তালেবানের বিরুদ্ধে আরিয়ানা সাঈদের ‘লেডিস অনলি’ সফর

আফগানিস্তানের জনপ্রিয় পপ তারকা ও নারী অধিকারকর্মী আরিয়ানা সাঈদ সংগীতের মঞ্চকে এবার আরও স্পষ্টভাবে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করছেন। শুধু নারীদের জন্য ‘লেডিস অনলি’ নামে ইউরোপজুড়ে কনসার্ট সফর শুরু করেছেন তিনি। এই আয়োজনের মাধ্যমে ইউরোপে বসবাসরত আফগান নারীদের একত্রিত করার পাশাপাশি তালেবান শাসনে নারী ও মেয়েদের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে চাইছেন এই শিল্পী।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ইউরোনিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘লেডিস অনলি’ সফরের পরিকল্পনা, এর পেছনের প্রেরণা এবং আফগান নারীদের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন আরিয়ানা। তিনি জানান, এই কনসার্টের ধারণা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। গত তিন থেকে চার বছর ধরে তিনি এ নিয়ে ভাবছিলেন। ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর নারী ও মেয়েদের জীবনে যে কঠোর বিধিনিষেধ নেমে আসে, সেটিই শেষ পর্যন্ত তাকে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নে আরও উৎসাহিত করে।

তালেবান ক্ষমতা দখলের পর আফগান নারীদের শিক্ষা, চাকরি এবং জনজীবনে অংশগ্রহণের সুযোগ দ্রুত সংকুচিত হয়েছে। মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের কর্মক্ষেত্র থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। জনপরিসরেও তাদের চলাফেরা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের ওপর আরোপ করা হয় নানা বিধিনিষেধ। পার্ক ও বিনোদনকেন্দ্রের মতো স্থানেও নারীদের প্রবেশ সীমিত বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

আরিয়ানা সাঈদের কাছে এসব নিষেধাজ্ঞা কেবল সরকারি নীতির বিষয় নয়। তার মতে, এর প্রভাব পড়ছে নারীদের দৈনন্দিন জীবন, স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যতের ওপর। তাই ‘লেডিস অনলি’ কনসার্ট তার কাছে নিছক বিনোদনের আয়োজন নয়। এর মাধ্যমে নারীদের একত্রিত করা, নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া এবং অধিকার নিয়ে কথা বলার একটি পরিসর তৈরি করাই তার অন্যতম লক্ষ্য।

আফগানিস্তানে সংগীতশিল্পী হিসেবে আরিয়ানা সাঈদের পরিচিতি বহুদিনের। নারী অধিকার নিয়ে প্রকাশ্য অবস্থানের কারণে তিনি দেশটির অন্যতম আলোচিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। জনপ্রিয় ট্যালেন্ট শো ‘দ্য ভয়েস আফগানিস্তান’-এর বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। সংগীতের পাশাপাশি টেলিভিশনে তার উপস্থিতি তাকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়।

তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর সেই জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আসে। নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতিতে তিনি আফগানিস্তান ছেড়ে বিদেশে চলে যান। দেশে ফিরে আগের মতো মঞ্চে গান করার সুযোগ না থাকলেও বিদেশ থেকেই নিজের সংগীত ও সক্রিয়তা চালিয়ে যাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আফগানিস্তানের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছেন তিনি।

নারীর সমতা, স্বাধীনতা ও অগ্রগতির পক্ষে কাজ করা তার সংগঠন ‘ডিফাও’-এর মাধ্যমেও আরিয়ানা নারী অধিকার নিয়ে সরব রয়েছেন। তালেবান শাসনে থাকা নারী ও মেয়েদের পরিস্থিতিকে তিনি কঠিন ও অন্ধকার সময় হিসেবে দেখছেন। সেই বাস্তবতার মধ্যেও তাদের মধ্যে আশার অনুভূতি তৈরি করা এবং নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন তিনি।

