ময়মনসিংহের সংগীতাঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে আলাদাভাবে কাজ করে আসা ছয়টি ব্যান্ড এবার একত্র হয়েছে একটি বিশেষ অ্যালবামে। স্বাধীন সংগীত লেবেল ফেকস্টুডিওর উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছে ‘ময়মনসিংহ ২২০০ – ব্যান্ড মিক্সড অ্যালবাম ২০২৬’। ছয়টি মৌলিক গান ও দেশের প্রভাবশালী কয়েকটি রক ব্যান্ডের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের সমন্বয়ে তৈরি অ্যালবামটি প্রকাশ পায় গত ২৮ আগস্ট।
প্রায় এক বছর ধরে চলা এই আয়োজন বাস্তবে রূপ নিতে গিয়ে একাধিক ধাপ পেরিয়েছে। নির্ধারিত প্রকাশের তারিখ দুই দফা পিছিয়ে গেলেও প্রকল্পটির কাজ থেমে থাকেনি। শেষ পর্যন্ত ময়মনসিংহের স্থানীয় সংগীতাঙ্গনের ছয়টি ব্যান্ড—স্কার, ডেমন ওল্কস, রাশট্র্যাকার, ব্যাড নেইবার্স, এক্সক্যালিবার ও মিউজিক নাইটস—একটি অ্যালবামের জন্য নিজেদের গান নিয়ে হাজির হয়।
অ্যালবামের প্রথম অংশে রয়েছে প্রতিটি ব্যান্ডের একটি করে মৌলিক গান। স্কারের ‘অবহেলিত’, রাশট্র্যাকারের ‘অতৃপ্ত চিৎকার’, ব্যাড নেইবার্সের ‘মুখোশ’, ডেমন ওল্কসের ‘পাগল’, এক্সক্যালিবারের ‘শেকল বন্দী’ এবং মিউজিক নাইটসের ‘রাজার খেলা’ দিয়ে শুরু হয় অ্যালবামের সংগীতযাত্রা। আলাদা ব্যান্ডের নিজস্ব সংগীতধারা ও পরিবেশনার মধ্য দিয়ে এই অংশে ময়মনসিংহের স্থানীয় ব্যান্ডসংগীতের বৈচিত্র্য ফুটে উঠেছে।
এরপর অ্যালবামের দ্বিতীয় অংশে রয়েছে বাংলাদেশের রক সংগীতের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নামের প্রতি সম্মান জানিয়ে তৈরি গান। এই অংশে এলআরবি, আর্টসেল, অর্থহীন, মাইলস, ক্রিপটিক ফেইট, বে অব বেঙ্গল এবং নগর বাউল জেমসের সংগীতকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। শ্রদ্ধা নিবেদনের এই আয়োজনের বেশির ভাগ কাজেই ময়মনসিংহের নিজস্ব সংগীতাঙ্গনের শিল্পী ও সংগীতশিল্পীরা যুক্ত ছিলেন।
অ্যালবাম প্রকাশ উপলক্ষে মেট্রো বিনসে একটি আয়োজনও করা হয়। সেখানে চারটি ব্যান্ড সরাসরি সংগীত পরিবেশন করে। পাশাপাশি অতিথি শিল্পীদের কয়েকটি পরিবেশনা এবং চমক হিসেবে কয়েকজন বিশেষ অতিথির উপস্থিতি পুরো আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। প্রকাশনার আগে শিল্পী ও শ্রোতাদের কাছাকাছি এনে দেওয়ার ক্ষেত্রেও এই আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
‘ময়মনসিংহ ২২০০’ প্রকল্পটির পেছনে মূল উদ্যোক্তা হিসেবে রয়েছেন অডিও ইঞ্জিনিয়ার আরিয়ান। সাউন্ডবোর্ডের পেছনে কাজ করার অভিজ্ঞতায় তিনি বাগধারা, ওন্ড এবং লেভেল ফাইভের মতো ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি নিজের ব্যান্ড রোমান স্যাক্রিফাইসের গিটারিস্ট। ময়মনসিংহের সংগীতাঙ্গনে পরিচিতির পাশাপাশি শহরের বাইরেও তার কাজের পরিচিতি রয়েছে।
