হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জগতে প্রকৃতির রূপ, রস আর ঋতুকে সুরের বাঁধনে বাঁধার এক অনন্য ঐতিহ্য রয়েছে। আর যখনই বর্ষা ঋতু আর আকাশের ঘন কালো মেঘের কথা আসে, তখন সবার আগে যে রাগটির নাম মনে পড়ে, তা হলো ‘রাগ মেঘ মল্লার’ (বা রাগ মেঘ)। এটি মল্লার পরিবারের এক আদি ও গুরুগম্ভীর রাগ, যার প্রতিটি স্বরের আন্দোলনে যেন আকাশের মেঘ আর বৃষ্টির রিনিঝিনি শব্দ লুকিয়ে থাকে।
Table of Contents
রাগ মেঘ মল্লার: বর্ষার গুরুগম্ভীর রূপ আর স্নিগ্ধতার এক অমর সুরগাথা
আকাশে যখন ঘন কালো মেঘের আনাগোনা চলে, তখন মানুষের মনে যে এক অদ্ভুত ব্যাকুলতা আর প্রেমের অনুভূতি জাগে, সুরের জগতে তারই এক সার্থক রূপায়ণ হলো ‘রাগ মেঘ মল্লার’। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে এটিকে বর্ষা ঋতুর অন্যতম প্রধান ও সর্বাধিক পরিচিত রাগ হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে মেঘ মল্লার কোনো ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ বা প্রলয়ঙ্কারী ঝড়ের রাগ নয়; বরং এর প্রকৃতি অত্যন্ত শান্ত, স্নিগ্ধ এবং গম্ভীর। এই রাগের মধ্যে এক ধরণের মায়াবী প্রেমের অনুভূতি লুকিয়ে থাকে, যার কারণে সঙ্গীতশাস্ত্রে একে শৃঙ্গারধর্মী রাগ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়।
ইতিহাসের আলোয় রাগের বিবর্তন: বিলাবল থেকে কাফি ঠাট
প্রাচীন ভারতীয় রাগশাস্ত্রের এক গভীর ইতিহাস জড়িয়ে আছে এই রাগের সাথে। প্রাচীনকালে এই রাগটি ষড়্জ গ্রামের ‘উত্তরমন্দ্রা’ মূর্চ্ছনা থেকে উৎপন্ন হয়েছিল। সেই প্রাচীন নিয়মের বিচারে রাগটিকে একালের উত্তর-ভারতীয় দশ ঠাটের মধ্যে বিলাবল ঠাটের রাগ হিসেবে উল্লেখ করা যায়।
পণ্ডিত অহোবলের বিখ্যাত ‘সঙ্গীত পারিজাত’ গ্রন্থে এই রাগের আদি রূপের আরোহণ-অবরোহণ উল্লেখ রয়েছে:
- আরোহণ: স র ম প ধ র্স
- অবরোহণ: র্স ধ প ম র স
কিন্তু কালক্রমে সঙ্গীত সাধনার বিবর্তনে এই রাগের ‘শুদ্ধ নিষাদ’-এর পরিবর্তে ‘কোমল নিষাদ’ (ণ)-এর ব্যবহার শুরু হয়। স্বরের এই পরিবর্তনের ফলে রাগের রূপেও এক বড় বদল আসে। আর এই নতুন সুর-কাঠামোর সূত্র ধরেই আধুনিককালে রাগ মেঘ মল্লারকে কাফি ঠাটের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ভরত মতবাদ: মেঘ রাগের পরিবার
প্রাচীন ‘ভরত মতে’ রাগ-রাগিণীর যে পারিবারিক কাঠামো ব্যাখ্যা করা হয়েছে, সেখানে মেঘ রাগকে এক বিশাল পরিবারের প্রধান হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই মতবাদ অনুযায়ী মেঘ রাগের পরিবারটি ছিল নিম্নরূপ:
- প্রধান রাগ: মেঘ
- ৫টি রাগিণী: সারঙ্গ, বঙ্গা, গান্ধার্ব্ব, মল্লারী ও মূলতানী।
- ৫টি পুত্র: বাহাদুরী, নটনারায়ণ, মালব, জয়তি ও কামোদ।
