বাংলাদেশে উচ্চাঙ্গ ও শুদ্ধ সংগীত চর্চার ভিত গড়ার অন্যতম প্রধান কারিগর শফিউর রহমানের পঞ্চদশ মৃত্যুবার্ষিকী আজ শনিবার (২৭ জুন)। দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মার্গসংগীতের প্রসার ও নতুন প্রজন্মকে এই ধারায় উদ্বুদ্ধ করতে তিনি আজীবন কাজ করে গেছেন। ২০১১ সালের এই দিনে ৮০ বছর বয়সে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন এই নিবেদিতপ্রাণ সাধক। তাঁর চলে যাওয়ার পর দেড় দশক পেরিয়ে গেলেও এ দেশের সংগীতাকাশে তাঁর অবদান আজও চিরভাস্বর।
শফিউর রহমান কেবল একজন সংগীতানুরাগী বা শিল্পী ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এ দেশে শুদ্ধ সংগীতকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়ার একনিষ্ঠ সংগঠক। তিনি ‘শুদ্ধ সংগীত প্রসার গোষ্ঠী’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং আমৃত্যু এর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। যে সময়ে দেশে সস্তা জনপ্রিয় ধারার গানের দাপট বাড়ছিল, সেই প্রতিকূল পরিবেশেও তিনি উচ্চাঙ্গ সংগীতের মতো একটি গুরুগম্ভীর ও ধ্রুপদি ধারাকে তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার কঠিন ব্রত হাতে নিয়েছিলেন।
তৎকালীন সময়ে শফিউর রহমানের হাত ধরে বহু নতুন মুখ ধ্রুপদি সংগীতের দীক্ষা পেয়েছিল। বিভিন্ন কর্মশালা, সেমিনার ও নিয়মিত সংগীত জলসার আয়োজন করে তিনি এ দেশের ঝিমিয়ে পড়া উচ্চাঙ্গ সংগীতের চর্চায় নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছিলেন। গুটি কয়েক গুণী মানুষের ড্রয়িংরুম কালচারে সীমাবদ্ধ থাকা এই ধারাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল অনন্য। তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন, মানুষের কানের রুচি বদলাতে এবং মনের সুস্থ খোরাক জোগাতে ধ্রুপদি সংগীত শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
শফিউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ তাঁর পরিবার, দীর্ঘদিনের সহকর্মী এবং ‘শুদ্ধ সংগীত প্রসার গোষ্ঠী’র বর্তমান সদস্যরা নানা স্মরণসভার আয়োজন করেছেন। দিনটি উপলক্ষে বিশেষ প্রার্থনার পাশাপাশি তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে রাগসংগীতের আসরেরও আয়োজন করা হয়েছে। তাঁর শিষ্য ও ভক্তরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই গুণী মানুষের জীবন ও কর্মের নানা দিক তুলে ধরে স্মৃতিচারণ করছেন।
এ দেশের মূলধারার সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে শফিউর রহমানের মতো মানুষের অভাব আজ প্রতিটি পদক্ষেপে অনুভূত হচ্ছে। বর্তমান সময়ে তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশ যখন নিজেদের শেকড় থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তখন তাঁর রেখে যাওয়া শুদ্ধ সংগীতের আদর্শ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তাঁর দেখানো পথ ধরে এ দেশে ধ্রুপদি সংগীতের চর্চা চিরকাল অব্যাহত থাকবে এবং নতুন প্রজন্মকে সুস্থ ধারার সাংস্কৃতিক মনন গঠনে অনুপ্রাণিত করবে—এমনটাই আশা প্রকাশ করছেন দেশের প্রবীণ সংগীতজ্ঞরা।