অন্য শিল্পীদের রেকর্ডিং ও সাউন্ড নিয়ে কাজ করতে করতেই আরিয়ানের মাথায় আসে একটি ভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা। ময়মনসিংহের সংগীতজগতের ব্যান্ডগুলো যদি নিজেদের আলাদা পরিচয়ের বাইরে এসে একটি যৌথ অ্যালবামে যুক্ত হয়, তাহলে সেই সংগীত কেমন হতে পারে—এই ভাবনা থেকেই প্রকল্পটির সূচনা। এর আগে শহরের ব্যান্ডগুলোকে নিয়ে এমন একটি সমন্বিত অ্যালবাম তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে একে একে ব্যান্ডগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে কাজটি এগিয়ে নেন তিনি।
প্রকল্পটির সব গান শেষ পর্যন্ত ফেকস্টুডিওতেই মিক্স ও মাস্টার করা হয়। দিনের অন্যান্য কাজ শেষ হওয়ার পরও অনেক সময় গভীর রাত পর্যন্ত রেকর্ডিং, মিক্সিং ও অন্যান্য প্রস্তুতির কাজ চলেছে। প্রকাশের তারিখ দুইবার পরিবর্তিত হওয়ার পেছনে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় কাজ করলেও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যেও উদ্যোগটির গতি থেমে যায়নি।
অ্যালবামের শ্রদ্ধা নিবেদন পর্বে সহ-প্রযোজক হিসেবে যুক্ত হন তাশফিক আনকুর। তিনি ট্রিবিউট অংশের পরিকল্পনায় সহযোগিতা করার পাশাপাশি কণ্ঠের বিন্যাস এবং ড্রাম প্রোগ্রামিংয়ের দিকটিও দেখেছেন।
‘ময়মনসিংহ ২২০০’-এর ধারণার পেছনে বাংলাদেশের শ্রোতাদের পুরোনো একটি সংগীত-অভিজ্ঞতারও প্রভাব রয়েছে। একসময় ‘রক ৩০৩’ ও ‘রক ৪০৪’-এর মতো মিক্সড অ্যালবাম অনেক শ্রোতার কাছে বিভিন্ন ব্যান্ডের গান একসঙ্গে শোনার সুযোগ তৈরি করেছিল। সেই সময়ের স্মৃতি থেকেই একটি শহরকে কেন্দ্র করে একই ধরনের সম্মিলিত আয়োজনের ভাবনা তৈরি হয়।
তবে পুরো প্রকল্পটি শুধু কয়েকটি ব্যান্ডকে একটি অ্যালবামে যুক্ত করার কাজেই সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রয়োজন অনুযায়ী কেউ গান করেছেন, কেউ বাদ্যযন্ত্র বাজিয়েছেন, কেউ মিক্সিংয়ে সহযোগিতা করেছেন, কেউ ভিডিও ধারণ করেছেন। আবার অনেকেই দীর্ঘ রাতের কাজের সময় পাশে থেকে সহযোগিতা করেছেন। অর্থাৎ অ্যালবামটির পেছনে ছিল ময়মনসিংহের সংগীতাঙ্গনের একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
‘ময়মনসিংহ ২২০০’ শেষ পর্যন্ত শুধু ছয়টি ব্যান্ডের গান নিয়ে তৈরি একটি অ্যালবাম নয়; এটি একটি শহরের সংগীতজগতকে একই প্ল্যাটফর্মে তুলে ধরার উদ্যোগ। আলাদা আলাদা ব্যান্ডের নিজস্ব পরিচয় বজায় রেখেও তারা যে একটি যৌথ সংগীতভুবন তৈরি করতে পারে, সেই ধারণাটিই প্রকল্পটির মূল শক্তি। ২৮ আগস্ট প্রকাশের পর অ্যালবামটি তাই ময়মনসিংহের স্থানীয় ব্যান্ডসংগীতকে একসঙ্গে তুলে ধরার একটি উল্লেখযোগ্য প্রয়াস হিসেবে সামনে এসেছে।














