দোল দোল দুলুনি – আবদুল আলীম / ফজলুর রহমান বাবু (কথা ও সুর: আবদুল লতিফ)

আবহমান বাংলার পল্লীজীবনের মিষ্টি প্রণয়, গ্রামীণ বধূর অভিমান ও চিরায়ত মানভঞ্জনের এক অনুপম লোকজ নিদর্শন “দোল দোল দুলুনি”। প্রখ্যাত সুরকার ও গীতিকার আবদুল লতিফের অমর সৃষ্টি এই গানটি মূলত কিংবদন্তি লোকসংগীতশিল্পী আব্দুল আলীমের অবিস্মরণীয় কণ্ঠে প্রথম রেকর্ড হয়ে বাংলার ঘরে ঘরে জনপ্রিয়তা লাভ করে।

বাঙালির চিরচেনা লোকছড়ার ছন্দ ও রূপককে অবলম্বন করে এক গ্রামীণ প্রেমিকের তার অভিমানী বধূকে হাটের উপহার—রেশমি চুড়ি, রাঙা ফিতা, নাকের নোলক—দিয়ে মান ভাঙানোর যে মধুর আকুতি ফুটে উঠেছে, তা কাল অতিক্রম করে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। পরবর্তীকালে বহুমুখী প্রতিভাধর অভিনেতা ও সংগীতশিল্পী ফজলুর রহমান বাবু এবং তরুণ শিল্পী শারমিন শুমির মতো বহু শিল্পীর কণ্ঠে গানটি নতুন প্রজন্মের মাঝে নতুন রূপে সমাদৃত হয়েছে।

 

ফজলুর রহমান বাবু - বাংলাদেশী অভিনেতা ও সঙ্গীতশিল্পী
ফজলুর রহমান বাবু – বাংলাদেশী অভিনেতা ও সঙ্গীতশিল্পী

 

গানের বিস্তারিত তথ্য

তথ্যবিবরণবিস্তারিত তথ্য
গানের নামদোল দোল দুলুনি (রাঙা মাথার চিরুনি)
গীতিকার ও সুরকারআবদুল লতিফ
মূল কণ্ঠশিল্পীআব্দুল আলীম
অন্যান্য বিশিষ্ট পরিবেশকফজলুর রহমান বাবু, শারমিন শুমি (স্টুডিও গুরুকুল)
সংগীতধারাবাংলা লোকসংগীত / পল্লীগীতি / লোকজ প্রণয়গীতি
মূল উপজীব্যগ্রামীণ নববধূর মানভঞ্জন, সোহাগ, হাটের উপঢৌকন ও চিরচেনা পল্লীপ্রকৃতি
প্রধান অনুষঙ্গরাঙা মাথার চিরুনি, দোপাটি ফুল, ডালিম ফুল, বউ কথা কও পাখি, রেশমি চুড়ি ও নোলক
সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটআবহমান বাংলার বৈষ্ণব মানভঞ্জনের লৌকিক ও দাম্পত্য রূপায়ন

