শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও চর্যাপদ

শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও চর্যাপদ সম্পর্কে আজ খুব সংক্ষেপে আলোচনা করা হবে। আমরা জানি চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের আদি সাহিত্য। বাংলা সাহিত্য, সাহিত্য ও সঙ্গীতের মেলবন্ধন সম্পর্কে যাদের আগ্রহ আছে, তাদের মনে সব সময় একটা প্রশ্ন আসতে পারে – আমাদের আদি সাহিত্য চর্যাপদের সাথে সঙ্গীতের কোন সম্পর্ক ছিল কি না। আমরা জানি চর্যাপদ পদ্য। তাই পদ্যের ছন্দে ছন্দে আবৃত্তির সাথে একটি সম্পর্ক থাকবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ছন্দবদ্ধ শব্দের সাথে সঙ্গীতের কোন সম্পর্ক ছিলো কি না সেটা আজকের আলোচ্য বিষয়।

 

চর্যাগীতি, চর্যাপদ

 

শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও চর্যাপদ :

চর্যাগীত বাংলা গান ও বাংলা কবিতা :

চর্যাগীত বাংলা গান ও বাংলা কবিতার আদি নিদর্শন। চর্যাগীতির সাংগীতিক প্রভাব সম্পর্কে স্বামী প্রজ্ঞানন্দ তার পদাবলী কীর্তনের ইতিহাসে প্রথম খণ্ডে বলেছেন, ‘শাঈদেব ও ব্যংকটমুখীর বিবরণ থেকে একথাই প্রমাণিত হয় যে, ৯ম-১১শ শতকের বাংলাদেশে বৌদ্ধ চর্যাগীতিগুলিও ক্ল্যাসিক্যাল তথা শাস্ত্রীয় ও ট্রাডিশনাল শ্রেণীভুক্ত ছিল। হতে পারে ১৩শ থেকে ১৬শ শতকে গীত চর্যাগীতিরীতি গঠনে ও প্রকাশভঙ্গীতে ছিল অনেকটা সহজসরল কিন্তু তা যে, ৯শ-১১শ শতকের গীতিরূপ ও গীত শৈলীকে ভিত্তি করেই বিকাশ লাভ করেছিল একথা সত্য।

৯ম-১১শ শতকের পরবর্তী গীতগোবিন্দ পদগান বা অষ্টপদিগান, কৃষ্ণকীর্তন, মঙ্গলগান, নামকীর্তন, পদাবলী কীর্তন ও অন্যান্য ভক্তিমূলক অভিজাত গানের যোগসূত্রও চর্যাগীতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ছিল। মোট কথা চর্যার গীতরীতি ও প্রেরণাই পরবর্তীকালে সকল গীতশ্রেণী সমৃদ্ধির পথে পাথেয়। চর্যাগীতিতেও যে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রভাব ছিলো তা চর্যাগীতির সুরবিশ্লেষণ বা গীতিশৈলী থেকে বোঝা যায়। প্রত্যেকটি চর্যাগীতির শিরোদেশে রাগের নাম উল্লেখ আছে।

 

চর্যাগীতি, চর্যাপদ

 

চর্যাপদ-গীত, চর্যায় ব্যবহৃত রাগ-রাগিণী:

যেসব রাগে চর্যাগীতি রচিত হয়েছে তাদের নাম হল পটমঞ্জরী, গবড়া, অরু, গুর্জরী, দেবক্রী, দেশাখ, ভৈরবী, কামোদ, ধানসী, রামক্রী, বরাড়ী, বরী, মল্লরী, মালসী গবুড়া, শবরী, ও বঙ্গাল। পটমঞ্জুরী চর্যাগীতিতে সর্বাধিক ব্যবহৃত রাগ। অন্যকোন গানে তাল নামের উল্লেখ না থাকলেও প্রবোধ সেন সংগৃহীত চর্যায় তিব্বতী অনুবাদে ২৪ সংখ্যক গানের শিরোদেশে ইন্দ্রতালের উল্লেখ দেখা যায়। এতে মনে হয় অন্য সকল গানেও রাগের সাথে তালের উল্লেখ ছিল।

চর্যায় ব্যবহৃত রাগের কয়েকটি জয়দেবের গীতগোবিন্দে এবং বড়চণ্ডীদাশের শ্রীকৃষ্ণ কীর্তনেও লক্ষ্য করা যায়। রামক্রী গীতগোবিন্দে হয়েছে রামকিরি এবং বড় চণ্ডীদাসের কাব্যে রয়েছে দেশাগ। বড়ুচণ্ডীদাসের কাব্যের ধানুষী ধানেশ্রীর পরিবর্তিত রূপমাত্র। মল্লারীরাগ মল্লার নামে আজও সুপরিচিত।

