সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই জানুয়ারি ২০২৩, ১১:৩১ এএম
ভারতীয় সংগীত জগতে এমন কিছু শিল্পী আছেন, যাঁরা কণ্ঠের মাধ্যমে শুধু গান নয়, আবেগ, অনুভূতি ও আত্মার ভাষাকেও প্রকাশ করেন। Shreya Ghoshal সেই বিরল প্রতিভাবান শিল্পীদের অন্যতম। তাঁর কণ্ঠে যেমন ভক্তির মাধুর্য, তেমনই আছে প্রেম, বেদনা ও উচ্ছ্বাসের গভীর অনুরণন। একাধিক ভাষায় সমান দক্ষতার সঙ্গে গান গেয়ে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে।
Table of Contents
শ্রেয়া ঘোষাল জন্মগ্রহণ করেন ১২ মার্চ, ১৯৮৪, পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুর শহরে একটি সংস্কৃতিমনস্ক বাঙালি পরিবারে। তাঁদের পূর্বপুরুষদের বসবাস ছিল বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বিক্রমপুর অঞ্চলের হাসাড়া গ্রামে। পৈতৃক সূত্রে সংগীতচর্চা সরাসরি না থাকলেও, পারিবারিক পরিবেশ ছিল শিক্ষা ও সংস্কৃতিমুখী।
তার বাবা বিশ্বজিৎ ঘোষাল কর্মরত ছিলেন একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রকৌশলী হিসেবে এবং তাঁর মা সাহিত্যের ছাত্রী ছিলেন — যাঁর কাছ থেকেই শ্রেয়া শৈশবে সংগীতচেতনার প্রথম অনুপ্রেরণা পান। মাত্র চার বছর বয়স থেকেই তিনি হারমোনিয়ামে সঙ্গ দিতেন তাঁর মাকে। তার কণ্ঠের স্বরলিপি পরিবারে তখনই বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়।
শৈশবেই পরিবারের সঙ্গে রাজস্থানের কোটা জেলার রাওয়াতভাতা শহরে চলে যান শ্রেয়া। সেখানেই শুরু হয় তাঁর নিয়মিত ও গুরুভিত্তিক সংগীতশিক্ষা। ভারতীয় আধুনিক সঙ্গীতে তালিমের পাশাপাশি শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রাথমিক উপলব্ধিও তাঁর কণ্ঠকে করে তোলে সংবেদনশীল ও শুদ্ধ।
শ্রেয়া প্রথমে রাওয়াতভাতা ও পরে মুম্বাইয়ের অণুশক্তিনগরের Atomic Energy Central School (AECS)-এ পড়াশোনা করেন। স্কুলজীবনেই সংগীতচর্চা হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
পরবর্তীতে তিনি মুম্বাইয়ের SIES College of Arts, Science and Commerce-এ ভর্তি হন এবং স্নাতক পর্যায়ের লেখাপড়া সম্পন্ন করেন। কিন্তু সংগীতের প্রতি গভীর টান তাঁর জীবনপথ স্পষ্ট করে দিয়েছিল আগেই।
শ্রেয়ার প্রতিভার প্রথম বড় স্বীকৃতি আসে জিটিভির জনপ্রিয় সংগীত প্রতিযোগিতা Sa Re Ga Ma Pa-তে অংশগ্রহণের মাধ্যমে। শিশু সংস্করণে বিজয়ের পর তাঁর কণ্ঠে মুগ্ধ হন কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী ও সুরকার কল্যাণজি বীরজি শাহ। তাঁর পরামর্শেই শ্রেয়ার পরিবার মুম্বাইয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।
পেশাদার সংগীতজগতে প্রবেশের আগে শ্রেয়া দেড় বছর সরাসরি কল্যাণজীর তত্ত্বাবধানে সংগীতের প্রশিক্ষণ নেন। একই সঙ্গে আধুনিক ও শাস্ত্রীয় — দু’ধারার সংগীতশিক্ষাই সমান গুরুত্ব পায়।
২০০২ সাল শ্রেয়া ঘোষালের জীবনে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। পরিচালক Sanjay Leela Bhansali তাঁর কণ্ঠ শুনে তাঁকে আমন্ত্রণ জানান বলিউড চলচ্চিত্র Devdas-এ গান গাওয়ার জন্য।
এই ছবিতে ঐশ্বরিয়া রাই অভিনীত ‘পার্বতী’ চরিত্রে কণ্ঠ দিয়ে শ্রেয়া মাত্র এক ছবিতেই নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করে নেন। “ডোলা রে ডোলা” ও “বৈরী পিয়া” গান দুটি তাঁকে রাতারাতি স্টার বানিয়ে তোলে।
এর ফলস্বরূপ তিনি অর্জন করেন:
শ্রেয়া ঘোষাল সুযোগ পান কিংবদন্তি সুরকার A. R. Rahman-এর সঙ্গে কাজ করার। তাঁর সুরে ‘Barso Re’ (Guru) গানটি শ্রেয়াকে এনে দেয় বিপুল জনপ্রিয়তা।
তামিল ছবির Sillunu Oru Kadhal-এর গান “Munbe Vaa” তাঁকে দক্ষিণ ভারতেও সফলতার শিখরে পৌঁছে দেয়, যার জন্য তিনি Filmfare (South) ও Tamil Nadu State Award অর্জন করেন।
শ্রেয়া ঘোষালের অনন্য ক্ষমতা হলো বিভিন্ন ভাষার উচ্চারণ ও অনুভূতির প্রতি গভীর সংবেদনশীলতা। তিনি অনায়াসেই এক দিনের মধ্যে হিন্দি, তামিল, তেলুগু ও মালয়ালম ভাষায় গান রেকর্ড করতে পারেন — যা তাঁকে ব্যতিক্রমী শিল্পীতে পরিণত করেছে।
উল্লেখযোগ্য ভাষাসমূহ:
মাতৃভাষা বাংলাতেও শ্রেয়ার অবদান অনস্বীকার্য। আধুনিক বাংলা গান থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র সংগীতে তাঁর কণ্ঠ আজও অপরিহার্য।
চলচ্চিত্র Antaheen-এর গান “ফেরারি মন” তাঁর জীবনে নিয়ে আসে আরেকটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।
শ্রেয়া শুধু গায়িকা নন; তিনি একজন দক্ষ মেন্টরও। বিভিন্ন রিয়ালিটি শো-তে বিচারক হিসেবে তরুণ প্রতিভাদের পথ দেখিয়েছেন:
২০১৫ সালে শ্রেয়া ঘোষাল বিয়ে করেন তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু শিলাদিত্য মুখোপাধ্যায়-কে। বিবাহের পরও তাঁর কর্মজীবন সমানতালে এগিয়েছে।
তিনি মাত্র ২৬ বছর বয়সে চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়ে একটি ঐতিহাসিক নজির স্থাপন করেছেন। শ্রেয়া ঘোষাল মানেই কেবল গায়িকা নয়—এটি এক আবেগ, এক সংগীতদর্শন। তার কণ্ঠে যেমন শুদ্ধতা, তেমনই আছে সময়ের সুর। তিনি আজও প্রমাণ করে চলেছেন—সত্যিকারের প্রতিভার কোনো ভাষা হয় না, কোনো সীমানা হয় না।
মন্তব্য