আজকের দিনে বিশ্ব সংগীতের আলোচনা ‘কে-পপ’ বা কোরিয়ান পপ ছাড়া সম্পূর্ণ অসম্ভব। দক্ষিণ কোরিয়ার গণ্ডি ছাড়িয়ে এই ধারা এখন বিশ্ব সংস্কৃতির অন্যতম চালিকাশক্তি এবং বহু বিলিয়ন ডলারের একটি শক্তিশালী শিল্প। তবে এই বিশ্বজয় কিন্তু রাতারাতি ঘটেনি। গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সুপরিকল্পিত প্রশিক্ষণ, নিখুঁত কোরিওগ্রাফি, ব্যবসায়িক কৌশল এবং শিল্পীদের কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে আজকের এই অবস্থানে পৌঁছেছে কে-পপ। এর পেছনের দীর্ঘ ও রোমাঞ্চকর ইতিহাসকে কয়েকটি মাইলফলকের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো।
Table of Contents
সূচনালগ্ন ও আইডল সংস্কৃতির বিকাশ (১৯৯২-২০০০)
আধুনিক কে-পপের জন্ম ধরা হয় ১৯৯২ সালকে। সে বছর ‘সিও তাইজি অ্যান্ড বয়েজ’ নামের একটি গ্রুপ কোরিয়ার ঐতিহ্যবাহী সংগীতের ধারায় প্রথম হিপহপ, র্যাপ, রক ও পাশ্চাত্য পপের মিশ্রণ ঘটায়। তাদের গানে উঠে আসে তরুণদের জীবনের গল্প, সামাজিক বাস্তবতা ও প্রতিবাদ, যা কোরিয়ার তরুণ সমাজকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে।
এরপর ১৯৯৬ সালে বিনোদন সংস্থা ‘এসএম এন্টারটেইমেন্ট’ সম্পূর্ণ নতুন এক ব্যবসায়িক মডেল নিয়ে আসে। তারা গঠন করে ‘হাই-ফাইভ অব টিনএজার’ (এইচওটি) নামের গ্রুপ। এটিই ছিল প্রথম দল, যাদের দীর্ঘস্থায়ী ও সুশৃঙ্খল প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ‘আইডল’ হিসেবে গড়ে তোলা হয়। তাদের চমৎকার দলীয় নাচ, আধুনিক ফ্যাশন ও ভক্তদের সাথে যুক্ত থাকার কৌশল পরবর্তী কে-পপ দলগুলোর জন্য মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৯৯ সালে ‘গ্রুভ ওভার ডোজ’ (জিওডি) নামের একটি বয় ব্যান্ড ‘টু মাদার’ গানের মাধ্যমে সব বয়সী শ্রোতার মন জয় করে নেয়। গান গাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন রিয়েলিটি শোতে অংশ নিয়ে তারা প্রমাণ করে যে, একজন কে-পপ আইডলের কাজের পরিধি শুধু গান গাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর পরপরই ২০০০ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে বোয়া নামের এক একক নারী শিল্পী কোরিয়ান, জাপানি ও ইংরেজি ভাষায় গান গেয়ে জাপানের বিখ্যাত অরিকন চার্টের শীর্ষে স্থান করে নেন, যা ছিল কোরিয়ান কোনো শিল্পীর জন্য প্রথম বৈশ্বিক সাফল্য।
এশিয়া জয় এবং বৈশ্বিক বাজারের সন্ধান (২০০৩-২০১১)
২০০৩ সালে ‘টিভিএক্সকিউ’ নামের একটি দল তাদের চমৎকার কণ্ঠ ও নিখুঁত নাচের মাধ্যমে দ্রুত এশিয়াজুড়ে জনপ্রিয়তা পায়। ২০০৯ সালে জাপানের ঐতিহ্যবাহী টোকিও ডোমের কনসার্টের সব টিকিট বিক্রি করে তারা নিজেদের শক্তির জানান দেয়। ২০০৫ সালে ‘সরি, সরি’ গানটি দিয়ে ‘সুপার জুনিয়র’ এশিয়াজুড়ে এক অভাবনীয় উন্মাদনা তৈরি করে। এর ঠিক পরের বছর অর্থাৎ ২০০৬ সালে ‘বিগব্যাং’ নিজেদের গান নিজেরা লিখে ও সুর করে আইডল সংস্কৃতির প্রচলিত ধারণা বদলে দেয়।
