হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতধারায় রাগ ভৈরব (বা ভৈঁরো/ভায়রো) এক পরম পবিত্র, প্রাচীন এবং মৌলিক সুরকাঠামো। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশাস্ত্রে একে ‘আদি রাগ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। দক্ষিণ ভারতীয় বা কর্ণাটকী সঙ্গীত পদ্ধতিতে এই রাগের সমতুল্য রূপটি ‘মায়ামালবগৌড়’ নামে পরিচিত। স্বয়ংসম্পূর্ণ স্বরকাঠামোর কারণে এটি ভৈরব ঠাটের জনক বা আশ্রয় রাগ হিসেবে স্বীকৃত।
Table of Contents
সাধারণ পরিচিতি ও স্বর-কাঠামো
রাগ ভৈরব মূলত প্রভাতকালের রাগ। এটি গম্ভীর ও ভক্তিভাবাপন্ন রসের সৃষ্টি করে। এই রাগে কোমল ঋষভ (ঋ) এবং কোমল ধৈবত (দ) অত্যন্ত সুনিপুণভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে ব্যবহৃত হয়, আর বাকি সকল স্বর থাকে শুদ্ধ।
| বৈশিষ্ট্য | বিবরণ |
| ঠাটের নাম | ভৈরব (জনক রাগ) |
| জাতি | সম্পূর্ণ-সম্পূর্ণ (আস্থা ও চলনভেদে) |
| বাদী স্বর | কোমল ধৈবত (দ) |
| সংবাদী স্বর | কোমল ঋষভ (ঋ) |
| অঙ্গ | উত্তরাঙ্গ প্রধান |
| গ্রহ স্বর | শুদ্ধ গান্ধার (গ) |
| গায়ন সময় | দিবসের প্রথম প্রহর (প্রাতঃকাল) |
| রস/প্রকৃতি | অত্যন্ত গম্ভীর, শান্ত, আধ্যাত্মিক ও ভক্তিপ্রধান |
আরোহণ, অবরোহণ ও পকড়
- আরোহণ: স ঋ গ ম প দ ন র্স
- অবরোহণ: র্স ন দ প ম গ ঋ স
- পকড় (চিহ্নিতকারী স্বরগুচ্ছ):
- গ ম প ণদ, প, ম গ ম, ঋ স
- গ ম প ণদ, ন র্স, দ, প, গ ম প গ ম ঋ স
ভৈরবাঙ্গ ও স্বর-প্রয়োগের সূক্ষ্মতা
১. পূর্বাঙ্গের রূপায়ন
পূর্বাঙ্গে ‘গ ম প গ ম গ ঋ, স’ স্বরপ্রবাহের প্রাধান্য দেখা যায়। এখানে শুদ্ধ গান্ধার থেকে সুর শুরু হয়ে ম-প-গ-ম ঘুরে কোমল ঋষভে এসে স্থিত হয়। এই রাগে মধ্যম (ম) একটি অন্যতম ন্যাস স্বর (বিরামের স্থান)। গান্ধার স্পর্শ করে কোমল ঋষভে আসা এবং ঋষভে সূক্ষ্ম আন্দোলন প্রয়োগ করা ভৈরবের প্রধান শর্ত। অনেক সময় বিলম্বিত মীড়ের সাহায্যে মধ্যম (ম) থেকে সরাসরি কোমল ঋষভে (ঋ) অবতরণ করা হয়।
২. উত্তরাঙ্গের রূপায়ন
উত্তরাঙ্গে ‘দ ন র্স’ স্বরবিন্যাসে সুর বিস্তৃত হয়। উত্তরাঙ্গে পৌঁছানোর পূর্বে কোমল নিষাদ ছুঁয়ে ধৈবতে বিরাম নেওয়া হয় (যেমন: গ ম ণদ)। এরপর পঞ্চমে সামান্য স্থিরতা এনে পুনরায় পূর্বাঙ্গের স্বরপ্রবাহে ফিরে আসা হয় (যেমন: গ ম ণদ, প, প গ ম গ ঋ স)।
যখন শুদ্ধ নিষাদ থেকে কোমল ধৈবতে সুর নামানো হয়, তখন বিলম্বিত ও মীড়যুক্ত উপস্থাপন প্রয়োজন হয়। একইভাবে তার সপ্তকের ‘র্স’ থেকে ধৈবতে (দ) অবতরণের সময় গভীর মীড় ব্যবহৃত হয়। কিছু দক্ষ শিল্পী এই রাগে চমৎকার বৈচিত্র্য আনতে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কোমল নিষাদও (ণ) প্রয়োগ করে থাকেন।
ঐতিহাসিক বিবর্তন ও প্রাচীন রাগ-রাগিণী শ্রেণীবদ্ধকরণ
