সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই জানুয়ারি ২০০০, ২:২ এএম

১৮৮৭ সালে জার্মান-মার্কিন উদ্ভাবক এমিল বার্লিনার প্রথম সমতল ডিস্ক রেকর্ড এবং তা বাজানোর যন্ত্র ‘গ্রামোফোন’ আবিষ্কার করেন। এর আগে টমাস এডিশনের ফোনোগ্রাফে চোঙাকৃতি (Cylinder) রেকর্ড ব্যবহৃত হতো, যা ছিল ব্যয়বহুল এবং রক্ষণাবেক্ষণ করা কঠিন।
প্রথম বিপণন: বার্লিনার ৫ ইঞ্চি ব্যাসের রেকর্ড দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন, যা মূলত খেলনা হিসেবে ইউরোপে বাজারজাত করা হতো।
কোম্পানি প্রতিষ্ঠা: ১৮৯২ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে তিনি United States Gramophone Company প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৯৪ সালে প্রথম বাণিজ্যিক ৭ ইঞ্চি রেকর্ড বাজারে আসে, যার লেবেল ছিল ‘Berliner Gramophone’।

Table of Contents
১৮৯৭ সালে উইলিয়াম ব্যারি ওয়েন বার্লিনারের সাথে যুক্ত হয়ে লন্ডনে The Gramophone Company প্রতিষ্ঠা করেন। ব্যবসার বৈচিত্র্য আনতে ১৯০০ সালে তারা ল্যাম্বার্ট টাইপরাইটার তৈরির অধিকার পায়, ফলে কোম্পানির নাম বদলে হয় Gramophone & Typewriter Ltd.।
আমেরিকার শাখা: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোম্পানির অবনতি হলে এল্ড্রিজ আর. জনসন Victor Talking Machine Company প্রতিষ্ঠা করেন। তারা কলাম্বিয়া রেকর্ডসের সাথে আইনি লড়াই শেষে সমতল (Flat) রেকর্ড তৈরিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন।
সংরক্ষণ: ১৯০৭ সালে আলফ্রেড ক্লার্ক প্যারিস অপেরার জন্য ২৪টি বিশেষ রেকর্ড তৈরি করেন, যা লোহা ও সীসার বাক্সে ভরে অপেরা হাউসের মাটির নিচে ‘টাইম ক্যাপসুল’ হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছিল।

ব্রিটিশ ভারতে গ্রামোফোন রেকর্ডের যাত্রা শুরু হয় বিংশ শতাব্দীর একেবারে শুরুতে। কলকাতায় এর প্রথম শাখা ব্যবস্থাপক ছিলেন জন ওয়াটসন হাওড।
প্রতিযোগিতা ও একচেটিয়া বাজার: ১৯০৫ থেকে ১৯০৯ সালের মধ্যে স্থানীয় অনেক কোম্পানি যেমন— ‘ডোয়ার্কিন এন্ড সন’, ‘মুখার্জি এ্যান্ড মুখার্জি’ (রয়্যাল রেকর্ড) এবং ‘বীণাপাণি রেকর্ড’ গ্রামোফোন কোম্পানির প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে বন্ধ হয়ে যায়। ১৯০৮-০৯ সালে ভারতের রেকর্ডের বাজারের প্রায় সিংহভাগ এই কোম্পানির দখলে চলে আসে।
ইউরোপীয় চ্যালেঞ্জ ও মূল্যযুদ্ধ: ১৯০৮-১০ সালের দিকে বেকা, ওডেন, জেমস ডিস্ক এবং বিশেষ করে ‘সান ডিস্ক’ রেকর্ড বাজারে এলে প্রতিযোগিতা তীব্র হয়। সান ডিস্ক মাত্র ২ টাকায় উভপার্শ্বিক রেকর্ড বিক্রি শুরু করলে গ্রামোফোন কোম্পানি তাদের ‘জোনোফোন’ (Zonophone) লেবেলের মাধ্যমে সস্তায় রেকর্ড বাজারে ছাড়ে।
এইচএমভি-এর বিশ্বখ্যাত লোগোটি একটি কুকুর এবং একটি গ্রামোফোন হর্নের ছবি। ছবির এই কুকুরটির নাম ছিল নিপ্পার (Nipper)।
উৎস: ১৮৮৪ সালে জন্ম নেওয়া নিপ্পারের মালিক ছিলেন মার্ক হেনরি বারবাউড। তার মৃত্যুর পর তার ভাই শিল্পী ফ্রান্সিস বারবাউড ১৮৯৮ সালে একটি ছবি আঁকেন যেখানে নিপ্পন একটি ফোনোগ্রাফের শব্দ শুনছে।