দোল দোল দুলুনি

দোল দোল দুলুনিরাঙা মাথার চিরুনিএনে দেবো হাট থেকেমান তুমি কোরো না (মান তুমি কোরো না)
দোল দোল দুলুনিরাঙা মাথার চিরুনিএনে দেবো হাট থেকেমান তুমি কোরো না
নোটন নোটন খোঁপাটিতুলে এনে দোপাটিরাঙা ফিতায় বেঁধে দেবোমান তুমি কোরো না (মান তুমি কোরো না)
দোল দোল দুলুনিরাঙা মাথার চিরুনিএনে দেবো হাট থেকেমান তুমি কোরো না (মান তুমি কোরো না)
চেয়ে দেখো ডালিম ফুলে ঐ জমেছে মৌ (ঐ জমেছে মৌ)
বউ কথা কও ডাকছে, পাখি কয় না কথা বউচেয়ে দেখ ডালিম ফুলে ঐ জমেছে মৌবউ কথা কও ডাকছে পাখি, কয় না কথা বউ
ঝুমঝুমি মল পায়েতেগয়না সোনার গায়েতেআরো দেবো নাকের নোলকমান তুমি কোরো না (মান তুমি কোরো না)
দোল দোল দুলুনিরাঙা মাথার চিরুনিএনে দেবো হাট থেকেমান তুমি কোরো না (মান তুমি কোরো না)
চাঁদের সাথে নিত্যরাতে তারায় কথা কয় (তারায় কথা কয়)
আপনজনা পর হইলে তাও কি প্রাণে সয়চাঁদের সাথে নিত্যরাতে তারায় কথা কয়আপনজনা পর হইলে তাও কি প্রাণে সয়
একটুখানি হাসো নাকাছে এসে বসো নাকিনে দেবো রেশমি চুড়িমান তুমি কোরো না (মান তুমি করো না)
দোল দোল দুলুনিরাঙা মাথার চিরুনিএনে দেবো হাট থেকেমান তুমি কোরো না (মান তুমি কোরো না)
নোটন নোটন খোঁপাটিতুলে এনে দোপাটিরাঙা ফিতায় বেঁধে দেবোমান তুমি কোরো না (মান তুমি কোরো না)
দোল দোল দুলুনিরাঙা মাথার চিরুনিএনে দেবো হাট থেকেমান তুমি কোরো না (মান তুমি কোরো না)
মান তুমি কোরো না

 

Dol Dol Duluni

Dol dol duluni
Ranga mathar chiruni
Ene debo hat theke
Man tumi koro na (man tumi koro na)

Dol dol duluni
Ranga mathar chiruni
Ene debo hat theke
Man tumi koro na

Noton noton khopati
Tule ene dopati
Ranga fitay bendhe debo
Man tumi koro na (man tumi koro na)

Dol dol duluni
Ranga mathar chiruni
Ene debo hat theke
Man tumi koro na (man tumi koro na)

Cheye dekho dalim phule oi jomechhe mou (oi jomechhe mou)

Bou kotha kou dakchhe, pakhi koy na kotha bou
Cheye dekho dalim phule oi jomechhe mou
Bou kotha kou dakchhe pakhi, koy na kotha bou

Jhumjhumi mol payete
Goyna sonar gayete
Aro debo naker nolok
Man tumi koro na (man tumi koro na)

Dol dol duluni
Ranga mathar chiruni
Ene debo hat theke
Man tumi koro na (man tumi koro na)

Chander sathe nityorate taray kotha koy (taray kotha koy)

Apon-jona por hoile tao ki prane soy
Chander sathe nityorate taray kotha koy
Apon-jona por hoile tao ki prane soy

Ektukhani haso na
Kachhe eshe boso na
Kine debo reshmi churi
Man tumi koro na (man tumi koro na)

Dol dol duluni
Ranga mathar chiruni
Ene debo hat theke
Man tumi koro na (man tumi koro na)

Noton noton khopati
Tule ene dopati
Ranga fitay bendhe debo
Man tumi koro na (man tumi koro na)

Dol dol duluni
Ranga mathar chiruni
Ene debo hat theke
Man tumi koro na (man tumi koro na)