- ব্রহ্মামত:
- প্রধান রাগ: ভৈরব
- রাগিণী: ভৈরবী, গুর্জরী, রামকেলী, গুণকলি, সৈন্ধবী, বাঙ্গালী।
- কল্পিনাথ মত:
- প্রধান রাগ: ভৈরব
- রাগিণী: ভৈরবী, গুর্জরী, বেলাবেলী, বিহাগ (বা বাদহংসী), কর্ণাট, কানাড়া (বা ভাষা)।
- হনুমন্ত মত:
- প্রধান রাগ: ভৈরব
- রাগিণী: মধুমাধবী, ভৈরবী, বঙ্গালী, বরাড়ী, সিন্ধু (সৈন্ধবী)।
- ভরত মত:
- প্রধান রাগ: ভৈরব
- রাগিণী: মধুমাধবী, ভৈরবী, বাঙ্গালী, বরারী, সৈন্ধবী।
- পুত্র: বিলাবল, পঞ্চম, দেসাখ্য, দেবগান্ধার, বিভাষ।
- পুত্রবধূ: রামকলী, সুহাই, সুঘরাই, পটমঞ্জরী, তোড়ি।
প্রাচীন ভৈরব বনাম আধুনিক ভৈরব
- আদি ভৈরব বা সরস্বতী ভৈরব: প্রাচীনকালে ভৈরব রাগে ঋষভ ও পঞ্চম বর্জিত ছিল, ফলে তা ছিল ঔড়ব-ঔড়ব জাতীয় রাগ। ঋষভ ও পঞ্চমহীন এই রূপকে আদি ভৈরব বলা হতো।
- পণ্ডিত ভাবভট্টের শ্রেণীবদ্ধকরণ: ভাবভট্ট জাতির বিচারে ভৈরবকে তিন ভাগে ভাগ করেছিলেন—ঔড়ব (রে-প বর্জিত), ষাড়ব (প বর্জিত) এবং সম্পূর্ণ।
- প্রাচীন ‘শুদ্ধ ভৈরব’: প্রাচীন ‘রাগমালা’ গ্রন্থে বর্ণিত শুদ্ধ ভৈরবে কোমল গান্ধার ও কোমল নিষাদের ব্যবহার ছিল (স জ্ঞ ম প দ ণ র্স – র্স ণ দ প ম জ্ঞ স)। বর্তমানে এই রূপটির প্রচলন নেই।
রস ও ভাবমণ্ডল
ভারতীয় রসশাস্ত্রে প্রাচীনকালে ভৈরবকে করুণা ও বিয়োগান্তক নৈরাশ্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। তবে কালক্রমে প্রভাতকালীন রাগ হিসেবে ভৈরবের যে রূপটি স্থায়ী হয়েছে, তাতে গাম্ভীর্য, আধ্যাত্মিক একাগ্রতা এবং গভীর প্রশান্তির সঞ্চার ঘটে। এর গম্ভীর প্রকৃতি শ্রোতার মনকে ঈশ্বরচিন্তা ও শান্তির দিকে চালিত করে।
রবীন্দ্রসঙ্গীতে ‘রবীন্দ্র ভৈরব’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতীয় শাস্ত্রীয় রাগের মূল রূপ ধরে রাখার পাশাপাশি নিজস্ব ধারায় একাধিক রাগের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। রাগ ভৈরব এবং রাগ ভৈরবীর সংমিশ্রণে রবীন্দ্রসঙ্গীতে যে নতুন আবহ তৈরি হয়েছে, সঙ্গীততাত্ত্বিক পণ্ডিত ভি. ভি. ওয়াঝলওয়ার তাকে ‘রবীন্দ্র ভৈরব’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
এই কাঠামোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—গানটি স্থায়ীতে রাগ ভৈরব দিয়ে শুরু হয়, কিন্তু অন্তরায় গিয়ে সুর রাগ ভৈরবী রাগে প্রবেশ করে এবং পরবর্তীতে পুনরায় ভৈরবে ফিরে আসে।
রবীন্দ্র ভৈরব রাগে নিবদ্ধ উল্লেখযোগ্য রবীন্দ্রসঙ্গীত:
- অলকে কুসুম না দিয়ো (প্রেম-১২৬)
- আমার এ পথ তোমার পথের থেকে (প্রেম-২৮৩)
- আমার জীবনপাত্র উচ্ছলিয়া মাধুরী (প্রেম-৪৩, ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্য)
- আমার মন কেমন করে (প্রেম-২১৪)
- আর নহে, আর নহে (প্রেম-২১০)
- ওগো কে যায় বাঁশরি বাজায়ে (প্রেম-৩০০)
