সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ই ফেব্রুয়ারি ২০২২, ৪:১ পিএম
বাঙালির শেকড়সন্ধানী লোকসংগীতের ইতিহাসে পল্লীগীতি সম্রাট আব্দুল আলীমের কালজয়ী এক সৃষ্টি হলো ‘নাইয়ারে নায়ের বাদাম তুইলা’। গ্রামবাংলার চিরায়ত বিরহ, নদীমাতৃক রূপ এবং আপনজনের প্রতি দূর প্রবাসে থাকা মানুষের যে আকুলতা, তা এই গানের ছত্রে ছত্রে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে। আব্দুল আলীমের দরদি ও দরাজ কণ্ঠের জাদুতে এই লোকগানটি আজও শ্রোতাদের হৃদয়কে এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া ও বিষাদে আচ্ছন্ন করে।
Table of Contents
| গানের নাম | নাইয়ারে নায়ের বাদাম তুইলা |
| মূল শিল্পী | আব্দুল আলীম |
| গানের ধরন | লোকসংগীত / পল্লীগীতি |
| গীতিকার ও সুরকার | সংগৃহীত লোকজ সুর |
এই লোকগানটিকে অমরত্ব দান করেছেন বাংলাদেশের লোকসংগীতের প্রবাদপুরুষ আব্দুল আলীম। ১৯৩১ সালের ২৭ জুলাই বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার তালিবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই মহান শিল্পী। ছোটবেলা থেকেই তিনি সঙ্গীতের প্রতি তীব্র অনুরাগী ছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো গুরুর কাছে শেখার সুযোগ না পেলেও, গ্রামোফোন রেকর্ডে গান শুনে এবং গ্রামের পালা-পার্বণে গেয়েই তিনি সঙ্গীতের পাঠ গ্রহণ করেন। মাত্র তেরো বছর বয়সে ১৯৪৩ সালে তাঁর গানের প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়, যা ছিল এক অসামান্য কৃতিত্ব।
দেশভাগের পর আব্দুল আলীম ঢাকায় চলে আসেন এবং রেডিওতে স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে টেলিভিশন চালু হলে সেখানেও তিনি নিয়মিত সঙ্গীত পরিবেশন করেন। তৎকালীন বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ সহ ‘লালন ফকির’-এর মতো চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করে তিনি লোকসংগীতকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। তাঁর গায়কীতে জীবনবোধ এবং ভাববাদী দর্শনের যে অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছিল, তা এই গানেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
নাইয়ারে নায়ের বাদাম
তুইলা কোন দূরে যাও চইলা?
নাইয়ারে নায়ের বাদাম
তুইলা কোন দূরে যাও চইলা?
অচেনা সাগরের মাঝে…
অচেনা সাগরের মাঝে সেই কথা যাও বইলা
নায়ের বাদাম তুইলা কোন দূরে যাও চইলা?
নাইয়া রে…
ভাটির দেশে যাও যদি তুমি হিজলতলির বাঁকে
নাইয়া রে…
ভাটির দেশে যাও যদি তুমি হিজলতলির বাঁকে
সেথায় আমার ভাইজান থাকে
আমার কথা কইয়ো রে তাকে
মইলাম দুইখে জ্বইলা
কোন দূরে যাও চইলা?
নাইয়ারে নায়ের বাদাম
তুইলা কোন দূরে যাও চইলা?
নাইয়া রে…
পরানে আর সইবো রে কত, আগুন জ্বলে মনে
নাইয়া রে…
পরানে আর সইবো রে কত, আগুন জ্বলে মনে
বনের আগুন দেখতে পারে
মনের আগুন পুইড়া মারে
ধিকিধিকি জ্বইলা
কোন দূরে যাও চইলা?
নাইয়ারে নায়ের বাদাম
তুইলা কোন দূরে যাও চইলা?
অচেনা সাগরের মাঝে…
অচেনা সাগরের মাঝে সেই কথা যাও বইলা
নায়ের বাদাম তুইলা কোন দূরে যাও চইলা?
