প্রচারবিমুখতা আর খ্যাতির মোহ থেকে শতহস্ত দূরে থেকে যিনি শব্দ দিয়ে মানুষের মনের গভীরে জায়গা করে নিয়েছেন, তিনি সালাউদ্দিন সাগর। বর্তমান সময়ের অন্যতম ব্যস্ত ও জনপ্রিয় এই গীতিকার মিডিয়ার লাইমলাইট বা খবরের শিরোনাম হওয়ার চেয়ে গানের লিরিক বা কথার বুননকেই বেশি প্রাধান্য দেন। ‘যদি মনটা চুরি করি’, ‘কালাচান’, ‘দুই চাক্কার সাইকেল’ কিংবা ‘শিকারি’-এর মতো অসংখ্য সুপারহিট গান উপহার দিলেও তিনি নিজেকে নিভৃতচারী এক শব্দসৈনিক হিসেবে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় জনপ্রিয় শিল্পীদের কণ্ঠে তার লেখা গানগুলো প্রতিদিন কোটি শ্রোতার হৃদয়ে প্রতিধ্বনি তুললেও এই সফলতার পেছনে রয়েছে তার দীর্ঘদিনের নিরলস সাধনা ও জীবনের নানা চড়াই-উতরাইয়ের গল্প।
১৯৮৭ সালের ১১ জুলাই কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন সালাউদ্দিন। তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনি পরিবারের বড় সন্তান। লেখালেখির নেশা তার রক্তে মিশে ছিল ছোটবেলা থেকেই। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি জানান, ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তার কবিতা ও ছড়া লেখার অভ্যাস শুরু হয়। সেই সময় শিক্ষক ও সহপাঠীদের কাছে তিনি কবি হিসেবে বেশ পরিচিত হয়ে ওঠেন। শুরুর দিকে স্কুলজীবনে তার লেখা গান বন্ধু বেলাল হোসেনের কণ্ঠে গীত হতো। তবে জীবনের নানা ব্যস্ততা পেরিয়ে দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৮ সালে তার লেখা গান আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম আলোর মুখ দেখে। মূলত ২০১৯ সাল থেকে পেশাদার গীতিকার হিসেবে দেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে তার পরিচিতি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। দীর্ঘ আট বছরের এই ক্যারিয়ারে তিনি ইতোমধ্যে প্রায় চার শতাধিক গান লিখে ফেলেছেন।
পেশাগত জীবনে সালাউদ্দিন বন্দরনগরী চট্টগ্রামের একটি স্বনামধন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন। করপোরেট চাকরির কঠিন নিয়ম ও আটপৌরে কর্মব্যস্ততার ফাঁকে তিনি তার ভেতরের সৃজনশীল সত্তাটিকে পরম যত্নে বাঁচিয়ে রেখেছেন। অফিসের দায়িত্ব পালন শেষে যখনই অবসর পান, তখনই খাতা-কলম নিয়ে বসে পড়েন সুরের জাদুকর। তার সৃষ্টিশীল হাত দিয়ে একে একে জন্ম নেয় আধুনিক পপ, মন ছুঁয়ে যাওয়া মেলোডি কিংবা মাটির কাছাকাছি থাকা ফোক ঘরানার চমৎকার সব গান।
পেশাগত চাকরি, সংসার জীবন এবং গানের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ—এই তিনের ভারসাম্য বজায় রাখা মোটেও সহজ নয়। সালাউদ্দিনের ব্যক্তিগত জীবনেও এর প্রভাব রয়েছে। অনেক সময় গান লিখতে গিয়ে রাত পেরিয়ে ভোর হয়ে যায়। এই গান লেখার ঘোরে অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের ঠিকমতো সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। এ নিয়ে মাঝেমধ্যে স্ত্রীর সঙ্গে ছোটখাটো মনোমালিন্যও তৈরি হয়। তবে তার কোনো একটি গান যখন বাজারে আসার পর সুপার হিট হয়, তখন পরিবারের সবার সেই সব অভিমান নিমিষেই কর্পূরের মতো উড়ে যায় এবং সবাই তার সাফল্যে আনন্দিত হন।
সঙ্গীত অঙ্গনের এই শীর্ষ চাহিদাসম্পন্ন গীতিকার কখনোই নিজের ঢাক নিজে পেটাতে পছন্দ করেন না। প্রচারের আলো থেকে বরাবরই নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখেন তিনি। নিজের অর্জন নিয়ে তার মূল্যায়ন অত্যন্ত বিনম্র। বিশাল এই বাংলা গানের সাম্রাজ্যের তুলনায় নিজের অবদানকে তিনি কেবল এক বিন্দু জলের সঙ্গে তুলনা করেন। তার মতে, মুখের বাহবা পাওয়ার চেয়ে কাজের মধ্য দিয়ে মানুষের মনে বেঁচে থাকা অনেক বেশি শান্তির। ভালো কাজ করলে শ্রোতারা নিজ থেকেই তা মনে রাখবে। প্রচারের আলোয় আসার চেয়ে নিভরে ভালো গান তৈরি করে যাওয়াটাই তার জীবনের মূল ব্রত।














