হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জগতে যদি বর্ষা ঋতু, মেঘের গর্জন আর বৃষ্টির রিনিঝিনি নূপুরধ্বনিকে কোনো একটি রাগের মাধ্যমে সবচেয়ে সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলতে হয়, তবে সবার আগে যে নামটি আসবে তা হলো ‘রাগ মিয়াঁ কি মল্লার’। সঙ্গীতসম্রাট মিয়াঁ তানসেনের অমর কীর্তিগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম এক শ্রেষ্ঠ এবং রাজকীয় সৃষ্টি।
আপনার দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই কালজয়ী রাগটির পরিচয়, ব্যাকরণ ও বৈশিষ্ট্যগুলোকে আরও সমৃদ্ধ ও হিউম্যানাইজড করে নিচে সাজিয়ে দেওয়া হলো:
Table of Contents
রাগ মিয়া কি মল্লার বা মিঞা-মল্লার বা মিয়া কি মালহার বা মিয়া মালহার
আকাশে যখন কালো মেঘের ঘনঘটা, ঝোড়ো হাওয়া আর গুরুগম্ভীর মেঘ গর্জনের সাথে বৃষ্টি নামে, তখন প্রকৃতির সেই রূপকে সুরের ফ্রেমে বাঁধে ‘রাগ মিয়াঁ কি মল্লার’। এর নাম নিয়ে সঙ্গীতজ্ঞদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ থাকলেও, সিংহভাগ বিশেষজ্ঞই একমত যে মুঘল সম্রাট আকবরের রাজদরবারের প্রধান সঙ্গীতজ্ঞ মিয়াঁ তানসেন নিজেই এই রাগটি সৃষ্টি করেছিলেন। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আঙিনায় এটি বর্ষাকালের অন্যতম প্রধান রাগ হিসেবে স্বীকৃত এবং এর প্রকৃতি অত্যন্ত শান্ত ও গম্ভীর।
স্বরের কারুকাজ ও দুই নিষাদের খেলা
এই রাগের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর স্বর প্রয়োগের চাতুর্যে। মিয়াঁ কি মল্লারে উভয় নিষাদ (অর্থাৎ শুদ্ধ ‘ন’ এবং কোমল ‘ণ’) অত্যন্ত সুকৌশলে ব্যবহার করা হয়। তবে এর আরোহণের সময় একটি বিশেষ নিয়ম মানা হয়—এর আরোহণে ধৈবত (ধা) স্বরটি বর্জিত থাকে। স্বরের এই বক্র চলনই রাগটিকে এক অনন্য গভীরতা দান করে।
রাগ মিয়াঁ কি মল্লার-এর ব্যাকরণ ও পরিচিতি
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চিরাচরিত নিয়মানুযায়ী এই রাগের মূল কাঠামো ও প্রযুক্তিগত পরিচয় নিচে তুলে ধরা হলো:
- অন্যান্য নাম: রাগ মিঞা-মল্লার, মিয়া কি মালহার বা মিয়া মালহার।
- ঠাটের পরিচয় (Thaat): রাগটি উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতিতে কাফি ঠাটের অন্তর্গত।
- জাতি (Jati): এই রাগের জাতি হলো সম্পূর্ণ-ষাড়ব। এর আরোহণে সব স্বর স্পর্শ করলেও অবরোহণের চলন কিছুটা ভিন্ন।
- বাদী স্বর (Vadi Swar): এই রাগের প্রধান বা রাজা স্বর হলো মধ্যম (মা)। তবে মতান্তরে অনেকে ষড়্জ (সা)-কেও বাদী স্বর হিসেবে মান্য করেন।
- সমবাদী স্বর (Samvadi Swar): রাগের দ্বিতীয় প্রধান বা মন্ত্রী স্বর হলো ষড়্জ (সা)। মতান্তরে কেউ কেউ একে পঞ্চম (পা) বলে থাকেন।
- অঙ্গ (Anga): এটি একটি পূর্বাঙ্গ প্রধান রাগ।
- পরিবেশনের সময় (Time): এটি শতভাগ একটি ঋতুপ্রধান রাগ। তাই বর্ষাকালের যেকোনো সময়ে এই রাগটি গাওয়া বা বাজানো যায়। বৃষ্টির দিনে এই রাগের বিস্তার শ্রোতার মনে এক অলৌকিক প্রশান্তি এনে দেয়।
আরোহণ, অবরোহণ ও পকড়
রাগের সেই মেঘমেদুর গতিপ্রকৃতি ও দুই নিষাদের আন্দোলন বোঝার জন্য এর প্রধান স্বরলিপি নিচে দেওয়া হলো:
আরোহণ: স র ম র স, ম র, প, ণ ধ, ন র্স
অবরোহণ: র্স ণ প, ম প, জ্ঞ ম র স
পকড় (রাগের মূল রূপ): র ম র স, ণ্ প্ ম্ ণ্ ধ্, ন স
তথ্যসূত্র
এই রাগের ঐতিহাসিক ও শাস্ত্রীয় বিশুদ্ধতা যাচাইয়ে প্রামাণ্য দুটি গ্রন্থের সহায়তা নেওয়া হয়েছে:
১. ‘রাগ বিন্যাস’ (প্রথম কলি) – শ্রীশচীন্দ্র নাথ ভট্টাচার্য্য (এস, চন্দ্র এন্ড কোং; শারদীয়া সপ্তমী, সেপ্টেম্বর ১৯৭৬)।
২. ‘সঙ্গীত পরিচিতি’ (উত্তরভাগ) – শ্রীনীলরতন বন্দ্যোপাধ্যায় (৫ই ভাদ্র ‘৮০ / ২১ আগস্ট ১৯৭৩)।
রাগ মিয়াঁ কি মল্লার কেবল একটি রাগ নয়, এটি যেন বর্ষার এক জীবন্ত রূপ। তানসেনের এই অমর সৃষ্টি শত শত বছর ধরে আমাদের সঙ্গীত ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করে আসছে। মেঘলা দিনে জানালার পাশে বসে এই রাগের আলাপ বা কোনো ধ্রুপদী পরিবেশনা শুনলে মনটা এক নিমেষেই এক অতল স্নিগ্ধতায় হারিয়ে যায়।
মিয়াঁ তানসেনের এই রাজকীয় সৃষ্টি নিয়ে আমাদের আজকের এই বিশেষ আয়োজনটি আপনার কেমন লাগল, তা আমাদের কমেন্ট করে জানাতে পারেন। ভালো লাগলে সঙ্গীতপ্রেমী বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
