সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই মার্চ ২০২২, ১২:৩৫ পিএম
বাংলার লোকসংগীত ও মারফতি আধ্যাত্মিক গানের জগতে ‘মুর্শিদ পথ দেখাইয়া দাও’ একটি কালজয়ী ও পরম ভক্তিপূর্ণ সৃষ্টি। লোকসংগীতের প্রবাদপ্রতিম কণ্ঠশিল্পী আব্দুল আলীমের দরাজ ও দরদি কণ্ঠে গাওয়া এই গানটি শ্রোতাদের পরম স্রষ্টা ও আধ্যাত্মিক গুরুর (মুর্শিদ) প্রতি আত্মনিবেদনের এক অনন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। যুগ যুগ ধরে এই গানটি বাংলার মানুষের অন্তরে সুফি দর্শন ও আধ্যাত্মিক চেতনার বাণী ছড়িয়ে আসছে।
Table of Contents
| বিষয় | বিবরণ |
| গানের নাম | মুর্শিদ পথ দেখাইয়া দাও |
| কণ্ঠশিল্পী | আব্দুল আলীম |
| গানের ধরন | লোকসংগীত / মারফতি ও আধ্যাত্মিক গীতি |
| মূল চেতনা | সুফিবাদ ও স্রষ্টার সন্ধান |
আব্দুল আলীম (১৯৩১ – ১৯৭৪):
আব্দুল আলীম ছিলেন বাংলাদেশের লোকসংগীতের এক কিংবদন্তি পুরুষ, যিনি লোকগানকে অবিশ্বাস্য এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৩১ সালের ২৭ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের তালিবপুর গ্রামে এক দরিদ্র পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। চরম অর্থনৈতিক অনটনের কারণে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গান শেখার সুযোগ না পেলেও, অন্যের গাওয়া গান শুনে শুনেই তিনি শৈশবে সংগীতের পাঠ নেন। পরবর্তীতে ওস্তাদ সৈয়দ গোলাম আলীর সান্নিধ্যে তাঁর আনুষ্ঠানিক তালিম শুরু হয়। মাত্র তেরো বছর বয়সে ১৯৪৩ সালে তাঁর প্রথম গানের রেকর্ড প্রকাশিত হয়।
দেশভাগের পর আব্দুল আলীম ঢাকায় চলে আসেন এবং রেডিও ও টেলিভিশনের নিয়মিত শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ এবং বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘লালন ফকির’ সহ বহু চলচ্চিত্রে তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন। জীবন, জগত ও ভাববাদী চিন্তার এক অপূর্ব মেলবন্ধন ছিল তাঁর প্রায় ৫০০টি রেকর্ডকৃত গানে।
গানের প্রেক্ষাপট:
বাঙালি লোকসংস্কৃতিতে ‘মারফতি’ গান হলো স্রষ্টাকে খোঁজার এক আধ্যাত্মিক মাধ্যম। সুফি সাধনায় বিশ্বাস করা হয় যে, একজন যোগ্য গুরু বা ‘মুর্শিদ’ ছাড়া পরম সৃষ্টিকর্তার সন্ধান পাওয়া অসম্ভব। এই গানে একজন সাধারণ মানুষ তাঁর জীবনের নৌকার হাল মুর্শিদের হাতে সঁপে দিয়ে অন্ধকার পথ পাড়ি দেওয়ার এবং পরলোকে মুক্তির উপায় খুঁজে পাওয়ার আকুল প্রার্থনা জানিয়েছেন।
মুর্শিদ গোওওও…
কোন রাহেতে খোদা মিলে
কোন রাহে রাসুল,
মুর্শিদ কোন রাহে রাসুল।
আমি কোন নামেতে পাড়ি দিব
ফুলসেরাতের পুল,
মুর্শিদ পথ দেখাইয়া দাও
ও, মুর্শিদ পথ দেখাইয়া দাও।
আমি যে পথ চিনি না গো
সঙ্গে কইরা নাও,
মুর্শিদ পথ দেখাইয়া দাও।
মুর্শিদ গোওওও…
মাঝ দরিয়ায় উঠলে তুফান
পথের লাগিলে ভুল।
আমি কোন নামেরই দোহাই দিয়া
হায়রে,
কোন নামেরই দোহাই দিয়া
বাইব নদীর কূল,
মুর্শিদ পথ দেখাইয়া দাও
ও, মুর্শিদ পথ দেখাইয়া দাও।
আমি যে পথ চিনি না গো
সঙ্গে কইরা নাও,
মুর্শিদ পথ দেখাইয়া দাও।
মুর্শিদ গোওওও…
অন্ধকারে পইড়া আছি
আমায় লইয়া যাও,
মুর্শিদ আমায় লইয়া যাও।
তুমি তো নিদানের বন্ধু
বাঁচাইয়া দাও নাও,
মুর্শিদ পথ দেখাইয়া দাও
ও, মুর্শিদ পথ দেখাইয়া দাও।
আমি যে পথ চিনি না গো
সঙ্গে কইরা নাও,
মুর্শিদ পথ দেখাইয়া দাও
ও, মুর্শিদ পথ দেখাইয়া দাও।
Murshid goooo…
Kon rahete khoda mile
Kon rahe rasul,
Murshid kon rahe rasul.
