বাংলা আধুনিক সঙ্গীতের ইতিহাসে যে কয়েকজন সৃষ্টিশীল শিল্পী নিজের প্রতিভা, নিষ্ঠা ও মৌলিকতার মাধ্যমে একটি যুগকে সংজ্ঞায়িত করেছেন, তাঁদের অন্যতম নচিকেতা ঘোষ। বাংলা চলচ্চিত্র সঙ্গীত, আধুনিক গান ও রেডিও–সংগীতে তিনি যে সুরের বিপ্লব ঘটান, তা আজও বাংলা সঙ্গীতজগতে মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। সুর, তাল, বোল, মেলোডি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র, সাহসী ও গভীর। বাংলা গানে সংবেদনশীলতা, সুরমাধুর্য ও কাব্যিকতার যে মেলবন্ধন আমরা আজ দেখি—তার গুরুত্বপূর্ণ স্থপতি নচিকেতা ঘোষ।

Table of Contents
প্রথম জীবন : চিকিৎসার পথ ছেড়ে সুরের জগতে প্রবেশ
১৮০০–এর দশকের শেষভাগে জন্ম নেওয়া নচিকেতা ঘোষ ছিলেন কলকাতার একজন উচ্চশিক্ষিত পরিবারের সন্তান। তাঁর পিতা ডঃ সনত কুমার ঘোষ ছিলেন কলকাতার বিখ্যাত চিকিৎসক ও ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের ব্যক্তিগত চিকিৎসক। স্বর্ণপদক–প্রাপ্ত এই চিকিৎসক চেয়েছিলেন ছেলে ডাক্তার হোক। সেই কারণে নচিকেতা ভর্তি হন আর.জি. কর মেডিক্যাল কলেজে এবং এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনও করেন।
কিন্তু চিকিৎসার চেয়ে সুর তাঁকে বেশি টানত। শৈশব থেকেই তাঁর মানসপটে সংগীতের যে অঙ্কুর বপন হয়েছিল, তা ক্রমে এক প্রবল সৃজনশক্তিতে রূপ নেয়।
সঙ্গীতের প্রতি আকর্ষণের সূচনা
ডঃ সনৎ কুমারের শ্যামবাজারের বাড়িটি ছিল সমসাময়িক সংগীতশিল্পীদের মিলনকেন্দ্র।
প্রতিবার রবিবার সেখানে আসতেন—
কৃষ্ণ চন্দ্র দে
সুবল দাশগুপ্ত
কমল দাশগুপ্ত
“কানা সাতকারি” ভৈরবী–খ্যাত গুরু
এই মহান শিল্পীদের সান্নিধ্য একটি শিশুর মননে যেমন স্বপ্ন জাগাত, তেমনি জন্ম দিত অভ্যাস ও সাধনার অনুপ্রেরণা। ছোট নচিকেতা তাঁদের সঙ্গে তবলা বাজাতেন। ধীরে ধীরে তবলা তার প্রথম প্রেম হয়ে ওঠে—তারপর সেই পথ ধরে আসে সুরারোপ, সংগীতায়োজন ও পরিচালনা।
সঙ্গীত জীবন : বাংলা আধুনিক গানে নতুন ধারা
মাত্র ২৪ বছর বয়সেই নচিকেতা ঘোষ বাংলা চলচ্চিত্র ও আধুনিক গানে এক প্রতিশ্রুতিশীল সুরকার হিসেবে আবির্ভূত হন। ১৯৪০–এর দশকের শেষ থেকে তিনি বাংলা গানের জগতে যে ধারাবাহিক সুর–সৃষ্টি করেন, তা বাংলা সংগীতের রূপকাঠামোই পাল্টে দেয়।
‘জয়দেব’ চলচ্চিত্র দিয়ে প্রথম সাড়া ফেলা
তাঁর সুরারোপিত গান প্রথম জনপ্রিয়তা পায় ‘জয়দেব’ ছবিতে। সুরের কোমলতা, আবেগ ও মননশীলতা খুব দ্রুত শ্রোতাদের হৃদয় জয় করে।
ফিল্মি গান, আধুনিক গান ও রেডিও–সংগীতে বিপ্লব
নচিকেতা ঘোষ শুধু চলচ্চিত্রেই নয়—
✔ পুজোর গান
✔ রেডিওর আধুনিক গান
✔ বেসিক গান
—সব ক্ষেত্রেই যুগান্তকারী সুর সৃষ্টি করেন।
তাঁর সুরে যে প্রাণের মাধুর্য, রাগ–আধারিত বিন্যাস, শব্দ–উচ্চারণের সূক্ষ্মতা ছিল—তা বাংলা গানের ইতিহাসে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়।
যে শিল্পীরা তাঁর সুরে কণ্ঠ দিয়েছেন
পঞ্চাশের দশকে বাংলা গানের শ্রেষ্ঠ শিল্পীরা প্রায় সবাই তাঁর সুরে গান করেছেন।
তাঁর সুরে যাঁরা গান করেছেন
- হেমন্ত মুখোপাধ্যায় (তাঁর সবচেয়ে প্রিয় শিল্পী)
- লতা মঙ্গেশকর (বাংলায় প্রথম গান তাঁর সুরে)
- সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়
- আরতি মুখোপাধ্যায়
- পিন্টু ভট্টাচার্য
- মীরা দেব
- আর.এল. রায়
—এবং আরও অসংখ্য শিল্পী
তাঁর সুরে শিল্পীদের কণ্ঠ আরও উজ্জ্বল, আবেগময় ও শিল্পগুণসম্পন্ন হয়ে ওঠে। অনেক খ্যাত শিল্পীর ক্যারিয়ারেও তাঁর সুর গুরুত্বপূর্ণ বাঁক তৈরি করে।
নচিকেতা ঘোষের সুরের বিশেষ বৈশিষ্ট্য
- রাগাশ্রিত সুরকে আধুনিক নির্মাণে রূপ দেওয়ার দক্ষতা
- অত্যন্ত কোমল ও মাধুর্যপূর্ণ মেলোডি
- কবিতার আবেগকে সুরে ধারণ করার ক্ষমতা
- কণ্ঠশিল্পীর স্বরশৈলী অনুযায়ী সুর প্রস্তুত
- তবলা–তালবাদ্যের সূক্ষ্ম প্রয়োগ
- গানের আবহ এবং চরিত্র অনুযায়ী সংগীতায়োজন
ব্যক্তিগত জীবন
নচিকেতা ঘোষ বিবাহ করেন শিবানী দত্তকে। তাঁদের সন্তানদের মধ্যে—
সন্তান
- সুপর্ণ কান্তি ঘোষ – খ্যাতিমান সঙ্গীত পরিচালক ও সুরকার
- শ্রাবণী
- সম্পুর্ণা
বিশেষ করে সুপর্ণ কান্তি ঘোষ নিজের পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বহু জনপ্রিয় গান সৃষ্টি করেছেন এবং আধুনিক বাংলা গানে তাঁর নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তুলেছেন।
উপসংহার : একটি যুগের সুর–স্থপতি
বাংলা আধুনিক গান আজ যে উচ্চতার জায়গায় পৌঁছেছে— তার অন্যতম প্রধান স্থপতি নচিকেতা ঘোষ।