২০০৮ সালে কে-পপ প্রথম পা রাখে মার্কিন বাজারে। ‘ওয়ান্ডার গার্লস’ নামের একটি গার্ল গ্রুপ তাদের ‘নোবডি’ গানের ইংরেজি সংস্করণ দিয়ে বিলবোর্ড হট ১০০-এ স্থান করে নেয়। যদিও তাদের সেই সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, তবে তারা পশ্চিমা বিশ্বের দুয়ার খুলে দিয়েছিল। ২০০৯ সালে ‘গার্লস জেনারেশন’ তাদের ‘জি’ গানটি দিয়ে কোরিয়ার ইতিহাসে দীর্ঘদিন এক নম্বরে থাকার রেকর্ড গড়ে ‘জাতীয় গার্ল গ্রুপ’-এর মর্যাদা পায়। একই বছর ‘শাইনি’ নামের আরেকটি দল তাদের তীক্ষ্ণ কোরিওগ্রাফি ও আধুনিক ফ্যাশন দিয়ে পারফরম্যান্সের নতুন ধারা তৈরি করে। ২০১১ সালে ‘টোয়েন্টিওয়ান’ (2NE1) তাদের ‘আই অ্যাম দ্য বেস্ট’ গানটি দিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে।
ডিজিটাল বিপ্লব ও বিশ্বজুড়ে আধিপত্য (২০১২-২০২৬)
২০১২ সালটি ছিল কে-পপের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট। একক শিল্পী সাই-এর ‘গ্যাংনাম স্টাইল’ গানটি বিশ্বজুড়ে এক প্রবল ঝড় তোলে। এটিই ছিল ইউটিউবের ইতিহাসে এক বিলিয়ন ভিউ পাওয়া প্রথম ভিডিও। গানটি বিলবোর্ড হট ১০০-এর দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে এবং কে-পপকে বিশ্বের মূলধারার সংগীতে প্রতিষ্ঠা করে। ২০১৩ সালে ‘এক্সো’ (EXO) তাদের ‘এক্সোএক্সো’ অ্যালবামের এক মিলিয়নেরও বেশি কপি বিক্রি করে ডিজিটাল যুগে এক বিরল রেকর্ড গড়ে। ২০১৫ সালে ‘টোয়াইস’ তাদের ‘চিয়ার আপ’ ও ‘টিটি’ গান দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের পপ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
২০১৯ সালে ‘ব্ল্যাকপিংক’ আমেরিকার বিখ্যাত কোচেলা উৎসবে প্রথম কে-পপ গ্রুপ হিসেবে পারফর্ম করে ইতিহাস তৈরি করে। বর্তমানে ইউটিউবে ১০ কোটির বেশি সাবস্ক্রাইবার নিয়ে তারা বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ব্যান্ড। ২০২০ সালে ‘বিটিএস’ (BTS) প্রথম কে-পপ দল হিসেবে গ্র্যামি পুরস্কারের মনোনয়ন পায় এবং তাদের ‘ডায়নামাইট’ গানটি দিয়ে বিলবোর্ড হট ১০০-এর শীর্ষস্থান দখল করে। তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য ও জীবনের গল্প নিয়ে তৈরি তাদের গান বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তের (যা ‘আর্মি’ নামে পরিচিত) হৃদয় জয় করেছে।
পরবর্তী প্রজন্মের দল হিসেবে ২০২৫ সালে ‘স্ট্রে কিডস’ অনন্য এক রেকর্ড গড়ে, যেখানে তাদের অ্যালবাম টানা অষ্টমবারের মতো বিলবোর্ড ২০০-এর শীর্ষে স্থান পায়। বর্তমানে ২০২৬ সালে এসে ‘অল ডে প্রজেক্ট’-এর মতো পঞ্চম প্রজন্মের দলগুলো সংগীত, ফ্যাশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মিশেলে পারফরম্যান্সের মানদণ্ডকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাচ্ছে।