- ৫টি পুত্রবধূ: পাহাড়ী, জয়ন্তী, গান্ধারী, পুরবী ও জয়জয়ন্তী।
রাগ মেঘ মল্লার-এর আধুনিক ব্যাকরণ ও রূপ
বর্তমানে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আসরে এই রাগের যে সাধারণ পরিচিতি ও ব্যাকরণ মেনে চলা হয়, তা নিচে দেওয়া হলো:
- ঠাট (Thaat): রাগটি আধুনিক পদ্ধতিতে কাফি ঠাটের অন্তর্গত।
- জাতি (Jati): এই রাগের জাতি হলো ঔড়ব-ঔড়ব। এর আরোহণ ও অবরোহণ—উভয় ক্ষেত্রেই গান্ধার (গা) এবং ধৈবত (ধা) স্বর দুটি সম্পূর্ণ বর্জিত থাকে (৫টি করে স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- বাদী স্বর (Vadi Swar): এই রাগের প্রধান বা রাজা স্বর হলো ষড়্জ (সা)।
- সমবাদী স্বর (Samvadi Swar): রাগের দ্বিতীয় প্রধান বা মন্ত্রী স্বর হলো পঞ্চম (পা)।
- অঙ্গ (Anga): এটি একটি পূর্বাঙ্গ প্রধান রাগ।
স্বরলিপির চলন:
আরোহণ: স র ম প ণ র্স
অবরোহণ: র্স ণ প, ম র, ণ Michael/ণ্স
পকড় (রাগের মূল রূপ): স মর প, মপ, সণ, সণ, র্স
সুরের আন্দোলন ও ‘মধুমদ সারং’-এর সাথে পার্থক্য
রাগ মেঘ মল্লারের গায়কী অত্যন্ত অনন্য। এই রাগের স্বরগুলো গাওয়ার সময় বিশেষভাবে ‘আন্দোলিত’ (vibrated) করা হয়। বিশেষ করে, কোমল নিষাদকে যখন ষড়্জের সহযোগে আন্দোলিত করা হয়, তখন সঙ্গীতগুরুরা সেই সুরের আন্দোলনের মধ্যে আকাশে ঘন মেঘের সঞ্চার এবং গুরুগম্ভীর মেঘ গর্জনের এক অদ্ভুত অনুভূতি প্রকাশ করেন। এছাড়া এর অবরোহণে ঋষভ (রে) স্বরটিও আন্দোলিত হয়।
অনেকে এই রাগের সাথে ‘রাগ মধুমদ সারং’-এর মিল খুঁজে পান, কারণ দুটির স্বর প্রায় একই। তবে এদের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ও মৌলিক পার্থক্য রয়েছে:
- মধুমদ সারং: এই রাগে কোমল নিষাদ সরাসরি (সরলভাবে) ব্যবহৃত হয়।
- মেঘ মল্লার: এই রাগে কোমল নিষাদ কখনোই সরাসরি বসে না, বরং এটি সবসময় ষড়্জকে সাথে নিয়ে এক অদ্ভুত মায়াবী আন্দোলনে মেতে ওঠে।
তথ্যসূত্র
এই রাগের ঐতিহাসিক ও শাস্ত্রীয় শুদ্ধতা যাচাইয়ে প্রাচীন ও প্রামাণ্য দুটি গ্রন্থের সহায়তা নেওয়া হয়েছে:
১. ‘সঙ্গীত-পারিজাত’ – পণ্ডিত অহোবল।
২. ‘মারিফুন্ন্নাগামাত’ – রাজা নবাব আলী খান (অনুবাদ: মকসুদুর রহমান)।
আকাশের বুক চিরে যখন রুমঝুম নৃত্যের ছন্দে বৃষ্টি নামে, ঠিক সেই মুহূর্তের এক অলৌকিক সুরের প্রতিধ্বনি হলো রাগ মেঘ মল্লার। খাঁটি শাস্ত্রীয় রাগ হলেও এর ভেতরের মাটির টান এবং স্নিগ্ধতা যুগ যুগ ধরে সঙ্গীতপ্রেমীদের হৃদয়ে এক পরম শান্তির পরশ বুলিয়ে আসছে।
বর্ষার এই চিরন্তন রাগটি নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন আপনার কেমন লাগল, তা কমেন্ট করে জানাতে পারেন। ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
