মুন্সী রইসউদ্দিন । বাংলাদেশি সঙ্গীতজ্ঞ ও সঙ্গীতশিল্পী

উপমহাদেশীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একজন মহান সাধক, সঙ্গীতজ্ঞ, রাগস্রষ্টা এবং সঙ্গীতশিক্ষাবিদ মুন্সী রইসউদ্দিন। অবিভক্ত বাংলায় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রসার, নতুন রাগ সৃষ্টি এবং বাংলায় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সহজপাঠ্য পাঠ্যপুস্তক রচনায় তাঁর অবদান অসামান্য। মূলত তাঁর হাত ধরেই তৎকালীন পূর্ব বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশ) প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।

সংক্ষিপ্ত তথ্যসারণি

বিষয়বিবরণ
পূর্ণ নামমুন্সী রইসউদ্দিন
জন্ম১৯০১ খ্রিষ্টাব্দ
জন্মস্থাননান্দুয়ালী গ্রাম, মাগুরা জেলা, বাংলাদেশ
মৃত্যু১১ এপ্রিল, ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দ
পেশা/পরিচয়উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতশিল্পী, সঙ্গীতজ্ঞ, গবেষক, রাগস্রষ্টা ও গ্রন্থকার
সঙ্গীতের ধারাধ্রুপদ, খেয়াল ও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত
গুরুবৃন্দরাসবিহারী মল্লিক, গিরিজাশঙ্কর চক্রবর্তী, শরজিৎ কাঞ্জিলাল
প্রধান দায়িত্বঅধ্যক্ষ, বুলবুল ললিতকলা একাডেমী (BAFA); প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ, প্রবেশিকা সঙ্গীত বিদ্যালয়
রাষ্ট্রীয় সম্মাননাএকুশে পদক (১৯৮৬ – মরণোত্তর), আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৮)

প্রাথমিক জীবন ও উচ্চাঙ্গ সংগীতে সুদীর্ঘ তালিম

মুন্সী রইসউদ্দিন ১৯০১ সালে মাগুরা জেলার নান্দুয়ালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে সুর ও সঙ্গীতের অসাধারণ প্রজাতিগত প্রতিভা পরিলক্ষিত হয়। তিনি অত্যন্ত সুকণ্ঠের অধিকারী ছিলেন।

তাঁর গানের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় ফুফাতো ভাই শামসুল হকের নিকট। ম্যাট্রিক পাস করার পর মাত্র ১৭ বছর বয়সে কর্মসংস্থানের সন্ধানে তিনি কলকাতা গমনাগমন করেন। কলকাতায় চাকরির পাশাপাশি তিনি নিজেকে সঙ্গীতের কঠোর সাধনায় নিয়োজিত করেন:

  • ১২ বছরের সুকঠিন সাধনা: বিখ্যাত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতজ্ঞ রাসবিহারী মল্লিক-এর অধীনে টানা ১২ বছর তিনি ধ্রুপদ ও খেয়াল অঙ্গের কঠোর ও অনুশাসনমূলক শিক্ষা গ্রহণ করেন।
  • সঙ্গীতকলা ভবন: প্রখ্যাত সঙ্গীতবিদ গিরিজাশঙ্কর চক্রবর্তী পরিচালিত ঐতিহ্যবাহী ‘সঙ্গীতকলা ভবন’-এ ভর্তি হয়ে তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্লোমা ও সনদ লাভ করেন।
  • লক্ষ্ণৌ শাস্ত্রীয় ধারায় পাঠ: পরবর্তীতে লক্ষ্ণৌর প্রখ্যাত সঙ্গীতবিশারদ শরজিৎ কাঞ্জিলাল-এর কাছেও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের নানা সূক্ষ্ম অলংকার ও তত্ত্বের তালিম নেন।

কর্মজীবন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংগীতে অবদান

১. বেতার শিল্পী ও নারায়ণগঞ্জে সঙ্গীত প্রতিষ্ঠা

১৯৩৮ সালে মুন্সী রইসউদ্দিন প্রথম আকাশবাণী কলকাতা (কলকাতা বেতার)-য় নিয়মিত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত পরিবেশনের সুযোগ পান। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তিনি স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসেন এবং ঢাকা বেতারে সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে যোগ দেন।

