সাইদ হাসান টিপু । বাংলাদেশী ব্যান্ড শিল্পী

আশির দশকের সেই উন্মাতাল সময়, যখন এদেশের তরুণদের বুকে গিটারের রিফ আর ড্রামসের বিট এক নতুন উন্মাদনা তৈরি করছে। ঠিক সেই রূপালী সময়ে বাংলার ব্যান্ড সংগীতের আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে এসেছিলেন সাঈদ হাসান টিপু। তিনি কেবল বাংলাদেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘অবসকিওর’ (Obscure)-এর প্রধান কণ্ঠশিল্পী ও প্রতিষ্ঠাতা নন, বরং বিগত চার দশক ধরে এদেশের পপ-রক ঘরানার গানকে ভালোবেসে আগলে রাখা এক নিষ্ঠাবান জাদুকর।

শৈশবের সুর আর খুলনা থেকে শুরু

১৯৬৭ সালের ১৬ জানুয়ারি খুলনার এক চেনা আলো-বাতাসে জন্ম নেন সাঈদ হাসান টিপু। আর দশটা ছেলের মতোই কেটেছে তাঁর সোনালী ছেলেবেলা। পড়াশোনায় যেমন ছিলেন তুখোড়, নিজের মনে গান গাওয়ার নেশাটাও ছিল ঠিক তেমনি তীব্র। তবে মজার ব্যাপার হলো, শুরুতে তিনি বাংলা গান নয়, বরং গলা ছেড়ে পশ্চিমা ইংরেজি গান গাইতেই বেশি ভালোবাসতেন। স্কুল-কলেজের বন্ধুদের আড্ডায় টিপু মানেই ছিল এক অন্যরকম এনার্জি। বন্ধুরা তাঁকে পেলেই গানের জন্য জেঁকে ধরত, আর তিনিও গিটার ছাড়াই একটার পর একটা ইংরেজি গান গেয়ে পুরো আড্ডার মেজাজ বদলে দিতেন।

ব্যান্ড জগতে পা এবং ‘অবসকিওর’-এর জন্মকাহিনি

টিপুর ভেতরের এই জাদুকরী কণ্ঠটা প্রথম চিনেছিলেন সেই সময়ের নামী সঙ্গীতশিল্পীরা। ১৯৮৪ সালের এক মাহেন্দ্রক্ষণে বিখ্যাত কীবোর্ডিস্ট মানাম আহমেদ টিপুকে ব্যান্ডে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। ব্যান্ডের সেই স্বর্ণযুগে নিজেকে যুক্ত করার লোভ সামলাতে পারেননি তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে (TSC) অডিশন দিয়ে যোগ দিলেন তখনকার জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘চাইম’-এ। সেই সময়ে চাইমের অন্যতম কাণ্ডারি টুলু ভাই টিপুর ইংরেজি গান শুনে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে দলে টেনে নেন।

চাইম-এ ইংরেজি গান দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করলেও টিপুর মনে তখন ছটফট করছিল নিজের একটা দল গড়ার স্বপ্ন। অবশেষে ১৯৮৫ সালের ১৫ মার্চ, খুলনা থেকেই জন্ম নিল নতুন এক তারা—‘অবসকিওর’। তারপরের গল্পটা শুধুই ইতিহাস। বিগত দীর্ঘ ৩৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে শত ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে ‘অবসকিওর’ নামটিকে একাই টেনে নিয়ে গেছেন তিনি।

১৯৮৬ সালে সারগাম স্টুডিও থেকে বাজারে আসে তাঁদের প্রথম অ্যালবাম ‘অবসকিউর ভলিউম-১’। প্রথম অ্যালবাম দিয়েই শ্রোতাদের বুকের ভেতর ঝড় তোলে এই ব্যান্ড।

সুরের মায়াজাল: অ্যালবাম ও কালজয়ী গানসমূহ

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অবসকিওর ব্যান্ড থেকে মোট ১২টি কালজয়ী অ্যালবাম উপহার দিয়েছেন টিপু। এছাড়া ব্যান্ডের বাইরে তাঁর একক কণ্ঠের অ্যালবাম রয়েছে ৩টি।

টিপুর সেই মখমলে অথচ চনমনে কণ্ঠে এমন কিছু গান আছে, যা আজও মাঝরাতে কোনো একলা তরুণের চোখে জল এনে দেয়, আবার কোনো গান অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুকের রক্ত গরম করে তোলে। তাঁর শ্রোতাপ্রিয় কিছু গানের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

ব্যান্ডের কালজয়ী গানসমূহটিপুর একক জনপ্রিয় গান

* মাঝ রাতে চাঁদ যদি আলো না বিলায়

* সেই তুমি কোথায়

* নিঝুম রাতের আঁধারে

* ছাইড়া গেলাম মাটির পৃথিবী

* কলিকালের ভণ্ড বাবা

* বিধি তোমার কেমন খেলা

* তুমি ছিলে কাল রাতে

* মমতায় চেয়ে থাকা

* স্বাধীনতার বীজমন্ত্র

* আজাদ / দেশ ছাড় রাজাকার / তিস্তা / ফিলিস্তিনি

* একাকী একজন

 

* আমার আমি ছাড়া

 

* আমার মন

ব্যক্তিগত জীবন ও অর্জন:

ব্যক্তিগত জীবনে সাঈদ হাসান টিপু এক ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের সাথে বাঁধা। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদ, কালজয়ী সুরকার আলতাফ মাহমুদের সুযোগ্য কন্যা শাওন মাহমুদ তাঁর সহধর্মিণী।

কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ সাঈদ হাসান টিপু এবং তাঁর ব্যান্ড অবসকিওর বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৫ সালে তাঁরা লাভ করেন ‘আরটিভি ভিউয়ার্স চয়েস’ পুরস্কার। এছাড়া তাঁদের জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায় ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে টানা দুইবার দেশের মর্যাদাপূর্ণ ’চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড’-এ সেরা ব্যান্ডের শিরোপা লাভ করে ‘অবসকিওর’।

সাঈদ হাসান টিপু কেবল একজন গায়ক নন, তিনি আমাদের তারুণ্যের স্মৃতির এক জীবন্ত দলিল। তাঁর গান আজও বাঙালির আড্ডায়, একাকীত্বে আর দ্রোহে এক পশলা বৃষ্টির মতো শান্তি দিয়ে যায়।

Leave a Comment