সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ই নভেম্বর ২০২২, ১১:৪৮ এএম

চন্দনা মজুমদার একজন প্রখ্যাত বাংলাদেশি লালন সংগীতশিল্পী, যিনি লোকসংগীতের জগতে এক অনন্য অবদান রেখেছেন। তাঁর গানে লালন ফকিরের দর্শন, রাধারমণের ভক্তিময় সুর এবং শাহ আবদুল করিমের গভীর অনুভূতি মিলেমিশে একাকার হয়ে উঠেছে। ২০০৯ সালে ‘মনপুরা‘ চলচ্চিত্রের জন্য কৃষ্ণকলির সাথে যৌথভাবে সেরা নারী প্লেব্যাক কণ্ঠশিল্পীর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে তিনি জাতীয় স্তরে স্বীকৃতি পান। লালনগীতির পাশাপাশি তিনি রাধারমণ, হাসন রাজা, শাহ আবদুল করিম এবং অন্যান্য গীতিকবিদের গানে তাঁর অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করেছেন। তাঁর গানের মাধ্যমে লোকসংগীতের ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়াস তাঁকে একজন সত্যিকারের সাংস্কৃতিক দূত করে তুলেছে। বাংলাদেশের লোকসংগীতের পটভূমিতে তাঁর নাম একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বল করে।

Table of Contents
চন্দনা মজুমদারের জন্ম ১৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি উপজেলার কুন্ডুপাড়া গ্রামে, গড়াই নদীর তীরে। এই অঞ্চলটি লালন ফকিরের আখড়ার কাছাকাছি, যা তাঁর জীবনের প্রথম দিন থেকেই সাংস্কৃতিক প্রভাব ফেলেছে। তাঁর বাবা নির্মলচন্দ্র মজুমদার ছিলেন একজন প্রখ্যাত লালন সংগীতশিল্পী এবং থিয়েটার অভিনয়শিল্পী, যিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং বাংলাদেশ বেতারের সাথে যুক্ত ছিলেন। মা অনিমা মজুমদার (মৃত) ছিলেন পরিবারের স্তম্ভ, যিনি গানের অনুষ্ঠানে আসা অতিথিদের জন্য রান্না করে সেবা করতেন। চন্দনা চার ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে বড়।
তাঁর শৈশব কেটেছে প্রকৃতির কোলে, গ্রামের বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা করে এবং রাতের গানের আসরে ঘুরে বেড়িয়ে। বাবা চেয়েছিলেন তিনি নজরুলগীতির শিল্পী হন, কিন্তু কুষ্টিয়ার পারিবারিক পরিবেশ, লালনের আখড়ার সান্নিধ্য এবং ফরিদা পারভীনের গানের প্রভাব তাঁকে লালনের সুরের দিকে টেনে নেয়। ছোটবেলায় বাবা নির্মলচন্দ্র মজুমদারের কাছে গানের প্রথম তালিম নেন। তাঁর প্রথম গান শেখা নজরুলের “কানন গিরি সিন্ধু পর”। একটি স্মরণীয় ঘটনায়, ছোটবেলায় মঞ্চে গান গাইতে গিয়ে লিরিক্স ভুলে যান, কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও দৃঢ় করে। কুমারখালি গার্লস স্কুল থেকে ১৯৮৯ সালে মাধ্যমিক এবং কুমারখালি কলেজ থেকে ১৯৯১ সালে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেন। উচ্চশিক্ষা সম্পূর্ণ করেননি, কারণ সঙ্গীতের প্রতি পূর্ণ নিবেদন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে নজরুল সঙ্গীতে পাঁচ বছরের কোর্স সম্পন্ন করেন। লালন গানে প্রশিক্ষণ নেন ফকির মকসেদ আলী সাঁই (৫ বছরেরও বেশি) এবং খোদা বক্স সাঁই (১০ বছরেরও বেশি) কাছে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রশিক্ষণও নেন, যা তাঁর গানকে আরও গভীরতা দেয়। কুষ্টিয়ার কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের বাড়ি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি, মীর মশাররফ হোসেনের পৈতৃক বাড়ি এবং লালনের আখড়ার সান্নিধ্য তাঁর শৈশবকে সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ করে।

