষ্ম ব্যবহার একটি আধ্যাত্মিক সুরবুনোর সৃষ্টি করে। বাজনায় বা গানে, এই রাগ বাজানো হয় দিনের দ্বিতীয় প্রহরে, যখন সকালের আলো পুরোপুরি উদ্ভাসিত তবু এখনো তাতে বিকালের উত্তাপ মেশেনি।
“মিয়া কি টোড়ি” শুধুই একটি সংগীত রাগ নয়; এটি এক মানসিক অবস্থা, নিস্তব্ধ আত্মচিন্তার প্রতীক। ধৈবত, গান্ধার, এবং ঋষভ এই তিনটি স্বর যেন তার হৃদয়ের তিনটি স্তম্ভ। সুরকারের কাছে এটি সৃষ্টির শান্ত আধার, শ্রোতার জন্য আত্মার আরামের দোলাচল।
বাংলা সঙ্গীতজগতে ওস্তাদ আজাদ রহমান এই রাগে খেয়াল রচনা করে যা করেছেন, তা এক যুগান্তকারী প্রয়াস। তাঁর “তোমার নামে করিনু শুরু” বা “সোনার সূর্য এলো পুবের আকাশে”–র মতো খেয়ালগুলি এই রাগকে কণ্ঠসঙ্গীতে এমনভাবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে, যা বহু শিল্পীর জন্য আদর্শ হয়ে আছে।
তানসেনের স্মৃতিতে উৎসারিত এই রাগ আজও জীবন্ত—গুরুজন থেকে শিষ্যে, বাদন থেকে গানে প্রবাহিত হয়ে চলেছে শতাব্দী ধরে। “মিয়া কি টোড়ি” তাই কেবল ইতিহাসের নাম নয়, এটি এক চিরন্তন সকালের আলো—যা প্রতিটি রাগপ্রেমীর অন্তরে নতুনভাবে জন্ম নেয় প্রতিদিনের প্রভাতের সঙ্গে।
Table of Contents
রাগ মিয়া কি টোড়ির পরিচয়
ঠাট – টোড়ী জাতি – সম্পূর্ণ
বাদী – ধৈবত
সমবাদী – গান্ধার
স্বর– ঋষভ, গান্ধার, ধৈবত, কোমল মধ্যম, কড়ি বা তীব্র বর্জিত স্বর নেই।
আরোহণ – স জ্ঞ হ্ম প দ ন র্স
অবরোহণ – র্স ন দ প হ্ম জ্ঞ ঋ স
বিশিষ্ট স্বর সমাবেশ বা পকড় – দত্সা, জ্ঞাঋ, সা ক্ষাজ্ঞা, ঋজ্ঞা ঋসা।
সময় : দিনের দ্বিতীয় প্রহর।
টোড়ীতে পঞ্চমের প্রয়োগ খুবই কম। রাগের বৈশিষ্ট্য ঋ, জ্ঞ, দ, এই তিনটি স্বরের উপর নির্ভর করে। টোড়ীর কয়েকটি প্রকারভেদ আছে। টোড়ীর ক্ষেত্রে টোড়ী, শুদ্ধ টোড়ী, দরবারি টোডী অথবা মিয়াকী টোড়ী এই নামগুলি। প্রচলিত। উল্লেখিত রাগগুলিতে টোড়ী রাগের মূলরূপ বা ছায়া বজায় আছে। কি এছাড়াও টোড়ী নামে আরো কয়েকটি রাগ আছে, যেমন বিলাসখানী টোড়ী, দেশী টোড়ী, আশাবরী টোড়ী, গান্ধারী টোড়ী, জৌনপূরী টোড়ী, বাহাদুরী টোড়ী, লাচারী টোড়ী ইত্যাদি। শেষোক্ত টোড়ী রাগগুলিতে আসল টোড়ী রাগের রূপ পরিলক্ষিত হয় না।
এই রাগটি মিয়া তান সেন এর আবিস্কার বলে তার নামের সাথে মিলিয়েই নাম হয়েছে রাগ মিয়াকী টোড়ী, অর্থাৎ মিয়া তান সেন এর টোড়ী।
খেয়াল / রাগ মিয়াকী টোড়ী / বিলম্বিত একতাল
[ এই খেয়ালটি রচনা করেছেন – বিখ্যাত বাংলা খেয়াল রচয়িতা ওস্তাদ আজাদ রহমান ]
তোমার নামে করিনু শুরু
এ বিশ্ব ভুবন
তোমার দয়ায় দেখিলাম আঁখি মেলি
জুড়াইল প্রাণ।
আদি অনন্ত তুমি
তোমার চরণ চুমি
তব করুনায় কহিলাম কথা
গাহিলাম গান।
খেয়াল / রাগ মিয়াকী টোড়ী / ত্রিতাল
[ এই খেয়ালটি রচনা করেছেন – বিখ্যাত বাংলা খেয়াল রচয়িতা ওস্তাদ আজাদ রহমান ]
সোনার সূয্য এলো পুবের আকাশে
সোনালী ঠোটে মিটি মিটি হাসে