Man tumi koro na

গানের মূল ভাব

“দোল দোল দুলুনি” গানটির মূল নির্যাস হলো দাম্পত্যের অমলিন ভালোবাসা ও অভিমান ভাঙানোর এক মধুর লোকায়ত প্রয়াস। গ্রামীণ জীবনে সাপ্তাহিক ‘হাট’ কেবল কেনাবেচার জায়গা নয়, প্রিয়জনের জন্য ভালোবাসা প্রকাশের প্রতীকী উপহার সংগ্রহেরও ক্ষেত্র। বধূর অভিমানে ভারাক্রান্ত মুখ দেখে প্রেমিক বা স্বামী অস্থির হয়ে পড়ে এবং তাকে খুশি করতে হাট থেকে নানা প্রসাধন ও অলংকার এনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
গানটিতে মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে এক চমৎকার মেলবন্ধন টানা হয়েছে। ডালিম ফুলে জমে থাকা মধুর লোভ কিংবা ‘বউ কথা কও’ পাখির অবিরাম ডাকও যখন অভিমানী বধূর মুখে কথা ফোটাতে পারে না, তখন প্রেমিক অত্যন্ত স্নেহের সাথে স্মরণ করিয়ে দেয় যে আপন মানুষ পর হয়ে গেলে তা হৃদয়ে সহ্য করা যায় না। লোকজ উপঢৌকনের প্রলোভনের আড়ালে মূলত এক খাঁটি আন্তরিক ভালোবাসার নিবেদনই এই গানের মূল উপজীব্য।

চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ

১. চিরন্তন ছড়ার আশ্রয়ে মানভঞ্জনের সূচনা

  • “দোল দোল দুলুনি, রাঙা মাথার চিরুনি / এনে দেবো হাট থেকে, মান তুমি কোরো না / নোটন নোটন খোঁপাটি, তুলে এনে দোপাটি…”
    বাংলার লোকায়ত ঘুমপাড়ানি ছড়ার চিরচেনা চরণকে এখানে প্রেম ও মানভঞ্জনের সংলাপে রূপান্তর করা হয়েছে। বাগান থেকে দোপাটি ফুল তুলে খোঁপা সাজিয়ে দেওয়ার আশ্বাস বধূর নারীসুলভ কোমলতাকে সম্মান জানানোর রূপক।

২. পল্লীপ্রকৃতির রূপক ও নীরবতার বেদনা

  • “চেয়ে দেখো ডালিম ফুলে ঐ জমেছে মৌ / বউ কথা কও ডাকছে পাখি, কয় না কথা বউ…”
    প্রকৃতিতে প্রাণের উচ্ছ্বাস ও মাধুর্য ফুটে উঠেছে, বনে বউ কথা কও পাখি সুরে সুরে মুখরিত করছে পরিবেশ; অথচ ঘরের মানুষটিই নীরব। এই বৈপরীত্য প্রেমিকের বিরহ ও কৌতুকপূর্ণ অনুযোগকে অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে।

৩. উপহারের পসরা ও প্রসাধন

  • “ঝুমঝুমি মল পায়েতে, গয়না সোনার গায়েতে / আরো দেবো নাকের নোলক… কিনে দেবো রেশমি চুড়ি…”
    গ্রামীণ নারীর পছন্দের সাজসজ্জার সামগ্রী—পায়ের মল, সোনার গয়না, নাকের ঐতিহ্যবাহী নোলক এবং কাচের রেশমি চুড়ির উল্লেখ তৎকালীন সামাজিক সংস্কৃতি ও সৌন্দর্যের নিখাদ প্রকাশ।

৪. চাঁদ-তারার মৈত্রী ও আত্মিক মিলন

  • “চাঁদের সাথে নিত্যরাতে তারায় কথা কয় / আপনজনা পর হইলে তাও কি প্রাণে সয় / একটুখানি হাসো না, কাছে এসে বসো না…”
    আকাশের চাঁদ ও তারার নিত্য কথোপকথনের উপমা টেনে দুটি হৃদয়ের গভীর বন্ধন তুলে ধরা হয়েছে। সমস্ত কৃত্রিম মান ও দূরত্ব ভুলে একটু মিষ্টি হাসি দিয়ে কাছে এসে বসার এই আর্তি সম্পর্কের গভীরতাকে নির্দেশ করে।

