গল্পের যেমন নিজস্ব মেজাজ থাকে, সুরেরও থাকে ঠিক তেমনি এক নিজস্ব চরিত্র। হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জগতে এমনই এক অদ্ভুত মায়াবী ও গম্ভীর চরিত্রের রাগ হলো ‘রাগ নন্দকোষ’। মূলত দক্ষিণ ভারতীয় (কর্ণাটকী) সঙ্গীত ঐতিহ্যের এক চমৎকার উপহার এই রাগটি। তবে এর ভেতরের এক অদ্ভুত আকুলতার কারণে উত্তর ভারতীয় বা আমাদের এই অঞ্চলের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতশিল্পীরাও পরম ভালোবাসায় এই রাগটি আসরে বারবার পরিবেশন করে থাকেন। মজার ব্যাপার হলো, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ব্যাকরণে এই রাগের নির্দিষ্ট কোনো ‘ঠাট’ এখনও নির্ধারিত করা হয়নি; আর এই রহস্যটুকুই রাগটিকে আরও বেশি অনন্য করে তুলেছে।
চলুন, এই রাগের ভেতরের কারিগরি আর তার জাদুকরী রূপটা একটু চিনে নেওয়া যাক:
রাগের ব্যাকরণ ও সুরের ওঠানামা:
- আরোহণ: স, গ ম, দ, ন, র্স
- অবরোহণ: র্স, ন দ প ম, গম জ্ঞ স
- জাতি: ঔড়ব-ষাড়ব। অর্থাৎ, সুরের আরোহণে বা ওপরে ওঠার সময় দুটি স্বর (ঋষভ ও পঞ্চম) বর্জিত থাকে, আর অবরোহণে বা নিচে নামার সময় কেবল একটি স্বর (ঋষভ) বর্জিত হয়।
- বাদীস্বর (রাগের প্রধান রাজা): ‘ম’ (মধ্যম)। এই রাগের পুরো আলাপে ‘ম’ স্বরটি বারবার এক কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে ফিরে আসে।
- সমবাদী স্বর (রাগের উজির বা মন্ত্রী): ‘স’ (ষড়জ)।
- অঙ্গ: পূর্বাঙ্গ প্রধান।
- পকড় (রাগের আসল চাবিকাঠি): সগ মধ, পম, জ্ঞ স।
সময়ের মায়াজাল ও শ্রোতার মনস্তত্ত্ব:
রাগ নন্দকোষের মূল ম্যাজিকটা লুকিয়ে আছে এর পরিবেশনের সময়ে। এই রাগের জন্য ওস্তাদরা বেছে নেন রাতের দ্বিতীয় প্রহর।
চারপাশ যখন নিঝুম হয়ে আসে, কোলাহল ফুরিয়ে যায়—ঠিক তখনই তানপুরার জাদুকরী ঝংকারে জেগে ওঠে নন্দকোষ। এর বাদীস্বর ‘ম’-এর গম্ভীর চলন আর কোমল গান্ধারের (জ্ঞ) সূক্ষ্ম ছোঁয়া শ্রোতাদের অবচেতন মনকে এক লহমায় জাগতিক সমস্ত অস্থিরতা থেকে মুক্ত করে দেয়। মাঝরাতের সেই স্তব্ধতায় রাগ নন্দকোষের প্রতিটি মীড় আর তান শ্রোতার বুকের ভেতর এক গভীর একাকীত্ব, তীব্র আর্তি এবং এক অপার্থিব প্রশান্তির জন্ম দেয়। আসরে বসা গুণী শ্রোতারা তখন চোখ বন্ধ করেও সুরের সেই শান্ত সমুদ্র নিজের চোখের সামনে জীবন্ত দেখতে পান।
এটি কেবল কিছু স্বরের জোড়াতালি নয়, বরং রাতের অন্ধকারে মানুষের অন্তরাত্মার সাথে সুরের এক পরম মনস্তাত্ত্বিক মেলবন্ধন।
তথ্যসূত্র:
উচ্চাঙ্গ ক্রিয়াত্মক সঙ্গীত — শক্তিপদ ভট্টাচার্য। নাথ ব্রাদার্স (২২ সেপ্টেম্বর ১৯৮৭)।
