কুটি মনসুর একজন বাংলাদেশী গায়ক, গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক। তিনি বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন এবং সত্তর ও আশির দশকে বাংলাদেশের আধুনিক বাংলা গানের একটি সুপরিচিত নাম। বাংলাদেশের অনেক খ্যাতনামা সঙ্গীত শিল্পী তার কথায় ও সুরে গান করেছেন, যা আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তাঁর হাত ধরে অসংখ্য কণ্ঠশিল্পী, গীতিকার ও সুরকার জনপ্রিয়তা লাভ করেছেন। তিনি বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের জন্মলগ্ন থেকে সক্রিয় ছিলেন এবং লোকসঙ্গীতের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন।
Table of Contents
কুটি মনসুর | বাঙালি গায়ক, গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক
জন্ম ও প্রাথমিক জীবন
বাংলা লোকজ গানের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তি কুটি মনসুর ১৯২৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর ফরিদপুরের চরভদ্রাসন থানার লোহারটেক গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মৌলভী আবেদ আলী খান এবং মাতার নাম আবেদুন্নেসা। তিন ভাই এবং এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। পিতা আকিকা দিয়ে তার নাম রাখেন মোঃ মনসুর আলী খান, কিন্তু মা আদর করে তাকে ‘কুটি’ বলে ডাকতেন, যা পরবর্তীকালে তার নামের অংশ হয়ে ওঠে এবং এই নামেই তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। তিনি মাত্র ১০ বছর বয়সে পিতৃহারা হন। পরিবার নিয়ে তিনি রাজধানীর বনশ্রী এলাকার ই ব্লকে ভাড়া বাসায় থাকতেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ঢাকা জেলার দোহার থানার মীর সৈয়দ আলীর জ্যেষ্ঠ কন্যা জাহানারা বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের ছয় সন্তান: খান মোহাম্মদ মজনু (ফটো সাংবাদিক), জাহিদ মনসুর (সুরকার ও সঙ্গীতপরিচালক), সুরাইয়া খানম, জেসমিন আক্তার, তাসলিমা আক্তার এবং শাহীন সুলতানা যুথি। তিনি ১২ বছর বয়স থেকে সঙ্গীতে তালিম গ্রহণ শুরু করেন এবং ১৫ বছর বয়সেই নিজে গান রচনা করে তাতে সুর সংযোজন করে বিভিন্ন মঞ্চে পরিবেশন করতে শুরু করেন। তিনি একজন সৎ, নির্লোভ, নিরাহংকারী, ধীরস্থীর এবং শান্তস্বভাবের মানুষ ছিলেন, যিনি আধ্যাত্মিক চেতনায় আলোকিত ছিলেন।
সঙ্গীত জীবন
কুটি মনসুর সত্তর ও আশির দশকে বাংলাদেশের আধুনিক বাংলা গান ও লোকজগানের পরিচিত একটি নাম। তিনি দীর্ঘ ৬০ বছরের সঙ্গীতজীবনে প্রায় ৮ হাজার গান রচনা করেছেন এবং ৪ হাজার ৫০০ গানের সুরারোপ করেছেন। তাঁর গানগুলো প্রায় ৫০টি বিষয়ের উপর ছড়িয়ে আছে, যার মধ্যে পল্লিগীতি, আধুনিক, জারি-সারি, পালাগান, পুঁথিপাঠ, ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, মারফতি, আধ্যাত্মিক, দেহতত্ত্ব, হামদ-নাত, ইসলামি প্রভৃতি অন্তর্ভুক্ত। প্রায় আড়াইশ গান ঢাকা রেকর্ড ও ইপ্সা রেকর্ড থেকে লং প্লে ডিস্কে প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৫৯ সালে তিনি মৎস্য অধিদফতরে চাকরিতে যোগদান করেন এবং ১৯৬২ সালে কণ্ঠশিল্পী, গীতিকার ও সুরকার হিসেবে