সাহিত্যিক ও লোকজ বৈশিষ্ট্য

  • লোকছড়ার রূপান্তর: প্রাচীন লোকসাহিত্যের ছড়া (“দোল দোল দুলুনি রাঙা মাথায় চিরুনি”) থেকে রসদ সংগ্রহ করে তাকে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রণয়গীতিতে রূপ দেওয়া আবদুল লতিফের অসাধারণ সাহিত্যিক দক্ষতার পরিচায়ক।
  • মানভঞ্জন পর্বের আধুনিকায়ন: মধ্যযুগের পদাবলিতে রাধা-কৃষ্ণের মানভঞ্জনের যে ধারা দেখা যায়, এই গানে তাকে কোনো দেবতাত্ব ছাড়াই এক সাধারণ গ্রামীণ স্বামী-স্ত্রীর নির্মল দাম্পত্যের আবহে অত্যন্ত জীবন্ত করা হয়েছে।
  • ধ্বনিমাধুর্য ও অনুপ্রাস: ‘দোল দোল দুলুনি’, ‘নোটন নোটন’, ‘ঝুমঝুমি মল’-এর মতো ধ্বন্যাত্মক শব্দের ব্যবহার গানের দোলাকে আরও গতিময় ও শ্রুতিমধুর করেছে।

সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও গায়কীর বৈচিত্র্য

  • আব্দুল আলীমের আদি গায়কী: লোকসংগীত সম্রাট আব্দুল আলীমের ভরাট, উদার ও নিখুঁত তানযুক্ত গায়কীতে গানটি এক অমর উচ্চতা পেয়েছিল। তাঁর কণ্ঠের মেঠো সুরের বিস্তার প্রতিটি চরণে প্রাণের সঞ্চার করত।
  • ফজলুর রহমান বাবুর আধুনিক অভিব্যক্তি: ফজলুর রহমান বাবুর গায়কীর বিশেষত্ব হলো অভিনয়ের সংমিশ্রণ। সুরের কারুকাজের চেয়েও এক সাধারণ গ্রামীণ মানুষের আন্তরিকতা, অসহায় মিনতি ও ঘরোয়া বাচনভঙ্গি তাঁর কণ্ঠে চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে।
  • স্টুডিও গুরুকুল ও শারমিন শুমির কাভার: আধুনিক সংগীতায়োজনে অ্যাকোস্টিক গিটার, কাহন ও ফ্লুটের সাথে লোকজ সুরের সংমিশ্রণে শারমিন শুমির পরিবেশনা গানটিকে তরুণ প্রজন্মের কাছে নতুন করে নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করেছে।

স্রষ্টা ও শিল্পী পরিচিতি

  • আবদুল লতিফ (১৯২৭–২০০৫): বাংলাদেশের মহান ভাষাসৈনিক, একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট সুরকার ও গীতিকার। “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো” (দ্বিতীয় সুরকার), “ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়”-এর মতো বহু ঐতিহাসিক দেশাত্মবোধক ও কালজয়ী লোকগীতির রূপকার তিনি।
  • আব্দুল আলীম (১৯৩১–১৯৭৪): বাংলা লোকসংগীতের অবিসংবাদিত সম্রাট। তাঁর কণ্ঠের মাধুর্য ও ভাবগাম্ভীর্য বাংলা সংগীতকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্মানিত করেছে।
  • ফজলুর রহমান বাবু: পাঁচবারের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রখ্যাত অভিনেতা ও কণ্ঠশিল্পী। অভিনয়জগতে অনন্য সাফল্যের পাশাপাশি ‘মনপুরা’ ছবির মাধ্যমে তাঁর সংগীত প্রতিভাও দেশজুড়ে বিপুল প্রশংসা কুড়ায়।

উৎস ও তথ্যসূত্র

  1. বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশন পল্লীগীতি অডিও আর্কাইভ।
  2. আবদুল লতিফ: গীতিসমগ্র ও লোকসুর সংকলন।
  3. স্টুডিও গুরুকুল (Studio Gurukul) ফোক সিরিজ রেকর্ডস।

 

দোল দোল দুলুনি [ Dol Dol Doloni ] নিয়ে কভার ঃ

 

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

সম্পাদক ও প্রকাশক : সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর।

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।