চন্দনা মজুমদারের সঙ্গীত যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে এবং ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ বেতারে তালিকাভুক্ত হয়ে। খোদা বক্স সাঁইয়ের সহায়তায় এই সুযোগ পান। ১৯৮৩ সালে সঙ্গীতশিল্পী জেন আলমের হাত ধরে শিল্পী জগতে প্রবেশ করেন। তাঁর প্রথম সোলো অ্যালবাম (ভলিউম ১) লালনের ১২টি গান নিয়ে, যা ১৯৮০-এর দশকে প্রকাশিত হয়। পরবর্তী অ্যালবাম ‘পল্লীগীতি-২’ (সার্গাম মিউজিক স্টেশন থেকে) জনপ্রিয়তা লাভ করে, যার গানগুলোর মধ্যে ‘কাঁকড়ের কলশি মাঝি গিয়েছে ভাসি’, ‘ওরে কোন বাজরে বাঁশিরে’ ইত্যাদি অন্যতম। তিনি লালনের গানের পাশাপাশি রাধারমণ, হাসন রাজা, শাহ আবদুল করিম, কবিয়াল বিজয় সরকার এবং অন্যান্য লোককবিদের গান গেয়ে পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর গানে লোকসংগীতের খাঁটি আবহ এবং গভীর অনুভূতি ফুটে ওঠে।
তিনি চলচ্চিত্র জগতেও পদার্পণ করেন। ‘মধু চন্দ্রিমা’, ‘মা’, ‘গুলবাহার’ এবং ‘মনপুরা’ চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক গান গেয়েছেন। ‘মনপুরা’ (২০০৯) চলচ্চিত্রের গান তাঁকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এনে দেয়। পরিচালক গিয়াসউদ্দিন সেলিমের সাথে সহযোগিতায় এই সাফল্য আসে। এছাড়া রাইসুল তমালের ‘আদা সমুদ্দুর’ নাটকে ‘কান্নার ঢেউ’ গানে কণ্ঠ দেন। ‘ফেলানী’ চলচ্চিত্রে (কুড়িগ্রাম সীমান্তে নিহত কিশোরী ফেলানীকে নিয়ে) গান গেয়ে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করেন। তাঁর সহধর্মী কিরণ চন্দ্র রায়ও একজন বাউল শিল্পী, যা তাঁদের সঙ্গীত জীবনকে আরও সমৃদ্ধ করে। বর্তমানে তিনি ঢাকার ছায়ানটে সিনিয়র শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁর পারফর্ম্যান্স ভারত, চীন, জাপান, সুইডেন, সিঙ্গাপুর, কাতার, উজবেকিস্তান এবং সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের জুরিখে একটি কনসার্টে দর্শকরা তাঁকে সুইস ফ্র্যাঙ্কের মালা দিয়ে সম্মানিত করেন।

চন্দনা মজুমদারের কণ্ঠে লালনের গান সবচেয়ে বেশি শোনা গেছে, কিন্তু তিনি ২৫টিরও বেশি সোলো অ্যালবাম প্রকাশ করেছেন, যা কনকর্ড, সার্গাম, ডন লেবেল থেকে বেরিয়েছে। উল্লেখযোগ্য অ্যালবামগুলোর মধ্যে রয়েছে:
তিনি জলাল উদ্দিন খান, হাসন রাজা এবং উকিল মুন্সির গান নিয়ে অ্যালবাম প্রকাশের পরিকল্পনা করেছেন। তাঁর গানের চর্চা একক টেকে রেকর্ডিংয়ের যুগ থেকে শুরু, যা ১৯৮০-৯০-এর দশকে রাতভর ১২টি গান রেকর্ড করার মতো চ্যালেঞ্জিং ছিল। তাঁর অবদান লোকসংগীতের সংরক্ষণ এবং জনপ্রিয়তায় অসাধারণ।
২০০৯ সালে ‘মনপুরা’ চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (সেরা নারী প্লেব্যাক কণ্ঠশিল্পী) লাভ করেন। এছাড়া তাঁর অ্যালবামগুলো বাণিজ্যিকভাবে সফল এবং সমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁর পারফর্ম্যান্স স্বীকৃতি এনে দিয়েছে।
চন্দনা মজুমদারের স্বামী কিরণ চন্দ্র রায়ও একজন লোকসংগীতশিল্পী, যা তাঁদের সঙ্গীত জীবনকে আরও সমৃদ্ধ করে। তাঁদের কন্যা শতাব্দী রায় মজুমদার পশ্চিমবঙ্গের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মিডিয়া স্টাডিজে মাস্টার্স করছেন এবং শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। চন্দনা মজুমদারের স্বপ্ন একটি সঙ্গীত বিদ্যালয় স্থাপন করা, যেমন তাঁর বাবা কুমারখালি সঙ্গীত বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। তিনি লোকগানের খাঁটি সুর এবং লিরিক্স রক্ষা করার উপর জোর দেন এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই ঐতিহ্য ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াস করেন।
চন্দনা মজুমদারের সঙ্গীত জীবন বাংলাদেশের লোকসংগীতের একটি জীবন্ত অধ্যায়। তাঁর গানে লালনের দর্শন এবং লোকসংগীতের আত্মা জাগরূক হয়ে ওঠে, যা ভবিষ্যত প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।
মন্তব্য