সরোদের সুরে বাংলা-উপমহাদেশের সেতুবন্ধন বাহাদুর খান

শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসে কিছু শিল্পীর অবদান তাঁদের জীবদ্দশার সাফল্যকে ছাড়িয়ে যায়। তাঁরা একটি নির্দিষ্ট ঘরানা বা বাদ্যযন্ত্রের শিল্পী হয়ে থাকেন না; বরং নিজেদের সাধনা দিয়ে একাধিক সাংস্কৃতিক ধারার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেন। ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খান ছিলেন তেমনই এক শিল্পী। সরোদবাদক হিসেবে যেমন তিনি শাস্ত্রীয় সংগীতে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন, তেমনি সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবেও বাংলা চলচ্চিত্র এবং উপমহাদেশের সংগীতভুবনে গুরুত্বপূর্ণ ছাপ রেখে গেছেন।

১৯৩১ সালের ১৯ জানুয়ারি তৎকালীন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বাহাদুর হোসেন খান। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত সরোদবাদক ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁর সন্তান এবং কিংবদন্তি সংগীতসাধক ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর ভাতিজা। ফলে ছোটবেলা থেকেই তাঁর চারপাশে ছিল উচ্চাঙ্গ সংগীতের নিবিড় পরিবেশ। পরিবারে সংগীত ছিল কেবল জীবিকার মাধ্যম নয়, বরং দীর্ঘ সাধনা ও শৃঙ্খলার বিষয়।

আয়েত আলী খাঁর সন্তানদের মধ্যে আবেদ হোসেন খান, মোবারক হোসেন খান, শেখ সাদী খান, তানসেন খান ও ইয়াসমিন খানসহ অনেকে সংগীত ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল বাহাদুর খানের শিল্পীসত্তা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শৈশবেই বাবার কাছে সরোদের প্রাথমিক তালিম শুরু হয় তাঁর। পরে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় মাইহারে। সেখানে চাচা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর কাছে তিনি দীর্ঘ সময় কঠোর অনুশীলন করেন। মাইহারের সাধনাপর্ব তাঁর সংগীতজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। রাগসংগীতের সূক্ষ্মতা, তাল-লয়ের শৃঙ্খলা, পরিবেশনার কাঠামো এবং সুরের আবেগ—সবকিছুর ওপর এই শিক্ষার গভীর প্রভাব পড়ে।

১৯৪৯ সালে বাংলাদেশ বেতারের শিল্পী হিসেবে বাহাদুর হোসেন খানের কর্মজীবনের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। এরপর ১৯৫১ সালে তিনি বোম্বে, বর্তমান মুম্বাইয়ে পাড়ি জমান। সেখানে নৃত্যশিল্পী শান্তি বর্মণের ‘লিটল ব্যালে ট্রুপ’-এর সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। এই সময় থেকেই তাঁর সংগীতচর্চা শুধু শাস্ত্রীয় সংগীতের মঞ্চে সীমাবদ্ধ থাকেনি; নৃত্য, নাট্য ও চলচ্চিত্রের মতো ভিন্ন ভিন্ন শিল্পমাধ্যমের সঙ্গেও তাঁর কাজের পরিধি বাড়তে থাকে।

বাহাদুর খানকে শুধু একজন সরোদবাদক হিসেবে বিবেচনা করলে তাঁর সৃষ্টিশীলতার বড় একটি অংশ বাদ পড়ে যায়। তিনি ছিলেন দক্ষ সুরকার ও সংগীত পরিচালক। বিশেষ করে চলচ্চিত্রের সংগীতে তাঁর কাজ তাঁকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।

ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্বিক ঘটকের একাধিক চলচ্চিত্রের সঙ্গে বাহাদুর খানের সংগীত-সম্পৃক্ততা ছিল। ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘সুবর্ণরেখা’ এবং ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে তাঁর সংগীতসৃষ্টির ছাপ পাওয়া যায়। এসব কাজে শাস্ত্রীয় সংগীতের উপাদানকে চলচ্চিত্রের গল্প, চরিত্র ও আবহের সঙ্গে মিলিয়ে ব্যবহারের সক্ষমতা প্রকাশ পেয়েছে।

‘সুবর্ণরেখা’ তাঁর চলচ্চিত্র সংগীত পরিচালনার উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর একটি। এর পাশাপাশি ‘নতুন পাতা’, ‘ত্রিসন্ধ্যায়’, ‘যেখানে দাঁড়িয়ে’, ‘শ্বেত ময়ূর’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ এবং ‘গরম হাওয়া’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে তাঁর সংগীত-প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ও ‘নদী ও নারী’র মতো চলচ্চিত্রে তাঁর সংগীত ও অর্কেস্ট্রেশনের কাজ স্মরণীয় হয়ে আছে।