নাইয়া রে…
নায়ের বাদাম তুইলা কোন দূরে যাও চইলা?
নাইয়া রে…
Naiyare nayer badam
Tuila kon dure jao choila?
Naiyare nayer badam
Tuila kon dure jao choila?
Ochena shagorer majhe…
Ochena shagorer majhe shei kotha jao boila
Nayer badam tuila kon dure jao choila?
Naiya re…
Vatir deshe jao jodi tumi hijoltolir bake
Naiya re…
Vatir deshe jao jodi tumi hijoltolir bake
Sethay amar bhaijan thake
Amar kotha koiyo re take
Moilam duikhe jwoila
Kon dure jao choila?
Naiyare nayer badam
Tuila kon dure jao choila?
Naiya re…
Porane ar soibo re koto, agun jwole mone
Naiya re…
Porane ar soibo re koto, agun jwole mone
Boner agun dekhte pare
Moner agun puira mare
Dhikidhiki jwoila
Kon dure jao choila?
Naiyare nayer badam
Tuila kon dure jao choila?
Ochena shagorer majhe…
Ochena shagorer majhe shei kotha jao boila
Nayer badam tuila kon dure jao choila?
Naiya re…
Nayer badam tuila kon dure jao choila?
Naiya re…
গানটির মূল ভাব আবর্তিত হয়েছে নদীমাতৃক বাংলার এক চিরন্তন পারিবারিক টান এবং বিষাদময় একাকীত্বকে কেন্দ্র করে। এখানে একজন মানুষ নদীর বুকে নৌকার মাঝি বা নাইয়াকে ডেকে জিজ্ঞেস করছেন তিনি কোন অচিন দেশে যাচ্ছেন। মাঝির কাছে তার আকুল আবেদন, যদি তিনি ভাটি অঞ্চলে যান, তবে যেন হিজল গাছের বাঁকে থাকা তার প্রিয় ভাইজানের কাছে খবর দেন যে সে বিরহ ও কষ্টে জ্বলে পুড়ে মরছে।
গানের শব্দচয়ন এবং সুর একদম খাঁটি গ্রামবাংলার মাটির গন্ধ মাখা। ‘মইলাম’, ‘পুইড়া’, ‘চইলা’-এর মতো আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার গানটিকে অনেক বেশি বাস্তব ও হৃদয়গ্রাহী করেছে। গানে ব্যবহৃত একটি রূপক অত্যন্ত শক্তিশালী—‘বনের আগুন দেখতে পারে, মনের আগুন পুইড়া মারে’। অর্থাৎ, বাইরের আঘাত বা দুঃখ সবাই দেখতে পায়, কিন্তু মনের ভেতরের যে নীরব কষ্ট, তা ধিকিধিকি জ্বলে মানুষকে ভেতর থেকে নিঃশেষ করে দেয়, যা কেউ দেখতে পায় না।
এই গানের প্রধান বিশেষত্ব হলো আব্দুল আলীমের উদাসী কণ্ঠের আবেশ। এটি কেবল একটি গান নয়, বরং দূর প্রবাসে বা আপনজন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা মানুষের অন্তরের এক করুণ আর্তনাদ। গানের প্রতিটি টানে তিনি যে দরদ ঢেলে দিয়েছেন, তা বাংলার মাটি ও জলের অবিচ্ছেদ্য রূপকে শ্রোতাদের চোখের সামনে জীবন্ত করে তোলে।
এই নিবন্ধের ঐতিহাসিক এবং জীবনীসংক্রান্ত তথ্যসমূহ বাংলাদেশ বেতারের আর্কাইভ, আব্দুল আলীমের অফিশিয়াল গ্রামোফোন রেকর্ডের তালিকা এবং লোকসংগীত গবেষকদের বিভিন্ন প্রামাণ্য নথিপত্র থেকে সংগ্রহ ও যাচাই করা হয়েছে।
মন্তব্য