ছায়ানটে আলেখ্যানুষ্ঠান ‘এসেছে রবির কর’: রবীন্দ্রচেতনার শৈল্পিক বন্দনা

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান, কবিতা, তাঁর প্রতি নিবেদিত কাব্যগাথা ও স্মৃতিকথনের এক অপূর্ব মেলবন্ধনে গত শনিবার সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এক বিশেষ আলেখ্যানুষ্ঠান। ‘এসেছে রবির কর’ শিরোনামের এই মনোজ্ঞ আয়োজনটি দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। রাজধানীর ধানমন্ডির ঐতিহ্যবাহী ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবন মিলনায়তনে বসেছিল সুর ও বাণীর এই অনন্য আসর। তরতাজা একঝাঁক প্রতিভার আবৃত্তি প্রয়াস ‘মন্ত্রমুগ্ধ’-এর প্রথম আনুষ্ঠানিক উপস্থাপনা ছিল এই আয়োজন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বহুমাত্রিক জীবনদর্শন, গভীর সাহিত্যভাবনা এবং চিরন্তন মানবিক চেতনার প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করতেই এই সুন্দর উদ্যোগ নেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানের মূল ভাবনায় উঠে আসে রবীন্দ্রনাথের কালজয়ী ব্যক্তিত্বের নানা দিক। আয়োজকেরা স্মরণ করিয়ে দেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ কবি কিংবা ঔপন্যাসিকই নন; একই সঙ্গে তিনি ছিলেন এক মহান কর্মযোগী, দার্শনিক, দূরদর্শী শিক্ষাচিন্তক ও খাঁটি মানবতাবাদী। বাঙালির আত্মিক মুক্তি, চিন্তা-চেতনা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ভিত্তিমূল গড়ে উঠেছে তাঁর হাত ধরেই। আমাদের প্রতিদিনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা কিংবা সাধারণ জীবনবোধের পরতে পরতে কবিগুরু এক অনিবার্য উপস্থিতি হিসেবে মিশে আছেন।

সুর ও বাণীর আবেগঘন শিল্প-আখ্যান

অনুষ্ঠানের প্রথম নিবেদনটি সাজানো হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রায়, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। কবিগুরুর অমর সৃষ্টি, তাঁকে স্মরণ করে পরবর্তীতে বিভিন্ন কবিদের লেখা চমৎকার সব কবিতা, ধ্রুপদি সংগীত এবং কথামালার সমন্বয়ে মঞ্চে এক নান্দনিক আবহ তৈরি করা হয়। আবৃত্তি ও সুরের এই যুগলবন্দি মিলনায়তনে উপস্থিত শ্রোতাদের মনে এক আবেগঘন ও গম্ভীর শিল্প-আখ্যানের জন্ম দেয়। শিল্পীদের নিখুঁত পরিবেশনা দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধের মতো ধরে রাখে।

অনুষ্ঠানের মূল কথামালা নিজেদের স্বভাবসুলভ কণ্ঠে উপস্থাপন করেন দেশের দুই জনপ্রিয় ও গুণী অভিনয়শিল্পী শাহীন খান এবং আফসানা মিমি। তাঁদের বাচনভঙ্গি ও প্রাঞ্জল উপস্থাপনা পুরো আয়োজনকে এক সুতোয় বেঁধে রাখে। এরপর মঞ্চে একে একে আবৃত্তি পরিবেশন করেন দেশের সুপরিচিত আবৃত্তিশিল্পী বেলায়েত হোসেন, ইকবাল খোরশেদ, আহসান দীপ, নায়লা তারান্নুম চৌধুরী এবং শেখ ফয়সল আহমেদ। তাঁদের গুরুগম্ভীর কণ্ঠের কবিতা পাঠ দর্শকদের আলোড়িত করে।

কবিতার এই ধারাকে আরও সমৃদ্ধ করেন শিল্পী শিরিন ইসলাম, শিখা সেনগুপ্ত, মাহমুদা আক্তার মীরা, কাজী রাজেশ, ডলি দাস, আমিয়া আমানিত এবং জয় হাসান। প্রত্যেকেই নিজ নিজ শৈল্পিক দক্ষতায় রবীন্দ্রনাথকে মঞ্চে ফুটিয়ে তোলেন। শুধু কবিতাই নয়, রবীন্দ্র ভাবনার এই সন্ধ্যায় সুরের ছোঁয়া দিতে মঞ্চে আসেন কণ্ঠশিল্পী তানজীনা আনা ও মোশফিকুর রহমান তুর্য। তাঁদের কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীতের সুর লহরী অনুষ্ঠানটিতে এক ভিন্ন আমেজ তৈরি করে।

এই বিশেষ আয়োজনে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানটিকে অলঙ্কৃত করেন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ইকবাল খোরশেদ। পুরো মিলনায়তন ও মঞ্চের আবহকে রবীন্দ্রযুগের নান্দনিকতায় রূপ দিতে আলোক সজ্জার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেন অঞ্জন বিশ্বাস। তাঁর চমৎকার আলোক পরিকল্পনা মঞ্চের প্রতিটি পরিবেশনাকে আরও বেশি জীবন্ত ও দৃষ্টিনন্দন করে তোলে। উপস্থিত গুণীজনদের মতে, বর্তমানের ব্যস্ত সময়ে তরুণ প্রজন্মের এমন রবীন্দ্রচর্চা বাংলা সংস্কৃতিকে আরও বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।