বাংলাদেশ বেতারে তালিকাভুক্ত হন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্মলগ্ন থেকে তিনি গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯৮২-১৯৮৭ সাল পর্যন্ত জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ পরিদফতরের অধীনে ৩০০ গান রচনা করে বাউল শিল্পীদের প্রশিক্ষণে ব্যবহার করেন। তিনি বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের কণ্ঠশিল্পী অডিশন বোর্ডের বিচারক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। বঙ্গবন্ধু ললিতকলা একাডেমিতে ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত অধ্যক্ষ এবং আনসার ভিডিপিতে ১৯৯৭-২০০২ সাল পর্যন্ত সঙ্গীত প্রশিক্ষক ছিলেন। তিনি ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬৬’র ছয় দফা, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ৭১’র মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু এবং দেশাত্ববোধক গান-কবিতা রচনা করেছেন। চলচ্চিত্রে তিনি ‘শীষনাগ’ (এফ কবির চৌধুরী) ও ‘যোগাযোগ’ (মইনুল হোসেন)-এর জন্য গান লিখেছেন এবং প্রামাণ্যচিত্র ‘দুই বিঘা জমি’-তে গান লিখে ও কণ্ঠ দিয়েছেন। তাঁর গানগুলো বিয়েবাড়ি, সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো এবং হাঁটে-মাঠে-ঘাটে সাধারণ মানুষের মুখে ফিরত। তাঁর গানে দেশ, মাটি ও মানুষের কথা প্রতিফলিত হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য গান
কুটি মনসুরের রচিত অনেক গান আজও বাংলাদেশের মানুষের মুখে মুখে ফেরে। তার মধ্যে কয়েকটি বিখ্যাত গান হলো:
- ‘আইলাম আর গেলাম পাইলাম আর খাইলাম’;
- ‘কে বলে মানুষ মরে আমি বুঝলামনা ব্যাপার মানুষ মরিলে তবে বিচার হবে কার’;
- ‘যৌবন জোয়ার একবার আসে রে বন্ধু চলে গেলে আর আসেনা’;
- ‘আমি কি তোর আপন ছিলাম না রে জরিনা’;
- ‘জরিনা সুন্দরী’;
- ‘হিংসা আর নিন্দা ছাড়ো মনটা কর পরিষ্কার’;
- ‘সাদা কাপড় পরলে কিন্তু মনটা সাদা হয় না’;
- ‘মুজিব মরে নাই শোন বাংগালী বোন ভাই মুজিব মরে নাই’;
- ‘যদি এমন একটি খবর পেতাম, লাল দিঘির পাড়ে চট্টগ্রাম, বঙ্গবন্ধু করছেন সভা ছুটে যেতাম’;
- ‘ওদের দয়া মায়া ছিলনা বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে দিলনা’;
- ‘দরদীনি মা জননী কান্দিওনা আর ৭ কোটি বাঙালি সন্তান রয়েছে তোমার’;
- ‘শিয়াল কয় খাটাশ ভাইরে উপায় নাইরে, জীবন বাচাই কেমন করে’;
- ‘বিধিরে এই মানুষের ভিতর কেন বানাইলা অন্তর’;
- ‘কে বলে প্রেম নেই’;
- ‘রক্তে লেখা প্রেমের চিঠি’;
- ‘ইছামতি নদীর পাড়ে ছোট্টএকটি গ্রাম’;
- ‘বুকের মাঝে সুখের বাসা’;
- ‘মায়ের মুখের বাংলা ভাষা’;
- ‘রক্ত দিয়ে ইতিহাস লিখে গেল যারা’;
- ‘আটই ফালগুনের কথা’;
- ‘এই তো আমার দেশ’;
- ‘বাংলাদেশের মতো এমন দেশ তো কোথাও নাই’;
- ‘আমার দেশের ছয়টি ঋতু’;
- ‘সখিনাকে একা রেখে যুদ্ধে চলে যাই’;
- ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’;
- ‘বলরে সবাই বল’;
- ‘বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী সন্তান’;
- ‘বঙ্গবন্ধু একটি নাম’।
শিল্পীগণ যারা তার গান গেয়েছেন