প্রত্যাখ্যান ও গ্রহণ: প্রথমে এডিশন-বেল কোম্পানি ছবিটি প্রত্যাখ্যান করে এই বলে যে, “কুকুর ফোনোগ্রাফ শোনে না”। পরবর্তীতে ১৮৯৯ সালে গ্রামোফোন কোম্পানি ছবিটি কিনে নেয় এবং ফোনোগ্রাফের বদলে সমতল ডিস্ক গ্রামোফোন যুক্ত করে দেয়। ১৯০৯ সাল থেকে এই লোগোটি কোম্পানির প্রধান বাণিজ্যিক প্রতীকে পরিণত হয়।
১৯৩১ সালে ঐতিহাসিক এক প্রেক্ষাপটে কলাম্বিয়া গ্রাফোফোন কোম্পানি এবং দ্য গ্রামোফোন কোম্পানি একত্রিত হয়ে গঠন করে Electric and Musical Industries Ltd (EMI)। এটি বিশ্ব সংগীতের ইতিহাসে অন্যতম বড় মার্জার হিসেবে পরিচিত।
ভারতে এইচএমভি-এর বিবর্তন ছিল দীর্ঘ ও নাম পরিবর্তনের ধারায় সমৃদ্ধ:
কোম্পানি গঠন: ১৯৪৬ সালের ১৩ আগস্ট ভারতে ‘The Gramophone Co. (India) Limited’ যাত্রা শুরু করে।
নাম পরিবর্তন: ১৯৫৬ সালে এটি প্রাইভেট কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয় এবং ১৯৬৮ সালে পুনরায় ‘The Gramophone Company of India Limited’ নাম ধারণ করে।
মালিকানা বদল: ১৯৮৫ সালে ভারতের বিখ্যাত শিল্পগোষ্ঠী আরপিজি গ্রুপ (RPG Group) ইএমআই-এর কাছ থেকে এই কোম্পানির মালিকানা কিনে নেয়।
সারেগামা যুগ: আধুনিক যুগের সাথে তাল মেলাতে ২০০০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কোম্পানির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘সারেগামা’ (Saregama India Limited)। বর্তমানে এটি ভারতের প্রাচীনতম এবং অন্যতম বৃহৎ সংগীত সংগ্রহশালা।
ভারতে গ্রামোফোন কোম্পানির আধিপত্য বিস্তারের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল স্থানীয় শিল্পীদের কণ্ঠ রেকর্ড করা।
ফ্রেড গেইসবার্গ (Fred Gaisberg): ১৯০২ সালে গ্রামোফোন কোম্পানির দক্ষ প্রকৌশলী ফ্রেড গেইসবার্গ কলকাতায় আসেন। তিনি হীরালাল সেনের স্টুডিওতে প্রথম ভারতীয় শিল্পী হিসেবে গওহর জানের গান রেকর্ড করেন।
প্রথম রেকর্ড: ১৯০২ সালের ১১ নভেম্বর গওহর জানের কণ্ঠে ‘খাম্বাজ’ রাগের একটি গান রেকর্ড করা হয়। রেকর্ডের শেষে তিনি ইংরেজিতে ঘোষণা করেছিলেন— “My name is Gauhar Jaan”। এটি ছিল রেকর্ডিং ইঞ্জিনিয়ারের বোঝার সুবিধার্থে একটি ঘোষণা, যা পরবর্তীকালে ঐতিহ্যে পরিণত হয়।
প্রসার: গওহর জানের সাফল্যের পর জানকী বাঈ, জোহরা বাঈ এবং লালচাঁদ বড়ালের মতো শিল্পীদের গান রেকর্ড করা শুরু হয়।
ভারতের বাজারে রেকর্ডের চাহিদা এতই বেড়ে গিয়েছিল যে ইংল্যান্ড থেকে রেকর্ড আনিয়ে সরবরাহ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
কারখানা স্থাপন: ১৯০৮ সালে কলকাতার উপকণ্ঠে দমদমে গ্রামোফোন কোম্পানি তাদের নিজস্ব রেকর্ড তৈরির কারখানা স্থাপন করে। এটি ছিল এশিয়ার প্রথম রেকর্ড তৈরির কারখানা।
যান্ত্রিক অগ্রগতি: প্রথম দিকে রেকর্ডগুলো ছিল এক-পার্শ্বিক (Single-sided)। ১৯০৮ সালের পর থেকে দুই-পার্শ্বিক (Double-sided) রেকর্ড উৎপাদন শুরু হয়, যা সাধারণ মানুষের কাছে আরও সাশ্রয়ী হয়ে ওঠে।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে কলাম্বিয়া গ্রাফোফোন কোম্পানি এবং গ্রামোফোন কোম্পানি ছিল একে অপরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।
