রাগ মীণাক্ষী । নজরুলসৃষ্ট রাগ । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

বাংলা গান আর সুরের ভুবনে কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন এক মস্ত বড় বিপ্লবী এবং নতুন সুরের জাদুকর। প্রচলিত রাগের বাইরে গিয়ে তিনি নিজের কল্পনা আর সাধনা দিয়ে বেশ কিছু নতুন রাগ সৃষ্টি করেছিলেন, যা বাংলা সঙ্গীতকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তেমনই একটি অদ্ভুত সুন্দর, চঞ্চল এবং নান্দনিক রাগের নাম ‘রাগ মীণাক্ষী’

রাগ মীণাক্ষী: নজরুলসৃষ্ট এক চঞ্চল ও অনিন্দ্য সুন্দর সুরের রূপরেখা

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কেবল শব্দের জাদুকরই ছিলেন না, তিনি ছিলেন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের এক মহান গবেষক ও রূপকার। তাঁরই হাত ধরে সৃষ্টি হয়েছে ‘রাগ মীণাক্ষী’। জলের বুকে মাছের গতি যেমন আঁকাবাঁকা ও চঞ্চল হয়, এই রাগের চলন এবং প্রকৃতিও ঠিক তেমনই বক্র ও চপল। আর এই মৎসের (মাছের) ন্যায় বক্র গতির কারণেই কবি এর নামকরণ করেছিলেন ‘মীণাক্ষী’।

তৎকালীন বিখ্যাত ‘বেতার জগৎ’ পত্রিকায় কবির নিজস্ব লেখা থেকে জানা যায়, এই রাগটির ভেতরে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তিনটি বিখ্যাত রাগ—নীলাম্বরী, কাফি এবং হংসকিঙ্কিনী-র এক মায়াবী আভাস বা ছায়া পাওয়া যায়।

রাগ মীণাক্ষী-এর ব্যাকরণ ও পরিচিতি

নজরুল সঙ্গীত এবং শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের নিয়ম অনুযায়ী এই রাগের মূল কাঠামোটি নিচে তুলে ধরা হলো:

  • উৎস ও ঠাট (Thaat): এটি কবি নজরুলের নিজস্ব সৃষ্টি, যা উত্তর ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতিতে কাফী ঠাটের অন্তর্গত।
  • জাতি (Jati): এই রাগের জাতি হলো ষাড়ব-সম্পূর্ণ। এর আরোহণে নিষাদ (ণ) স্বরটি বর্জিত থাকে (৬টি স্বর), তবে অবরোহণের সময় ৭টি স্বরই (সম্পূর্ণ রূপ) ব্যবহৃত হয়।
  • বাদী স্বর (Vadi Swar): এই রাগের প্রধান বা রাজা স্বর হলো ঋষভ (রে)
  • সমবাদী স্বর (Samvadi Swar): রাগের দ্বিতীয় প্রধান বা মন্ত্রী স্বর হলো পঞ্চম (পা)
  • অঙ্গ (Anga): এটি একটি পূর্বাঙ্গ প্রধান রাগ।
  • পরিবেশনের সময় (Time): রাগ মীণাক্ষী গাওয়ার বা বাজানোর আদর্শ সময় হলো রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর
  • সমপ্রকৃতির রাগ: এই রাগের চঞ্চলতার সাথে পাহাড়ী (খাম্বাজ ঠাটের) এবং তিলককামোদ রাগের বেশ মিল পাওয়া যায়।

 

আরোহণ, অবরোহণ ও পকড়

রাগের সেই চঞ্চল আর বক্র গতিটি বোঝার জন্য এর স্বরলিপির চলন নিচে দেওয়া হলো:

আরোহণ: ণ্‌, ধ্ স ণ্ র, গ ম প, গ ম প ধ র্স

অবরোহণ: র্স ণ ধ ম, প, প দ প, ম জ্ঞ র, গ স

পকড় (রাগের মূল রূপ): ণ্, ধ্ স ণ্ র, গ ম প, ম জ্ঞ র, গ স

এই রাগে নিবদ্ধ নজরুলসঙ্গীত

কাজী নজরুল ইসলাম নিজে এই রাগের ওপর ভিত্তি করে তাঁর একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও চমৎকার গান বেঁধেছিলেন। গানটি হলো:

“চঞ্চল আঁখির ভাষায়, হে মীণাক্ষী” [গান নম্বর: ১৩৮৪]

রাগ মীণাক্ষী (নজরুলসৃষ্ট রাগ)

রাগ মীণাক্ষী প্রমাণ করে যে নজরুল কেবল বিদ্রোহী কবিই ছিলেন না, সুরের সূক্ষ্ম কারুকাজেও তিনি কতটা পারদর্শী ছিলেন। মাছের চোখের মতো চঞ্চল আর জলের ঢেউয়ের মতো বক্র এই সুরের ধারা আজও নজরুল সঙ্গীতের বোদ্ধা ও শ্রোতাদের মুগ্ধ করে।

নজরুলের এই অনন্য সৃষ্টি নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজনটি আপনার কেমন লাগল, তা কমেন্ট করে জানাতে পারেন। ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না!

Leave a Comment