Ami kon namete pari dibo
Pul-serater pul,
Murshid path dekhaiya daw
O, murshid path dekhaiya daw.
Ami je path chini na go
Sange koira naw,
Murshid path dekhaiya daw.
Murshid goooo…
Majh doriyay uthle tufan
Pother lagile bhul.
Ami kon nameri dohai diya
Hayre,
Kon nameri dohai diya
Baibo nodir kul,
Murshid path dekhaiya daw
O, murshid path dekhaiya daw.
Ami je path চিনি na go
Sange koira naw,
Murshid path dekhaiya daw.
Murshid goooo…
Ondhokare poira achi
Amay loiya jaw,
Murshid amay loiya jaw.
Tumi to nidaner bondhu
Bachaiya daw naw,
Murshid path dekhaiya daw
O, murshid path dekhaiya daw.
Ami je path chini na go
Sange koira naw,
Murshid path dekhaiya daw
O, murshid path dekhaiya daw.
এই গানের অন্তর্নিহিত দর্শন অত্যন্ত গভীর ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ। সুফি ও বাউল ঐতিহ্যের রূপকগুলো এখানে চমৎকারভাবে ব্যবহৃত হয়েছে:
পথের দিশা ও আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা: ‘কোন রাহেতে খোদা মিলে, কোন রাহে রাসুল’—মানুষ জাগতিক মায়ায় পড়ে অন্ধ হয়ে যায়, তাই সে পরম স্রষ্টা (খোদা) এবং তাঁর প্রেরিত রাসুলের কাছে পৌঁছানোর সঠিক পথ বা ‘রাহ’ খুঁজে পায় না। মুর্শিদ বা আধ্যাত্মিক গুরুই হলেন সেই পথপ্রদর্শক যিনি শিষ্যকে সত্যের পথ দেখান।
পরকালের বৈতরণী পার হওয়া: ‘কোন নামেতে পাড়ি দিব ফুলসেরাতের পুল’—ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী পরকালে পুলসিরাত বা সূক্ষ্ম সেতু পার হতে হবে। সাধারণ মানুষ নিজের পাপ ও ভুলের কারণে ভীত হয়ে গুরুর কাছে আশ্রয় চায়, যেন গুরুর কৃপায় ও সঠিক জিকিরে সে সেই কঠিন পথ পাড়ি দিতে পারে।
জীবন-নদীর রূপক: ‘মাঝ দরিয়ায় উঠলে তুফান, পথের লাগিলে ভুল’—এই মানবজীবনকে একটি নদীর সাথে তুলনা করা হয়েছে। জীবনের মাঝপথে যখন নানাবিধ সংকট ও জাগতিক মোহ বা ‘তুফান’ আসে, তখন মানুষ পথ হারিয়ে ফেলে। এমতাবস্থায় একমাত্র মুর্শিদের দোহাই ও তাঁর নির্দেশিত পথই জীবনের তরীকে রক্ষা করতে পারে।
পরম নির্ভরতা: ‘তুমি তো নিদানের বন্ধু, বাঁচাইয়া দাও নাও’—‘নিদান’ শব্দের অর্থ চরম সংকট বা শেষ সময়। জীবনের শেষলগ্নে বা চরম বিপদের দিনে গুরুই হন একমাত্র বন্ধু, যিনি শিষ্যের জীবনরূপ ‘নাও’ বা নৌকাকে ডুবে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করেন।
আব্দুল আলীমের কণ্ঠের অসাধারণ দরদ, খাঁটি মাটির টান এবং মারফতি সুরের ধীর গাম্ভীর্য এই গানটিকে কেবল একটি পরিবেশনা নয়, বরং একটি জীবন্ত প্রার্থনায় রূপান্তরিত করেছে।
উৎস (Sources)
এই নিবন্ধের লিরিক্স, শিল্পীর জীবনী এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ঐতিহাসিক তথ্যসমূহ বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের আর্কাইভ, আব্দুল আলীমের অফিশিয়াল গ্রামোফোন রেকর্ড ডিসকোগ্রাফি এবং বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী লোকসংগীত ও সুফি তত্ত্বের প্রামাণ্য নথিপত্র থেকে বিশ্বস্ততার সাথে সংগ্রহ ও যাচাই করা হয়েছে।
মন্তব্য