চলচ্চিত্রের বাইরে প্রামাণ্যচিত্রেও বাহাদুর খানের সংগীত পরিচালনার পরিচয় পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ এবং শিল্পাচার্য যামিনী রায়কে নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রের আবহসংগীতেও তিনি কাজ করেছেন। এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, তাঁর সংগীতচর্চার ক্ষেত্র কতটা বিস্তৃত ছিল। সরোদের একক পরিবেশনা থেকে শুরু করে নৃত্য, চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র—বিভিন্ন মাধ্যমেই তিনি নিজের সুরের ভাষা প্রয়োগ করেছেন।

শিল্পী হিসেবে তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় ছিল শিক্ষকতা। কলকাতার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় আলী আকবর কলেজ অব মিউজিকে তিনি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত পড়িয়েছেন। তাঁর শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরবর্তীকালে পরিচিতি পাওয়া সরোদশিল্পী তেজেন্দ্রনারায়ণ মজুমদারও ছিলেন। ফলে তাঁর অবদান শুধু নিজের পরিবেশনা বা রচনায় সীমাবদ্ধ ছিল না; পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পী গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল।

বাহাদুর খানের সরোদ পরিবেশনার কিছু রেকর্ড প্রকাশিত হলেও তাঁর শিল্পীজীবনের তুলনায় সংরক্ষিত ও সহজলভ্য রেকর্ডিংয়ের পরিমাণ সীমিত। সময়ের সঙ্গে বহু পুরোনো পরিবেশনা ও সংগীতকর্ম সাধারণ শ্রোতার নাগালের বাইরে চলে গেছে। তাঁর মতো শিল্পীর সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণ, পুনঃপ্রকাশ এবং ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরির প্রয়োজনীয়তা এখানেই বিশেষভাবে সামনে আসে।

বাহাদুর হোসেন খানের শিল্পীসত্তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ঐতিহ্য ও আধুনিক মাধ্যমের মধ্যে তাঁর স্বাভাবিক যাতায়াত। মাইহারের কঠোর শাস্ত্রীয় তালিম তাঁর সংগীতের ভিত তৈরি করেছিল। কিন্তু সেই শিক্ষাকে তিনি কেবল প্রচলিত পরিবেশনার মধ্যে আটকে রাখেননি। চলচ্চিত্রের দৃশ্য, চরিত্রের আবেগ কিংবা গল্পের পরিবেশ অনুযায়ী সুরের প্রয়োগে তিনি নিজের সৃষ্টিশীলতার পরিচয় দিয়েছেন।

তাঁর জীবন ছিল মাত্র ৫৮ বছরের। কিন্তু এই স্বল্প সময়েই তিনি সরোদবাদক, সুরকার, সংগীত পরিচালক ও শিক্ষক—বহু পরিচয়ে কাজ করেছেন। তাঁর সৃষ্টিশীলতার বিস্তার ছড়িয়ে ছিল বাংলাদেশ, ভারত এবং বৃহত্তর উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসরে।

১৯৮৯ সালের ৩ অক্টোবর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খান। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একজন শিল্পীর জীবনাবসান ঘটলেও তাঁর সংগীতচর্চার উত্তরাধিকার শেষ হয়ে যায়নি। সরোদের তারে যে সাধনা তিনি ধারণ করেছিলেন, তা তাঁর রেকর্ডিং, চলচ্চিত্রের সংগীত, শিক্ষার্থী এবং পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্য দিয়ে বিভিন্নভাবে টিকে আছে।

শিবপুরে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী মাইহারের সংগীতসাধনার সঙ্গে নিজের জন্মভূমির সাংস্কৃতিক পরিচয়কে মিলিয়ে এক বিস্তৃত শিল্পভুবন নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর কাজ মনে করিয়ে দেয়, শাস্ত্রীয় সংগীত কেবল নির্দিষ্ট মঞ্চ বা শ্রোতাগোষ্ঠীর শিল্প নয়; সৃজনশীলতার মাধ্যমে তা চলচ্চিত্র, নৃত্য, প্রামাণ্যচিত্র এবং নতুন প্রজন্মের শিক্ষার সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে।

আজ ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খানকে স্মরণ করার অর্থ শুধু একজন সরোদবাদককে স্মরণ করা নয়। এটি বাংলা ও উপমহাদেশের সংগীত-ঐতিহ্যের এমন এক অধ্যায়কে ফিরে দেখা, যেখানে কঠোর সাধনা, উত্তরাধিকার, সৃজনশীলতা এবং বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমের সঙ্গে সংযোগ একসঙ্গে মিলেছিল।

তাঁর সরোদের সুর আজ হয়তো আগের মতো নিয়মিত শোনা যায় না। কিন্তু বাংলা ও ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে তাঁর অবদান এখনও স্মরণযোগ্য। শিল্পীর জীবন থেমে যায়, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পেলে সেই সুর আবারও জীবন্ত হয়ে ওঠে।

ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খানের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা।

Tags :

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

সম্পাদক ও প্রকাশক : সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর।

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।