শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আঙিনায় যখন দুটি ভিন্ন প্রকৃতির শক্তিশালী রাগ হাত ধরাধরি করে এক হয়, তখন সৃষ্টি হয় এক অনন্য মেলবন্ধন। তেমনই এক রাজকীয় ও যুগলবন্দি রাগ হলো ‘রাগ বসন্ত বাহার’। উত্তর ভারতীয় সঙ্গীতশাস্ত্রে বর্ণিত এই রাগটি মূলত ‘কাফি’ ঠাটের অন্তর্গত। নাম দেখেই বোঝা যায়, রাগ ‘বসন্ত’ এবং রাগ ‘বাহার’-এর এক অপূর্ব মিশ্রণে এই রাগের সৃষ্টি। বসন্ত মানেই যেমন জীর্ণতা ভুলে প্রকৃতির বুকে নতুনত্ব ও প্রাণের স্পন্দন জেগে ওঠা, এই রাগের চরিত্রটিও ঠিক তেমন।
সঙ্গীতবিদরা মনে করেন, এই রাগটি মানুষের মন থেকে সমস্ত স্বার্থপরতা, সংকীর্ণতা ও হতাশা দূর করতে এক জাদুকরী ভূমিকা পালন করে। ঠিক যেভাবে বসন্তের শুরুর পরিচ্ছন্নতা ঘরের কোণের সমস্ত মাকড়সার জাল ধুয়ে-মুছে সাফ করে দেয়, এই রাগের প্রতিটি তানও তেমনি মানুষের মনে এক নতুন আশা, সম্ভাবনা ও সুন্দর আগামীর প্রত্যাশা জাগিয়ে তোলে।
রাগ বসন্ত বাহার । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত
রাগের কারিগরি ও সুরের মিশ্রণ:
বসন্ত বাহারের চলনটি বেশ জটিল ও আঁকাবাঁকা, যাকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভাষায় ‘বক্র’ প্রকৃতি বলা হয়। এই রাগে শুদ্ধ ও তীব্র মধ্যমের পাশাপাশি কোমল ও শুদ্ধ স্বরের এক চমৎকার খেলা দেখা যায়।
- ঠাট: কাফি
- জাতি: সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (চলনটি বক্র হওয়ায় সব স্বর থাকলেও তা সোজা পথে চলে না)
- আরোহণ: স হ্ম, প, জ্ঞহ্ম, ণধ, নর্স (এখানে ‘হ্ম’ তীব্র মধ্যম, ‘জ্ঞ’ কোমল গান্ধার এবং ‘ণ’ কোমল নিষাদ)
- অবরোহণ: র্স ন দ প, হ্ম গ, হ্ম গ ঋ স (এখানে ‘দ’ কোমল ধৈবত এবং ‘ঋ’ কোমল ঋষভ)
- বাদীস্বর (রাগের প্রধান রাজা): পঞ্চম (প)
- সমবাদী স্বর (রাগের উজির বা মন্ত্রী): ষড়জ (স)
- অঙ্গ: পূর্বাঙ্গ প্রধান
- পকড় (রাগের আসল চাবিকাঠি): হ্মদঋস, ণপ, জ্ঞাঋস
যখন রাগ বসন্তের গম্ভীর ‘কোমল ঋষভ ও কোমল ধৈবত’-এর সাথে রাগ বাহারের চঞ্চল ‘কোমল গান্ধার ও দুই নিষাদ’ এসে মিলিত হয়, তখন শ্রোতার মনের ক্যানভাসে এক অভাবনীয় রঙের উৎসব তৈরি হয়।
সময়ের মায়াজাল ও শ্রোতার মনস্তত্ত্ব:
রাগ বসন্ত বাহারের আসল ম্যাজিক ও তার জাদুকরী প্রভাব টের পাওয়া যায় এর পরিবেশনের সময়ে। এই রাগের জন্য ওস্তাদরা মূলত বেছে নেন মধ্য রাত্রি বা গভীর রাতের নিঝুম সময়টিকে।
তবে যেহেতু এটি ঋতুপ্রধান রাগ, তাই বসন্তকালে দিন বা রাতের যেকোনো সময়েই এই রাগটি পরিবেশন করা যায়। গভীর রাতের নিস্তব্ধতায় যখন তানপুরার তারে তারে বসন্ত বাহার জেগে ওঠে, তখন তার বাদীস্বর ‘পঞ্চম’-এর স্থিতি আর দুই রাগের আলো-ছায়ার লুকোচুরি শ্রোতাকে এক পরম আধ্যাত্মিক প্রশান্তি দেয়। এটি কেবল কিছু স্বরের ব্যাকরণগত জোড়াতালি নয়, বরং নিঝুম রাতে মানুষের অবচেতন মনকে সমস্ত ক্লান্তি থেকে মুক্ত করে এক নতুন ও সতেজ ভোরে পদার্পণ করার এক অনন্য মনস্তাত্ত্বিক ম্যাজিক।

তথ্যসূত্র:
সঙ্গীত শাস্ত্র (তৃতীয় খণ্ড) — শ্রীইন্দু ভূষণ রায়।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর একজন বাংলাদেশি শিক্ষক, উদ্যোক্তা, সঙ্গীতানুরাগী ও সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষক। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গীত, বিশেষত শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে তিনি নিয়মিত লেখালেখি ও গবেষণামূলক চর্চা করেন। সঙ্গীতের ঐতিহ্য, নান্দনিকতা ও জ্ঞানকে বৃহত্তর মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছেন। সঙ্গীতের প্রচার, প্রসার ও সংরক্ষণে তাঁর আগ্রহ এবং সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে একজন নিবেদিতপ্রাণ সঙ্গীতপ্রেমী হিসেবে পরিচিত করেছে।













![তত্ত্ব আজ ফিরে না গেলেই কি নয় [ Aj Fire Na Gelei Ki Noy ]](https://bn.musicgoln.com/wp-content/uploads/2024/02/আজ-ফিরে-না-গেলেই-কি-নয়-1024x576.webp)