তিনি নারায়ণগঞ্জে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং সেখানে সঙ্গীতপ্রেমীদের সংগঠিত করে ‘প্রবেশিকা সঙ্গীত বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নিজে এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।

২. বুলবুল ললিতকলা একাডেমী (BAFA)

বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক ললিতকলা শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু ‘বুলবুল ললিতকলা একাডেমী’ (BAFA)-র বিকাশে তাঁর অবদান ছিল অনন্য:
  • ১৯৫৫ সাল: সহ-অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন।
  • ১৯৬৪ সাল: অধ্যক্ষ পদে আসীন হন এবং আমৃত্যু এই দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর উদ্যোগে নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে একাধিক সঙ্গীত শিক্ষা কেন্দ্র গড়ে ওঠে। সঙ্গীতকে কেবল গুটি কতক মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সর্বস্তরের শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল তাঁর জীবনের মূল সাধনা।

ওস্তাদ মুনশী রইসউদ্দিন

সঙ্গীত গবেষণা, রাগ সৃজন ও গ্রন্থাবলী

বিভাগোত্তর পূর্ব বাংলায় যখন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে সঙ্গীতকে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তখন বাংলা ভাষায় প্রামাণিক শাস্ত্রীয় সঙ্গীত গ্রন্থের চরম অভাব দেখা দেয়। মুন্সী রইসউদ্দিন সেই শূন্যতা পূরণ করতে বাংলায় সরল ভাষায় বহু কালজয়ী পাঠ্যপুস্তক ও তত্ত্বীয় গবেষণা গ্রন্থ রচনা করেন।
এছাড়াও তিনি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতধারায় বেশ কিছু নতুন রাগ-রাগিণী সৃজন করে সঙ্গীতশাস্ত্রে নিজের নাম অমর করে রেখেছেন।

প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থরাজি:

  • অভিনব শতরাগ: তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গবেষণা গ্রন্থ। এটিতে তিনি বহু নতুন রাগের পরিচিতি, কাঠামো ও স্বরলিপি প্রদান করেছেন।
  • সরল সঙ্গীত সার-সংগ্রহ: শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সহজবোধ্য মৌলিক ব্যাকরণ বই।
  • ছোটদের সারেগামা: শিশুদের সঙ্গীত শিক্ষার প্রাথমিক স্বরলিপি গ্রন্থ।
  • সঙ্গীত পরিচয়: সঙ্গীতশাস্ত্রে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত সহায়ক বই।
  • রাগ লহরী: বিভিন্ন রাগের রূপতত্ত্ব ও বিস্তারিত স্বরবিন্যাস বিষয়ক গ্রন্থ।
  • গীত লহরী: খেয়াল ও ধ্রুপদের গান ও তাল-সংগতির সংকলন।

পুরস্কার ও সম্মাননা

উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত চর্চা, নতুন রাগ উদ্ভাবন এবং সঙ্গীত গবেষণায় অসাধারণ অবদানের জন্য মুন্সী রইসউদ্দিন জাতীয় পর্যায়ে সম্মানিত হন:
  • আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৮): তাঁর কালজয়ী সঙ্গীত গবেষণা গ্রন্থ ‘অভিনব শতরাগ’-এর জন্য তিনি এই মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।
  • একুশে পদক (১৯৮৬): সঙ্গীত জগতে তাঁর অবিস্মরণীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার তাঁকে মরণোত্তর দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে।

জীবনাবসান ও উত্তরাধিকার

১৯৭৩ সালের ১১ এপ্রিল এই মহান সঙ্গীতসাধক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মুন্সী রইসউদ্দিনের জীবনসাধনা কেবল গান গাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি বাংলায় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের জটিল তত্ত্বগুলোকে সহজবোধ্য করে লিখিত রূপ দিয়েছেন এবং অসংখ্য অনুগামী ও ছাত্র তৈরি করে গেছেন। আধুনিক বাংলাদেশে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত চর্চার যে শক্ত ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে, তার নেপথ্যে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়।
Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।