হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জগতে কিছু রাগ আছে যা তাদের গম্ভীর, বৈরাগ্যপূর্ণ এবং কিছুটা ব্যাকুল প্রকৃতির জন্য শ্রোতাদের মনে এক গভীর রেখাপাত করে। তেমনই একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী, রাজকীয় এবং তাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাগের নাম ‘রাগ মারবা’ (যা অনেকের কাছে মারোয়া নামেও পরিচিত)। এটি উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতির অন্যতম প্রধান ঠাট ‘মারবা ঠাট’-এর আশ্রয়ী বা জনক রাগ।
Table of Contents
রাগ মারবা: গোধূলি বেলার এক অনন্য, বৈরাগ্যপূর্ণ ও গম্ভীর সুরকাব্য
উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের আঙিনায় রাগ মারবা তার স্বর বিন্যাসের জন্য এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। এই রাগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—এর সুর-কাঠামোতে কোমল ঋষভ (ঋ) এবং তীব্র মধ্যম (হ্ম) ছাড়া বাকি সব স্বর শুদ্ধ রূপেই ব্যবহৃত হয়।
তবে এই রাগের চলন বেশ আঁকাবাঁকা বা বক্র। বিশেষ করে এর আরোহের সময় ঋষভ ও নিষাদ স্বর দুটি বক্রভাবে প্রয়োগ করা হয়। আরেকটি মজার বিষয় হলো, সাধারণত বহু রাগে ‘মীড়’ (এক স্বর থেকে অন্য স্বরে গড়িয়ে যাওয়া) ব্যবহার করে সুরের মাধুর্য বাড়ানো হলেও, রাগ মারবাতে মীড়ের কোনো ব্যবহার নেই।
‘পরমেল-প্রবেশক’ রাগ কী?
সঙ্গীতশাস্ত্রে মারবা রাগকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘পরমেল-প্রবেশক’ রাগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর কারণ হলো, এই রাগটি গাওয়ার বা বাজানোর পর খুব সহজেই ‘কল্যাণ ঠাট’-এর রাগগুলোতে প্রবেশ করা যায় বা সুরের রূপান্তর ঘটানো যায়। এই বিশেষ গুণটির জন্যই অনেকে একে পরমেল-প্রবেশক রাগ বলে ডাকেন।
রাগ মারবা-এর ব্যাকরণ ও পরিচিতি
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চিরাচরিত নিয়মানুযায়ী রাগ মারবার মূল কাঠামো ও প্রযুক্তিগত পরিচয় নিচে তুলে ধরা হলো:
- অন্য নাম: রাগ মারোয়া।
- ঠাটের পরিচয় (Thaat): রাগটি স্বনামধন্য মারবা ঠাটের অন্তর্গত।
- জাতি (Jati): এই রাগের জাতি হলো ষাড়ব-ষাড়ব। অর্থাৎ, এর আরোহণ এবং অবরোহণ—উভয় ক্ষেত্রেই পঞ্চম (পা) স্বরটি সম্পূর্ণ বর্জিত থাকে (৬টি করে স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- বাদী স্বর (Vadi Swar): এই রাগের প্রধান বা রাজা স্বর হলো কোমল ঋষভ (ঋ)।
- সমবাদী স্বর (Samvadi Swar): রাগের দ্বিতীয় প্রধান বা মন্ত্রী স্বর হলো ধৈবত (ধ)।
- পরিবেশনের সময় (Time): রাগ মারবা পরিবেশনের আদর্শ সময় হলো দিবা তৃতীয় প্রহর (বিকেলের শেষ ভাগ বা গোধূলি বেলা)। দিন শেষের এই ক্ষণে রাগের শান্ত ও বৈরাগ্যময় রূপটি প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে ওঠে।
আরোহণ, অবরোহণ ও পকড়
রাগের সেই বক্র গতি এবং পঞ্চম বর্জিত বিশেষ চলনটি স্বরলিপির মাধ্যমে বোঝার জন্য এর নিখুঁত রূপ নিচে দেওয়া হলো:
- আরোহণ: স ঋ, গ, হ্ম ধ, নধ, র্স
- অবরোহণ: র্স নধ, হ্ম, গ, ঋ স
- পকড়: ধ হ্ম গ ঋ, গ হ্ম গ, ঋ স
(নোট: এখানে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী ‘ঋ’ দিয়ে কোমল ঋষভ এবং ‘হ্ম’ দিয়ে তীব্র মধ্যমকে নির্দেশ করা হয়েছে।)
তথ্যসূত্র
এই রাগের ঐতিহাসিক ও শাস্ত্রীয় বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করতে প্রখ্যাত সঙ্গীত গবেষক শ্রীশচীন্দ্র নাথ ভট্টাচার্য্য রচিত এবং ‘এস, চন্দ্র এন্ড কোং’ কর্তৃক শারদীয়া সপ্তমী, সেপ্টেম্বর ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত ‘রাগ বিন্যাস’ (প্রথম কলি) গ্রন্থটির সহায়তা নেওয়া হয়েছে।
রাগ মারবা তার অদ্ভুত সুর-লহরীর মাধ্যমে মনের ভেতর এক ধরণের একাকীত্ব, উদাসীনতা অথচ গভীর আধ্যাত্মিক প্রশান্তি জাগিয়ে তোলে। বিকেলের শান্ত আলোয় এই রাগের বিস্তারের তুলনা মেলা ভার।
মারবা ঠাটের এই আদি ও রাজকীয় রাগটি নিয়ে আমাদের আজকের এই বিশেষ আয়োজনটি আপনার কেমন লাগল, তা আমাদের কমেন্ট করে জানাতে পারেন। ভালো লাগলে সঙ্গীতপ্রেমী বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