মন্দার প্রভাব: ১৯২৯ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার (The Great Depression) ফলে রেকর্ড ব্যবসায় ধস নামে। টিকে থাকার স্বার্থে ১৯৩১ সালের মার্চ মাসে এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
ইএমআই-এর জন্ম: এই একীভূতকরণের ফলে জন্ম নেয় Electric and Musical Industries Ltd (EMI)। তবে ভারতে তারা ‘দ্য গ্রামোফোন কোম্পানি অফ ইন্ডিয়া’ নামেই তাদের ব্যবসা চালিয়ে যেতে থাকে এবং ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’ (HMV) লোগোটি ব্র্যান্ড হিসেবে রয়ে যায়।
বেতার (রেডিও) এবং সবাক চলচ্চিত্রের আবির্ভাব রেকর্ড ব্যবসার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে।
চলচ্চিত্র সংগীত: ১৯৩১ সালে প্রথম সবাক বাংলা ছবি ‘জামাই ষষ্ঠী’ মুক্তির পর চলচ্চিত্রের গান রেকর্ডের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এইচএমভি অত্যন্ত চতুরতার সাথে চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয় এবং বড় পর্দার গানগুলোকে সাধারণ মানুষের ড্রয়িংরুমে পৌঁছে দেয়।
রবীন্দ্রসংগীতের অধিকার: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান রেকর্ড করার ক্ষেত্রে এইচএমভি-এর সাথে বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের দীর্ঘদিনের কপিরাইট চুক্তি ছিল, যা বাংলা গানের বাজারে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
প্রযুক্তির পরিবর্তনে ৭৮ আরপিএম (RPM) রেকর্ডের যুগ শেষ হয়ে আসে।
লং প্লেয়িং রেকর্ড (LP): ১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে এইচএমভি ভারতে এলপি রেকর্ড চালু করে। একটি ডিস্কে অনেক বেশি গান এবং উন্নত মানের শব্দের কারণে এটি উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের কাছে জনপ্রিয় হয়।
অডিও ক্যাসেট: ১৯৭০-এর দশকের শেষে এবং ৮০-র দশকের শুরুতে অডিও ক্যাসেট বাজারে আসে। এটি ছিল অনেক সস্তা এবং বহনযোগ্য। এইচএমভি তাদের বিশাল গানের ভাণ্ডার ক্যাসেটে রূপান্তর করতে শুরু করে।
রেকর্ড এবং ক্যাসেটের যুগ পেরিয়ে যখন সিডি (CD) এবং ইন্টারনেটের যুগ আসে, তখন কোম্পানিটি নতুন পরিচিতি পায়।
মালিকানা পরিবর্তন: ১৯৮৫ সালে আরপিজি গ্রুপ এটি অধিগ্রহণ করে। ২০০০ সালে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘সারেগামা ইন্ডিয়া লিমিটেড’।
কার্ভা (Carvaan): ২০১৭ সালে সারেগামা ‘কার্ভা’ নামক একটি ডিজিটাল মিউজিক প্লেয়ার বাজারে ছাড়ে, যা মূলত এইচএমভি-এর সেই পুরনো স্বর্ণযুগের গানগুলোকে নতুন প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে।
১. Country Music Records: A Discography, 1921-1942 – টনি রাসেল (অক্সফোর্ড, ২০০৪)।
২. The Record News (জানুয়ারি ১৯৯১) – মাইকেল এস. কিনিয়ার।
৩. গ্রামোফোন কোম্পানির ঐতিহাসিক আর্কাইভ ও ভারতীয় রেকর্ড শিল্পের বিবর্তন সংক্রান্ত নথি।
মন্তব্য