আরিয়ানার কাছে সংগীত শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়। এটি এমন একটি ভাষা, যার মাধ্যমে সরাসরি রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে গিয়েও মানুষের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার কথা বলা যায়। আফগানিস্তানে বহু নারী প্রকাশ্যে নিজেদের কথা বলতে পারছেন না। তাদের হতাশা, স্বপ্ন ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে নিজের গান ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সামনে আনতে চান তিনি।

এই ভাবনা থেকেই ‘লেডিস অনলি’ সফরের আয়োজন। কনসার্টগুলোর দর্শক শুধু নারী হওয়ায় এর একটি আলাদা তাৎপর্য তৈরি হয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা আফগান নারীরা এতে একত্রিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। একই সঙ্গে তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও উদ্বেগ নিয়ে কথা বলার একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশও পাচ্ছেন।

সফরটির প্রথম কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে ৪ সেপ্টেম্বর নেদারল্যান্ডসের রটারডামে। সেখানে লরেনস্কার্কে গান পরিবেশন করেন আরিয়ানা সাঈদ। এরপর ৫ সেপ্টেম্বর সুইডেনের স্টকহোমে তার পরিবেশনার সূচি ছিল। সফরের পরবর্তী কনসার্ট ২৬ সেপ্টেম্বর জার্মানির হামবুর্গে এবং ৩ অক্টোবর ফ্রাঙ্কফুর্টের কাছাকাছি ভিসবাডেনে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

এই শহরগুলোতে আয়োজনের মধ্য দিয়ে ইউরোপে বসবাসরত আফগান নারীদের সঙ্গে যোগাযোগ আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে আফগানিস্তানের ভেতরে থাকা নারীদের পরিস্থিতিও আন্তর্জাতিক দর্শকদের সামনে তুলে ধরতে পারছেন আরিয়ানা। তার বক্তব্যে বারবার উঠে আসছে শিক্ষা, কাজ, স্বাধীন চলাফেরা এবং সামাজিক জীবনে নারীদের অংশগ্রহণের অধিকার।

তালেবান শাসনের অধীনে নারীদের অধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগও অব্যাহত রয়েছে। নারী ও মেয়েদের শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের ওপর বিধিনিষেধ শুধু তাদের বর্তমান জীবনকেই প্রভাবিত করছে না, ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি করছে অনিশ্চয়তা। এমন পরিস্থিতিতে পরিচিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের মাধ্যমে বিষয়টি আন্তর্জাতিক আলোচনায় ধরে রাখার গুরুত্বও বেড়েছে।

আরিয়ানা সাঈদের ‘লেডিস অনলি’ সফর সেই প্রেক্ষাপটে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের রূপ নিয়েছে। মঞ্চে তিনি গান গাইছেন, কিন্তু সেই গানের সঙ্গে যুক্ত থাকছে তার দেশের নারীদের অধিকার ও স্বাধীনতার প্রশ্ন। আফগানিস্তানে সরাসরি মঞ্চে দাঁড়ানোর সুযোগ না থাকলেও ইউরোপের বিভিন্ন শহর থেকে তিনি নিজের বক্তব্য পৌঁছে দিচ্ছেন বৃহত্তর দর্শকের কাছে।

তার এই উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে একটি সহজ বার্তা—নারীদের কণ্ঠ থামিয়ে দেওয়া গেলেও তাদের অধিকার ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে মুছে ফেলা যায় না। ‘লেডিস অনলি’ সেই আকাঙ্ক্ষাকেই সংগীত, সংহতি ও প্রতিবাদের ভাষায় প্রকাশ করার একটি প্রচেষ্টা। নির্বাসনে থেকেও আরিয়ানা সাঈদ তাই তার পরিচিত মঞ্চকে ব্যবহার করছেন আফগান নারীদের কথা বলার জন্য।

Tags :

মুরসালিন মাহমুদ তাইসিন | সাব-এডিটর । সঙ্গীত গুরুকুল

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।