সুন্দর পবিত্র প্রভাতের লালিমা
মঙ্গলালোকে ধুয়ে যায় কালিমা ।
আনন্দ সুরভী দক্ষিণা বাতাসে।

বাংলা খেয়ালে ব্যবহৃত আকার মাত্রিক স্বরলিপি
১। স র গ ম প ধ ন – সপ্তক। খাদ-সপ্তকের চিহ্ন স্বরের নীচে হসম্ভ, যথা – পৃ ধৃ এবং উচ্চ সপ্তকের চিহ্ন স্বরের মাথায় রেফ, যথা, র্স, র্র।
২। কোমল র- ঋ, কোমল গ- জ্ঞ, কড়ির ম – ক্ষা, কোমল ধ এবং কোমল ন – ণ।
৩। একমাত্রা || অর্ধমাত্রা :। সিকিমাত্রা ০। দুইটি অর্ধমাত্রা, যথা – সরা। চারটি সিকিমাত্রা, যথা সরগমা। দুইটি সিকিমাত্রা, যথা – সর:। একটি সিকিমাত্রা, যথা স০। একটি অর্ধমাত্রা ও দুইটি সিকিমাত্রা মিলিয়ে একমাত্রা, যথা – স: গর:। একটি দেড়মাত্রা ও একটি অর্ধমায়া মিলিয়ে দুইমাত্রা, যথা : রাঃগ:।
৪। কোন আসল স্বরের পূর্বে যদি কোন নির্মেষকালস্থায়ী আনুষঙ্গিক স্বর একটু ছুঁয়ে যায় মাত্র, তা হলে সেই স্বরটি ক্ষুদ্র অক্ষরে আসল স্বরের বাম পার্শ্বে লিখতে হয়, যথারা রা আসল স্বরের পরে যদি কখনো অন্য স্বরের ঈষৎ বেশ লাগে তখন ঐ স্বর ক্ষুদ্র অক্ষরে দক্ষিণ পার্শ্বে লিখতে হয়, যথা রা”স”(আপারকেস “স”)।
৫। বিরামের চিহ্ন ও মাত্রাসমূহের চিহ্ন একই; হাইফেন বর্জিত হলে এবং স্বরাক্ষরের গায়ে সংলগ্ন না থাকলেই সেই মাত্রা, বিরামের মাত্রা বলে বুঝতে হবে। সুরের ক্ষণিক স্তব্ধতাকে বিরাম বলে।
৬। তাল বিভাগের চিহ্ন এক-একটি দাঁড়ি। সনে ও সম হতে তালের এক ফেরা হয়ে গেলে দাড়ির এরূপ একটি ‘দণ্ড’ চিহ্ন বসে। প্রায় প্রত্যেক কলির আরম্ভে এবং শেষে দুইটি দণ্ড বসে।
৭। মাত্রাসমষ্টি ভিন্ন ভিন্ন গুচ্ছে বিভক্ত, প্রত্যেক গুচ্ছের প্রথম মাত্রার শিরোদেশে ১, ২, ৩, ৪, ০ ইত্যাদি সংখ্যা বিভিন্ন তালাঙ্ক নির্দেশ করে। শূন্য-চিহ্ন (০) ফাঁক ও যে সংখ্যায় রেফ-চিহ্ন থাকে (১) তাহাতেই সম বুঝতে হবে।
৮। পুনরাবৃত্তির চিহ্ন ৎ: এই গুল্বফবন্ধনী; এবং পুনরাবৃত্তিকাল কতকগুলি স্বর বাদ দিয়ে যাবার চিহ্ন ( ) এই বক্ষ বন্ধনী, যথা —- – ৎসা রা (গা মা ) :। মা পা।
৯। পুনরাবৃত্তিকালে কোনো সুরের পরিবর্তন হলে, শিরোদেশে ক্ষ ঁ এই সরল বন্ধনী চিহ্নের মধ্যে পরিবর্তিত স্বরগুলো স্থাপিত হয়; যথা-ৎসা রা গা :। কলির শেষে যুগল দণ্ডের মধ্যে ও সব শেষে দুই প্রস্থ যুগল দণ্ডের মধ্যে [ ] এই সরল বন্ধনী থাকলে, যথা- I [ ] I ,[[ ], আস্থায়ীতে ফিরে পরিবর্তিত সুর গাইতে হয়।
১০। কোনো এক স্বর যখন আর-এক স্বরে বিশেষরূপে গড়িয়ে যায়, তখন স্বরের নিচে V এইরুপ মীড়-চিহ্ন থাকে; যথা —- নাV পা।
১১। যখন স্বরের নিচে গানের অক্ষর না থাকে, তখন সেই স্বর বা স্বরগুলির বাম পার্শ্বে হাইফেন (-) এইরূপ বসে এবং গানের পংক্তিতে শুণ্য (0) দেওয়া হয়; যথা-সানি। অথবা সা ব্রা-গা-মা।
একই স্বর পৃথক ঝোঁকে উচ্চারিত হলে সেই স্বরের বাম পার্শ্বেও হাইফেন বসে; যথা সারারা। অথবা সা সারা বাং নীচে গানের অক্ষর হরাস্ত না হলে উপরে স্বরের বাম পার্শ্বে হাইফেন বসে।