নিচে গত তিন দশকে কে-পপের এই অবিস্মরণীয় যাত্রার একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা দেওয়া হলো:
কে-পপ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক
| বছর | শিল্পী/গ্রুপের নাম | প্রধান অর্জন/অবদান |
| ১৯৯২ | সিও তাইজি অ্যান্ড বয়েজ | হিপহপ ও পাশ্চাত্য পপের মিশ্রণে আধুনিক কে-পপের সূচনা। |
| ১৯৯৬ | হাই-ফাইভ অব টিনএজার (H.O.T.) | প্রথম সুপ্রশিক্ষিত আইডল গ্রুপ, যা ভবিষ্যৎ কে-পপের পথপ্রদর্শক। |
| ১৯৯৯ | জিওডি (g.o.d) | রিয়েলিটি শো ও গানের মাধ্যমে সব বয়সী শ্রোতার কাছে জনপ্রিয়তা লাভ। |
| ২০০০ | বোয়া (BoA) | জাপানের অরিকন চার্টের শীর্ষে ওঠা প্রথম কোরিয়ান নারী শিল্পী। |
| ২০০৩ | টিভিএক্সকিউ (TVXQ) | জাপানের টোকিও ডোম ও ‘বিগিন অ্যাগেইন’ সফরে রেকর্ড টিকিট বিক্রি। |
| ২০০৫ | সুপার জুনিয়র | ‘সরি, সরি’ গানের মাধ্যমে এশিয়াজুড়ে তুমুল জনপ্রিয়তা। |
| ২০০৬ | বিগব্যাং | নিজেদের গান নিজেরা তৈরি করে আইডল সংস্কৃতির ধারণা পরিবর্তন। |
| ২০০৮ | ওয়ান্ডার গার্লস | ‘নোবডি’ গান দিয়ে বিলবোর্ড হট ১০০-এ স্থান পাওয়া প্রথম কোরিয়ান দল। |
| ২০০৯ | গার্লস জেনারেশন | ‘জি’ গান দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় দীর্ঘদিন এক নম্বরে থাকার রেকর্ড। |
| ২০০৯ | শাইনি | তীক্ষ্ণ কোরিওগ্রাফি ও পরীক্ষাধর্মী সংগীতের নতুন ধারা তৈরি। |
| ২০১১ | টোয়েন্টিওয়ান (2NE1) | ‘আই অ্যাম দ্য বেস্ট’ গান দিয়ে আন্তর্জাতিক ভক্তগোষ্ঠী তৈরি। |
| ২০১২ | সাই (PSY) | ‘গ্যাংনাম স্টাইল’ দিয়ে ইউটিউবে প্রথম ১ বিলিয়ন ভিউয়ের বিশ্ব রেকর্ড। |
| ২০১৩ | এক্সো (EXO) | ডিজিটাল যুগে প্রথম অ্যালবাম হিসেবে ১ মিলিয়নের বেশি কপি বিক্রি। |
| ২০১৫ | টোয়াইস (TWICE) | দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও পপ সংস্কৃতির অংশ হওয়া। |
| ২০১৯ | ব্ল্যাকপিংক | কোচেলায় প্রথম কে-পপ গ্রুপ এবং ইউটিউবে ১০ কোটি সাবস্ক্রাইবারের মাইলফলক। |
| ২০২০ | বিটিএস (BTS) | ‘ডায়নামাইট’ দিয়ে বিলবোর্ড শীর্ষস্থান এবং প্রথম কে-পপ দল হিসেবে গ্র্যামি মনোনয়ন। |
| ২০২৫ | স্ট্রে কিডস | টানা অষ্টমবারের মতো বিলবোর্ড ২০০-এর শীর্ষে অ্যালবামের অভিষেক। |
| ২০২৬ | অল ডে প্রজেক্ট | পঞ্চম প্রজন্মের দল হিসেবে বৈশ্বিক পারফরম্যান্সে নতুন মানদণ্ড স্থাপন। |
এক সময়ের স্থানীয় একটি সংগীত ধারা আজ যেভাবে ভাষা ও সংস্কৃতির প্রাচীর ভেঙে বিশ্বকে মাতিয়ে রাখছে, তা সত্যিই বিস্ময়কর। কে-পপের এই জয়যাত্রা প্রমাণ করে যে, সঠিক পরিকল্পনা ও সৃজনশীলতার মেলবন্ধন ঘটলে যেকোনো আঞ্চলিক সৃষ্টিই বৈশ্বিক রূপ নিতে পারে।