কৃষ্ণলীলায় প্রচলিত গাইরী রাগই চর্যাতে সম্ভবত কাহ্ন-গুইরী। লোচনপণ্ডিত তার রাগতরংগিনী গ্রন্থে গৌরী রাগ, নামে একটি রাগের উল্লেখ করেছেন, সেই গৌরী শব্দের পরিবর্তিত রূপ গইরা বা গবড়া হতে পারে, কিংবা এমনও হতে পারে যে সেকালে কাব্যে যেমন গৌড়িরীতি বলে একটি বিশিষ্ট রীতির উল্লেখ পাই তেমনি রাগের মধ্যে হয়ত একটি ছিল গৌড়ি রাগ বা সেই গৌড়ি শব্দের পরিবর্তিত রূপ।

 

চর্যাগীতি, চর্যাপদ

 

সঙ্গীত ইতিহাসের দিক থেকে চর্যাগীতির সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য রাগ শবরী ও বঙাল রাগ। শবরী রাগতো নিঃসন্দেহে শবরদের মধ্যে প্রচলিত রাগ।

চর্যাগীতিতে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ব্যবস্থার সম্পর্কে ডঃ নীহার রজন রায়ের বক্তব্য এখানে স্মরণযোগ্য। “সঙ্গীত ইতিহাসের দিক থেকে চর্যাগীতির সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য রাগ শবরী ও বঙাল রাগ। শবরী রাগতো নিঃসন্দেহে শবরদের মধ্যে প্রচলিত রাগ। এই লোকায়িত রাগটির মার্গীকরণ কবে হয়েছি বলা কঠিন; তবে এর উল্লেখ শুধু চর্যাগীতিতেই পাইতেছি, আগে বা পরে সে উল্লেখ আর কোথাও দেখিতেছিনা।

বঙাল রাগও যে কি ধরনের আজ তাহাও বোঝার উপায় নেই। তবে এই রাগীটিও যে, একসময় গুর্জরী মালবশ্রী বা মালসী প্রভৃতি রাগের মত স্থানীয় লোকায়ত রাগই ছিল সন্দেহ নাই। অথচ ভারতীয় রাগসঙ্গীতে বঙাল রাগ একসময় সুপরিচিত রাগ ছিল এবং অষ্টাদশ শতকের রাজস্থানী চিত্রনিদর্শনে বঙাল রাগের চিত্রও দুর্লভ নয়। পরে কিভাবে রাগটি লুপ্ত হল জানা জায়নি। মূলত চর্যাগীতির দেবক্রী, গবরা, মালসী গবুড়া, শবরী, বঙাল, কাহ্নগুর্জরী প্রভৃতি অনেক রাগই আজ বিলুপ্ত। দেশাগ রাগ মনে হচ্ছে আজকের দেশরাগে বিবর্তিত হয়েছে।

 

শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও চর্যাপদ

 

চর্যাপদ-গীত তথা চর্যা ও সঙ্গীত বিষয়ক সিদ্ধান্ত:

ঐতিহাসিক বিবরণ এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত থেকে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, চর্যাপদে শাস্ত্রীয় ‘সঙ্গীতের ব্যবহার ছিল। তবে হয়তো সেসব রাগের রূপ আজ আমরা যেমন করে গাইছি সেরকম ছিল না। সঙ্গীতের বিবর্তনও একই কথা বলে। কারণ আমরা সান্ত্রীয় সঙ্গীতের আদি গ্রন্থগুলোতে রাগের যে রুপ পেয়েছি তার অনেকগুলোই আজকের প্রচলিত রূপের সাথে মেলে না। অনেক ক্ষেত্রে নাম মিললেও দেখা যায় রূপ ভিন্ন।

আবার এক সময় প্রচলিত একটি রাগের উপরে ভিত্তি করে যে রাগাঙ্গ তৈরি হয়েছে, তা থেকে তৈরি হয়েছে নতুন রাগ। এরপর পুরনো রাগটিকে ফেলে নতুন রাগটি এগিয়ে গেছে। তাই সেসময়ের রাগগুলো আমরা এখন গান/বাজনা না করলেও, সেসব রাগ যে আমাদের আজকের সঙ্গীতের ভিত্তি তা অস্বীকার করা যায় না। চর্যাপদ থেকে যেমন বয়ে এসে আজ আধুনিক বাংলা সাহিত্য, তেমন ভাবেই চর্যাপদের সময় ব্যবহৃত সেই সকল রাগ রাগিণী থেকেও বয়ে এসে আজকের শাস্ত্রীয় ‘সঙ্গীত। সেই অতীতকে আমরা আরও পূর্ণভাবে জানলে-বুঝলে ভবিষ্যৎ শিল্প-সাহিত্যকে আমরা আরও ভালোভাবে বিনির্মাণ করতে পারবো।

 

Leave a Comment