- কাঁদার সময় অল্প ওরে (প্রেম-১৬৮)
- কে আমারে যেন এনেছে ডাকিয়া (প্রেম-১৮৮)
- কোন্ দেবতা সে কী পরিহাসে (প্রেম-৩৩২)
- গানের ডালি ভরে দে গো (প্রেম-৭)
- ধরা দিয়েছি গো আমি আকাশের পাখি (প্রেম-৫৪)
- যদি জানতেম আমার কিসের ব্যথা (প্রেম-৪৬; গানটির সূচনা ‘বসন্ত মুখারি’ এবং পরবর্তী অংশ ‘রবীন্দ্র ভৈরব’ ভিত্তিক)
বাংলা আধুনিক ও জনপ্রিয় গানে রাগ ভৈরব
- আশায় আশায় বসে আছি — মহীনের ঘোড়াগুলি (সুর ও কণ্ঠ: গৌতম চট্টোপাধ্যায়)
- তুমি নিজের মুখেই বললে যেদিন — কণ্ঠ: মান্না দে (সুর: প্রভাস দে, কথা: পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়)
- কতকাল দেখিনি তোমায় — কণ্ঠ: প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় (সুর: হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কথা: পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়)
তথ্যসূত্র ও সহায়ক গ্রন্থাবলী
- লাহিড়ী, চিন্ময়। মগন-গীত ও তানমঞ্জরী, প্রথম খণ্ড। ১৪ এপ্রিল, ১৯৮৫।
- খান, রাজা নওয়াব আলী। মারিফুন্নাগমাত। অনুবাদ: মকসুদুর রহমান হিলালী। বাংলা একাডেমি, বর্ধমান হাউস, জুলাই ১৯৬৭।
- “রাগ চেনা।” সঙ্গীত-প্রকাশিকা। মাঘ ১৩০৮, পৃষ্ঠা: ৫১-৫২।
- শর্মা, লোচন। রাগতরঙ্গিণী। সম্পাদনা ও ভাষান্তর: রাজ্যেশ্বর মিত্র। নবপত্র প্রকাশন, কলকাতা, ১ বৈশাখ ১৩৯১।
- ভট্টাচার্য্য, শ্রীশচীন্দ্র নাথ। রাগ বিন্যাস (প্রথম কলি)। এস. চন্দ্র এন্ড কোং, শারদীয়া সপ্তমী, সেপ্টেম্বর ১৯৭৬।
- চক্রবর্তী, সুরেশচন্দ্র। রাগ-রূপায়ণ। জেনারেল প্রিন্টার্স অ্যান্ড পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, পৃষ্ঠা: ৩৩-৩৫।
- ভাতখণ্ডে, পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ। হিন্দুস্থানী সঙ্গীত-পদ্ধতি, দ্বিতীয় খণ্ড। অনুবাদ ও সম্পাদনা: ধরিত্রী রায় ও অসীমকুমার চট্টোপাধ্যায়। দীপায়ন, কলকাতা।
- ওয়াঝলওয়ার, ভি. ভি. “রবীন্দ্রসঙ্গীতে রাগ-নির্ণয়।” রবীন্দ্রনাথের প্রেমের গান। সংগীত-শিক্ষায়তন, বৈশাখ ১৩৯০, পৃষ্ঠা: ৭৫।

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর একজন বাংলাদেশি শিক্ষক, উদ্যোক্তা, সঙ্গীতানুরাগী ও সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষক। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গীত, বিশেষত শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে তিনি নিয়মিত লেখালেখি ও গবেষণামূলক চর্চা করেন। সঙ্গীতের ঐতিহ্য, নান্দনিকতা ও জ্ঞানকে বৃহত্তর মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছেন। সঙ্গীতের প্রচার, প্রসার ও সংরক্ষণে তাঁর আগ্রহ এবং সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে একজন নিবেদিতপ্রাণ সঙ্গীতপ্রেমী হিসেবে পরিচিত করেছে।













