ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের অগাধ সমুদ্রের দিকে তাকালে বেশ কিছু অপ্রচলিত, চমত্কার এবং বিরল রাগের সন্ধান মেলে। এমনই একটি অপূর্ব এবং অনবদ্য সুরের সৃষ্টি হলো ‘রাগ অদ্ভুত রঞ্জনী’। এর নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এর সাঙ্গীতিক পরিচয়—যা শ্রবণে শ্রোতার মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, কৌতূহল এবং অনুভূতির জন্ম দেয়। এই রাগটিকে রাগ শাস্ত্রের আধুনিক পণ্ডিতদের উদ্ভাবনী চিন্তা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার এক অনন্য ফসল হিসেবে গণ্য করা হয়। বিশেষ করে বিশ শতকের প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ এবং বিদগ্ধ সুরসাধক পণ্ডিত রবি শঙ্কর কিংবা মৈহার ঘরানার ভাবনায় কিছু অপ্রচলিত বিরল রাগের যে রূপান্তর ও সৃষ্টি আমরা দেখতে পাই, অদ্ভুত রঞ্জনী তার একটি চমৎকার নিদর্শন। অনেক পণ্ডিত এটিকে রাগ ‘রঞ্জনী’ পরিবারের কিংবা মারবা ঠাটের বিবর্তিত ও বিরল রূপ হিসেবে বিচার করেন। মূলত বাদী ও সমবাদী স্বরের অদ্ভুত চলন এবং কিছু স্বরের সুনির্দিষ্ট বাদ পড়ার কৌশলের কারণে এটি অন্যান্য প্রচলিত রাগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এক সাঙ্গীতিক আবহ তৈরি করে।
এই রাগকে অনেক সময় সঙ্গীতে সংক্ষিপ্ত বা আঞ্চলিক উচ্চারণে ‘রাগ অদ্ভুত রঞ্জন’ কিংবা কেবল ‘অদ্ভুত রঞ্জনী’ নামেও ডাকা হয়।
Table of Contents
রাগের শাস্ত্র
- ঠাট: মারবা ঠাট (কিছু মতানুসারে এটি বিলাবল বা কল্যাণ অঙ্গের প্রভাবেও বিশ্লেষিত হয়, তবে মারবা ঠাটের সাথে এর স্বর সামঞ্জস্য সবচেয়ে বেশি ধরা হয়)।
- জাতি: ঔড়ব-ঔড়ব (আরোহ এবং অবরোহ দুইয়েই পাঁচটি করে স্বর ব্যবহৃত হয়)।
- আরোহ: সা গা মা(তীব্র) ধা না সা
- অবরোহ: সা না ধা মা(তীব্র) গা সা
- বাদী স্বর: গা (গান্ধার)
- সমবাদী স্বর: ধা (ধৈবত)
- বর্জিত স্বর: ঋষভ (রে) এবং পঞ্চম (পা) স্বর দুটি আরোহ ও অবরোহ উভয় ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ বর্জিত।
- ব্যবহৃত স্বর: শুদ্ধ গা, তীব্র মা, শুদ্ধ ধা, শুদ্ধ না এবং শুদ্ধ সা (রে ও পা বর্জিত, শুদ্ধ স্বরের পাশাপাশি তীব্র মধ্যম ব্যবহৃত)।
- সময়: রাত্রির প্রথম প্রহর (সন্ধ্যা থেকে রাত ৯টার মধ্যবর্তী সময়)।
- প্রকৃতি: গম্ভীর, ধ্যানমগ্ন, কিছুটা শান্ত ও করুণ রসের সমন্বয়।
সুর চিকিৎসায় ব্যবহার
রাগ অদ্ভুত রঞ্জনী একটি বিরল এবং অপ্রচলিত রাগ হওয়ায় আধুনিক সুর চিকিৎসা (Music Therapy)-র নির্দিষ্ট ক্লিনিকাল গবেষণায় বা প্রামাণ্য শাস্ত্রে এর প্রত্যক্ষ ব্যবহার নিয়ে নিশ্চিত তথ্য নিবন্ধিত নেই। তাই ভ্রান্ত তথ্য এড়াতে সুর চিকিৎসায় এর সুনির্দিষ্ট প্রয়োগ সম্পর্কিত কোনো নিশ্চিত দাবি করা হচ্ছে না।
সম্পর্কিত রাগের তালিকা
- রাগ রঞ্জনী: মূল নামগত এবং অঙ্গগত মিল রয়েছে, যেখানে স্বরের চলনে অনুরূপ মাধুর্য দেখা যায়।
- রাগ মারবা: ঋষভ বর্জিত করে তীব্র মধ্যমের প্রয়োগে এই রাগের ভাবচ্ছায়ায় মারবার কিছুটা স্পর্শ অনুভূত হয়।
- রাগ ভৈরী: পঞ্চমহীন এবং বিশেষ ঔড়ব কাঠামোর দিক থেকে এর সাঙ্গীতিক চলনে বৈচিত্র্যময় সামঞ্জস্য পাওয়া যায়।
- রাগ মধুবন্তী: মধ্যম স্বরের তীব্রতা এবং স্বরবিন্যাসে কিছুটা দূরবর্তী বৈচিত্র্যময় মিল লক্ষ করা যায়।
উপসংহার
রাগ অদ্ভুত রঞ্জনী ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের বৈচিত্র্যময় সৃষ্টিশীলতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। রে এবং পা স্বর দুটিকে সম্পূর্ণ বর্জন করে তীব্র মধ্যমের সূক্ষ্ম স্পর্শে পাঁচ স্বরের এই ঔড়ব-ঔড়ব কাঠামোর রাগটি যে পরিবেশ তৈরি করে, তা সত্যিই অদ্ভুত এবং মননশীল। যদিও সাধারণ মেহফিলে বা শিক্ষানবিসদের চর্চায় রাগটি খুব বেশি শোনা যায় না, তবুও বিরল ও অপ্রচলিত রাগের অনুসন্ধানী শ্রোতা এবং বিদগ্ধ শিল্পীদের কাছে অদ্ভুত রঞ্জনী এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে সমাদৃত।
সোর্স ও প্রামাণ্য রেফারেন্স
১. রাগ প্রবীণ ও রাগ বিজ্ঞান (পণ্ডিত বিনায়ক রাও পটবর্ধন এবং পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে প্রবর্তিত রাগ স্বরলিপি পদ্ধতি)।
২. ভারতীয় সঙ্গীত শাস্ত্রের বিরল রাগ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ নিবন্ধ (মৈহার ও বিষ্ণুপুর ঘরানার অপ্রচলিত রাগ আলোচনা)।
৩. রাগ অভিধান ও স্বরলিপি সংকলন (ড. কানন সেনগুপ্ত)।
সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর একজন বাংলাদেশি শিক্ষক, উদ্যোক্তা, সঙ্গীতানুরাগী ও সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষক। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গীত, বিশেষত শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে তিনি নিয়মিত লেখালেখি ও গবেষণামূলক চর্চা করেন। সঙ্গীতের ঐতিহ্য, নান্দনিকতা ও জ্ঞানকে বৃহত্তর মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছেন। সঙ্গীতের প্রচার, প্রসার ও সংরক্ষণে তাঁর আগ্রহ এবং সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে একজন নিবেদিতপ্রাণ সঙ্গীতপ্রেমী হিসেবে পরিচিত করেছে।








![চেনা চেনা লাগে [ Chena chena lage ] 3 চেনা চেনা লাগে](https://bn.musicgoln.com/wp-content/uploads/2024/02/চেনা-চেনা-লাগে-1024x576.webp)