তার কথা ও সুরে গান গেয়েছেন বাংলাদেশের অনেক খ্যাতনামা শিল্পী। তাদের মধ্যে রয়েছেন: সৈয়দ আব্দুল হাদী, এন্ড্রু কিশোর, রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, নীনা হামিদ, রথীন্দ্রনাথ রায়, ফকির আলমগীর, ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, ফিরোজ সাঁই, মুজিব পরদেশী, আব্দুর রউফ, আনজুমান আরা বেগম, মোস্তফা জামান আব্বাসি, খুরশীদ আলম, মমতাজ, আকরামুল ইসলাম, শাম্মী আক্তার, জানে আলম, আবু বকর সিদ্দিক, জহির আলীম, আজগর আলীম, জহুরা আলীম, নুরুন্নাহার আউয়াল, তপন চৌধুরী, শুভ্র দেব, এম এ মতিন, সাহাবুদ্দিন আহমেদ দোলন, নাদিরা বেগম এবং আরও অনেকে। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র কে এম মজনু তার গান গেয়েছেন, যেমন ‘কে বলে মানুষ মরে’। অনেক কণ্ঠশিল্পী তার গান গেয়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন।
সাহিত্যচর্চা
কুটি মনসুর অল্পবিস্তর সাহিত্যচর্চা করেছেন। তিনি সাহিত্যে মনোযোগী ছিলেন এবং ছড়া-কবিতা বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর লেখা পাঁচটি বই প্রকাশিত হয়েছে: ‘মীন গীতিকা’ (মৎস্য উন্নয়ন গান-কবিতা), ‘পরিবার-পরিকল্পনার গান’ (জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ), ‘কুটি মনসুরের অমর সঙ্গীত’, ‘কুটি মনসুরের ভান্ডারী গান’ এবং ‘আমার বঙ্গবন্ধু, আমার একাত্তর’। শেষোক্ত বইটি প্রকাশিত হয়েছিল অসুস্থ হওয়ার মাস দুয়েক আগে।
পুরস্কার ও সম্মাননা
কুটি মনসুরের সঙ্গীতজীবনে কয়েকটি পুরস্কার রয়েছে, যদিও তাঁর অবদানের তুলনায় যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি বলে মনে করা হয়। তাঁর প্রাপ্ত পুরস্কারগুলোর মধ্যে রয়েছে: শিল্পকলা একাডেমী পুরস্কার (২০০৪), ঋষিজ শিল্পগোষ্ঠী পুরস্কার (১৪১১ বাং.), খেলা ঘর জাতীয় শিশু-কিশোর সাংস্কৃতিক উৎসব পুরস্কার (২০১০) এবং লোকাঙ্গন সাংস্কৃতিক সংগঠন পুরস্কার (২০১৪)। তিনি অন্তর্মুখী এবং প্রচারবিমুখ ছিলেন, ফলে তাঁর অনেক অবদান অপ্রকাশিত রয়েছে এবং কোনো রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পাননি।

মৃত্যু
২০১৫ সালে কুটি মনসুর একবার অসুস্থ হন এবং একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়, যেখানে অপারগতা প্রকাশ করলে ঢাকা মেডিকেল কলেজে স্থানান্তর করা হয়। তার জ্যেষ্ঠ পুত্র কে এম মজনু এক মাসের অধিক সময় চিকিৎসা করান এবং তিনি মোটামুটি সুস্থ হন। ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর ঢাকার বনশ্রীর ভাড়া বাসায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর তাকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি ঘটলে ২৯ ডিসেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাগরিবের আজানের ধ্বনি ভেসে আসার সময় ২৪ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৯০-৯১ বছর। পরদিন ২৫ জানুয়ারি ঢাকার দোহারে তার শ্বশুরবাড়িতে স্ত্রীর কবরের পাশে তার মরদেহ সমাহিত করা হয়। তাঁর মৃত্যুর পর শিল্পকলা একাডেমিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যেখানে তাঁর গান পরিবেশন করা হয় এবং তাঁর অবদানের প্রশংসা করা হয়।
