গায়ক যদুভট্ট । শিল্পী জীবনী

গায়ক যদুভট্টঃ এই সংসারে এমন কিছু আছে তা তথাকথিত সীমিত জ্ঞান দিয়ে বিচার করা চলে না, একে বুদ্ধি দ্বারা যথাযথ ব্যাখ্যাও করা যায় না। তেমনই এক আশ্চর্য্য প্রতিভার জাগ্রত প্রকাশ ঘটেছিল সাধক যদুভট্টের জীবনে।

তাঁর সাঙ্গীতিক জীবনকে নিয়ে এমন বহু বিংতৃন্তী প্রচলিত আছে যা, যুক্তি তর্কের গ্রাহ্যের বাইরে। কথিত আছে যে, তিনি কোন অজ্ঞাত রাগ শুনে সঙ্গে সঙ্গে নিজে পদ রচনা করে নির্ভুলভাবে পরিবেশন করতে পারতেন। এত বড় অবিশ্বাস্য শ্রুতিধর তানসেনের পরবর্তীকালে আর কেউ ছিলেন কিনা তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ আজ পর্যন্ত পাওয়া যায় নি।

 

গায়ক যদুভট্ট । শিল্পী জীবনী

 

গায়ক যদুভট্ট

এই স্বনামধন্য গায়ক ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরের ওই পাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার মান ছিল মধুসূদন ভট্টাচার্য্য (মধুতী)। তিনি সঙ্গীত বিদ্যায় বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। পিতার সঙ্গীতপ্রীতি যদুনাথ ভট্টাচার্যের (যদুভট্ট) জীবনে গভীর রেখাপাত করে। বাল্যকালে তাঁর পিতার নিকট যদুভট্ট কণ্ঠ সঙ্গীত, ভিন্নমতে সেতার শিক্ষা করেন। প্রায় সাত, আট বৎসর বয়স থেকে চৌদ্দ বৎসর পর্যন্ত তিনি বিষ্ণুপুরের তৎকালীন প্রখ্যাত গায়ক সঙ্গীতাচার্য্য রামশঙ্কর ভট্টাচার্য্য মহাশয়ের কাছে সঙ্গীত শিক্ষা করেন। গুরুর উপযুক্ত শিক্ষা ও শিষ্যের নিষ্ঠা এবং জন্মপ্রতিভা সম্পৃক্ত হয়ে কাল উত্তীর্ণ কারী শিল্পীর জন্ম হয়।

গুরুর মৃত্যুর পর প্রায় পনেরো বৎসর বয়সে তিনি কলকাতা চলে আসেন এবং তৎকালীন প্রখ্যাত ধ্রুপদীয়া গঙ্গানারায়ন চট্টোপাধ্যায়ের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। সঙ্গীতের প্রতি আকাঙ্ক্ষা এবং তীব্র জ্ঞান পিপাসার জ্বালায় স্থির থাকতে না পেরে তিনিই সর্বপ্রথম বিষ্ণুপুর ঘরাণার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ না রেখে ভারতের নানাস্থানে শিক্ষা করেন। তাঁর সঙ্গীত প্রতিভার পরিচয় সর্বভারতে এবং সঙ্গীত পীঠস্থান রামপুর ও গোয়ালিয়রে ছড়িয়ে পড়ে।

 

Google news
গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন

 

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরও ওস্তাদ যদুভট্টের গানে সবিশেষ মুগ্ধ হয়ে তাঁকে বাড়ির ছেলেমেয়েদের সঙ্গীত শিক্ষকরূপে নিযুক্ত করেন। যতটুকু জানা যায় যদুভট্ট বিষমছনদ এবং বিষমপদী তাল বিশেষ পছন্দ করতেন। গুরুর এই প্রভাব শিষ্য রবীন্দ্রনাথকেও প্রভাবিত করে। মনে হয় সেই কারণে রবীন্দ্রসৃষ্ট সমস্ত তালগুলি বিষমপদী ছন্দের এবং কবির প্রথম বয়সের গানগুলো প্রায় সবই গুরুর প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে রাগের ভিত্তিতে সুরারোপিত।

কণ্ঠসঙ্গীতের মতো পাখোয়াজ বাদনেও যদুভট্ট যথেষ্ট পারদর্শী ছিলেন। যদুভট্টের সঙ্গীত প্রতিভার সম্যক পরিচয় কবিগুরুর বক্তব্য থেকে স্পষ্টতর হয়- “বাংলাদেশে এরকম ওস্তাদ জন্মায় নি। তাঁর প্রত্যেক গানে একটি স্বকীয়তা ছিল। তাঁর গানের মধ্যে যে বিশিষ্ট্যতা ছিল তা অন্য কোন হিন্দুস্থানী গানে পাওয়া যায় না। যদুভট্টের মত সঙ্গীত ভাবুক আধুনিক ভারতে আর কেউ জন্মেছিল কিনা সন্দেহ।”

 

গায়ক যদুভট্ট । শিল্পী জীবনী

 

বাংলার গর্ব গায়ক যদুভট্ট সারা ভারতের বহু জায়গায় সঙ্গীত পরিবেশন করে নিজ প্রতিভার সাক্ষ্য দেন এবং অনেক রাজসভায় সভা-গায়কের পদ অলংকৃত করেন। সাঙ্গীতিক প্রতিভা ও অপূর্বসৃজনী শিল্পকলা নৈপূন্য প্রদর্শনের স্বীকৃতি স্বরূপ “রঙ্গনাথ” এবং “তানরাজ” উপাধিতে সম্মানিত হন। যদভুট্ট স্কুল কলেজের তথাকথিত শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না কিন্তু জন্মলব্ধ ক্ষমতার শুনে বহু হিন্দী ও বাংলা গান রচনা করেছেন, উক্ত গানগুলির মধ্যে তাঁর শিক্ষা ও মানসিক গভীরতার সাক্ষ্য মিলে।

ত্রিপুরা রাজদরবারে থাকাকালীন তিনি ক্রমে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেহেতু তিনি কলকাতার নিকটস্থ কাঁচরাপাড়ায় তাঁর শ্বশুরালয়ে চলে আসেন। কিন্তু স্বাস্থ্যের ক্রম- অবনতির জন্য শেষ পর্যন্ত তাঁর জন্মস্থান বিষ্ণুপুরে চলে যান। ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি এই ধরাধামের কর্মসম্পন্ন করে মাত্র ৪৩ বৎসর বয়সে নিত্যাধ্যমের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।

Leave a Comment