কেউ কথা রাখেনি কবিতা । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় [ Keu Kotha Rakheni Poem] । Sunil Gangopadhyay

“কেউ কথা রাখেনি” কবিতা বাংলার আধুনিক কবিতার এক গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি। এই কবিতাটি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় রচিত, যিনি ছদ্মনাম হিসেবে “নীললোহিত”, “সনাতন পাঠক”, “নীল উপাধ্যায়” প্রভৃতি নাম ব্যবহার করেছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম বর্তমানে বাংলাদেশের মাদারীপুরে হলেও, মাত্র চার বছর বয়সে তিনি কলকাতায় চলে আসেন। তাঁর কবিতা পত্রিকা সম্পাদনার ক্ষেত্রেও বিশেষ অবদান আছে; ১৯৫৩ সাল থেকে তিনি ‘কৃত্তিবাস’ নামক একটি প্রখ্যাত কবিতা পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন, যা বাংলা কবিতার জগতে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। “কেউ কথা রাখেনি” কবিতায় জীবনের নানান অভিজ্ঞতা ও মানসিক টানাপোড়েনের সঙ্গে এক গভীর একাকীত্ব ও বেদনার ভাব ফুটে ওঠে, যা পাঠকের হৃদয়ে চিরস্থায়ী প্রভাব ফেলে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা সাধারণত বস্তুনিষ্ঠতা ও মানবিকতা নিয়ে গড়ে উঠেছে, যেখানে তিনি সাময়িক দুঃখ-দুর্দশার মধ্যেও এক অনন্য সাহস ও মনের গভীরতার সন্ধান দেন।

 

কেউ কথা রাখেনি কবিতা লিরিক্স [ Keu Kotha Rakheni Poem Lyrics ] । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় । Sunil Gangopadhyay।

কেউ কথা রাখেনি কবিতা লিরিক্স

কেউ কথা রাখেনি,
তেত্রিশ বছর কাটলো,
কেউ কথা রাখেনি।
ছেলেবেলায় এক বোষ্টুমি
তার আগমনী গান হঠাৎ থামিয়ে বলেছিল
শুক্লা দ্বাদশীর দিন অন্তরাটুকু শুনিয়ে যাবে।
তারপর কত চন্দ্রভুক অমাবস্যা চলে গেল
কিন্তু সেই বোষ্টুমী আর এলো না
পঁচিশ বছর প্রতীক্ষায় আছি।

মামা বাড়ির মাঝি নাদের আলি বলেছিল,
বড় হও দাদাঠাকুর,
তোমাকে আমি তিনপ্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাবো
সেখানে পদ্মফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমর খেলা করে।
নাদের আলি, আমি আর কত বড় হবো?
আমার মাথা এই ঘরের ছাদ ফুঁড়ে
আকাশ স্পর্শ করলে তারপর তুমি আমায়
তিন প্রহরের বিল দেখাবে?

একটাও রয়্যাল গুলি কিনতে পারি নি কখনো
লাঠি-লজেন্স দেখিয়ে দেখিয়ে চুষেছে
লস্করবাড়ির ছেলেরা।
ভিখারীর মতন চৌধুরীদের গেটে দাঁড়িয়ে দেখেছি
ভিতরে রাস-উৎসব,
অবিরল রঙের ধারার মধ্যে
সুবর্ণ কঙ্কণ-পরা ফর্সা রমণীরা
কত রকম আমোদে হেসেছে,
আমার দিকে তারা ফিরেও চায় নি,
বাবা আমার কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলেন,
দেখিস, একদিন আমরা ..

বাবা এখন অন্ধ,
আমাদের দেখা হয়নি কিছুই
সেই রয়্যাল গুলি, সেই লাঠি-লজেন্স,
সেই রাস-উৎসব
আমায় কেউ ফিরিয়ে দেবে না।

বুকের মধ্যে সুগন্ধি রুমাল রেখে বরুনা বলেছিল,
যেদিন আমায় সত্যিকারের ভালবাসবে
সেদিন আমার বুকেও এ রকম আতরের গন্ধ হবে।
ভালোবাসার জন্য আমি হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়েছি
দুরন্ত ষাঁড়ের চোখে বেঁধেছি লাল কাপড়,
বিশ্বসংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনেছি ১০৮টা নীলপদ্ম
তবু কথা রাখেনি বরুণা,
এখন তার বুকে শুধুই মাংসের গন্ধ
এখনো সে যেকোনো নারী।

কেউ কথা রাখেনি,
তেত্রিশ বছর কাটলো,
কেউ কথা রাখে না, কেউ কথা রাখেনা।

 

 

 

Leave a Comment