জগন্ময় মিত্র: প্রেম-বিরহের গানে অমলিন এক কিংবদন্তি

বাংলা গানের ইতিহাসে কিছু শিল্পীর কণ্ঠ সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয়ে যায় না। তাঁদের গান প্রজন্ম বদলের পরও শ্রোতার অনুভূতির সঙ্গে মিশে থাকে। প্রেম, বিরহ, অপেক্ষা কিংবা হারানো দিনের স্মৃতি—জীবনের এমন নানা অনুভূতিকে নিজের স্বতন্ত্র কণ্ঠে সুরের ভাষা দিয়েছিলেন জগন্ময় মিত্র। বিশেষ করে কাব্যগীতিতে তাঁর অসামান্য জনপ্রিয়তা তাঁকে বাংলা সংগীতের ইতিহাসে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে।

১৯১৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর কলকাতার এক সঙ্গীতপ্রেমী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জগন্ময় মিত্র। তাঁর জন্মের সময় পরিবারে ছিল শোকের আবহ। জন্মের মাত্র মাসাধিককাল আগে তাঁর বাবা যতীন্দ্রনাথ মিত্র মাত্র ২৫ বছর বয়সে মারা যান। বাবার একমাত্র সন্তান হিসেবে শৈশবেই পিতৃহারা হন জগন্ময়। ভাই-বোনও ছিল না তাঁর। সেই নিঃসঙ্গ শৈশবের মধ্যেই ধীরে ধীরে সংগীত হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান আশ্রয়।

পরিবারের পরিবেশও তাঁর সংগীতচর্চার জন্য অনুকূল ছিল। পিতামহ বিধুভূষণ মিত্র এবং কাকা পঞ্চানন মিত্র ছিলেন সঙ্গীতানুরাগী। কাকা হারমোনিয়াম বাজাতেন এবং ওস্তাদের কাছে রাগ-রাগিণীর তালিম নিতেন। ছোট্ট জগন্ময় নিয়মিত সেই সংগীতচর্চা শুনতেন। শৈশবেই তাঁর কানে পৌঁছে যাওয়া সেই রাগ-রাগিণীর সুর পরবর্তীকালে তাঁর শিল্পীজীবনের ভিত গড়ে দেয়।

প্রাথমিক শিক্ষা বাড়িতে শুরু করার পর ১৯৩৪ সালে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তবে পড়াশোনার পাশাপাশি চলতে থাকে নিয়মিত সংগীতসাধনা। মাত্র ১০-১১ বছর বয়সে কেশব মুখোপাধ্যায়ের কাছে ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুংরি ও টপ্পাসহ শাস্ত্রীয় সংগীতের বিভিন্ন ধারায় প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে এই বহুমাত্রিক তালিম তাঁর কণ্ঠের বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করে।

জগন্ময় মিত্রের প্রতিভার প্রথম বড় স্বীকৃতি আসে ১৯৩৮ সালে। বেঙ্গল মিউজিক অ্যাসোসিয়েশনের সংগীত প্রতিযোগিতায় তিনি ধ্রুপদ, টপ্পা, ঠুংরি, রাগপ্রধান বাউল ও কীর্তন—প্রতিটি বিভাগেই প্রথম স্থান অর্জন করেন। কাব্যসংগীত বিভাগে তিনি তৃতীয় হন। একই বছর তাঁর জন্য খুলে যায় সংগীতজগতের আরও বড় দরজা। এইচএমভিতে গান রেকর্ড করার সুযোগ পান তিনি।

প্রথম দিকের রেকর্ডগুলোর মধ্যে প্রণব রায়ের কথায় এবং কমল দাশগুপ্তের সুরে ‘প্রিয় হতে প্রিয়তর’ ও ‘তোমার মতন কত না নয়ন’ গান দুটি তাঁকে শ্রোতাদের কাছে পরিচিত করে তোলে। এরপর ধীরে ধীরে তাঁর কণ্ঠের নিজস্বতা বাংলা গানের ভুবনে প্রতিষ্ঠা পেতে থাকে।

জগন্ময় মিত্রের শিল্পীজীবনের সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের নামও বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে। এইচএমভিতে তাঁর কণ্ঠে ‘যদি বাসনা মনে দিবে দহন জ্বালা’ গানটি শুনে নজরুল তাঁর কণ্ঠের প্রশংসা করেছিলেন। সেই সূত্রে দুই শিল্পীর মধ্যে গড়ে ওঠে আন্তরিক সম্পর্ক। নজরুলগীতির পাশাপাশি ১৯৪১ সালে জগন্ময় মিত্র কয়েকটি রবীন্দ্রসঙ্গীতও রেকর্ড করেন।

১৯৪২ সালে তাঁর কণ্ঠে রেকর্ড হয় ‘সাতটি বছর আগে’ ও ‘সাতটি বছর পরে’। পরবর্তীকালে ১৯৪৮ সালে রেকর্ড করা ‘চিঠি—তুমি আজ কত দূরে’ গানটির সঙ্গে এই গানগুলো তাঁর কাব্যগীতির পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

‘চিঠি—তুমি আজ কত দূরে’ গানটি জগন্ময় মিত্রের শিল্পীজীবনে বিশেষ মাইলফলক তৈরি করে। গানটির কথায় দূরত্ব, অপেক্ষা ও না-পাওয়া ভালোবাসার যে আবহ তৈরি হয়েছিল, তা শ্রোতাদের সঙ্গে গভীরভাবে সংযোগ স্থাপন করে। বহু মানুষ গানটিকে নিজের জীবনের অনুভূতির সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছিলেন। গানটি বাংলা আধুনিক গানের অন্যতম জনপ্রিয় রেকর্ড হিসেবে দীর্ঘদিন শ্রোতাদের কাছে সমাদৃত হয়েছে। এইচএমভির হিসাব অনুযায়ী, ৭৮ আরপিএম রেকর্ড থেকে শুরু করে পরবর্তী ক্যাসেটের যুগ পর্যন্ত গানটির প্রায় ২৫ লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়।

জগন্ময় মিত্রের সাফল্য অবশ্য একটি গানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে তাঁর কণ্ঠে একের পর এক জনপ্রিয় কাব্যগীতি প্রকাশিত হয়। ‘ভালোবাসা মোরে ভিখারি করেছে’, ‘আমি দুরন্ত বৈশাখী ঝড়’, ‘যাদের জীবন ভরা শুধু আঁখিজল’, ‘তুমি কি এখন দেখিছ স্বপন’, ‘ভুলি নাই ভুলি নাই’, ‘মেনেছি গো হার’, ‘আমি স্বপন দেখেছি’, ‘স্বপন সুরভী মাখা’, ‘গভীর নিশীথে ঘুম’, ‘প্রেমের তাজমহল’, ‘হৃদয় যেন কাহারে চেয়েছিল’, ‘তোমারে তো আজও ভুলি নাই’ এবং ‘শাওনও রাতে যদি’—এর মতো বহু গান তাঁর কণ্ঠে জনপ্রিয়তা পায়।

তাঁর বিশেষত্ব ছিল কেবল কণ্ঠের মাধুর্যে নয়, গানের কথার আবেগকে শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতায়। প্রেমের গান গাইলে তাঁর কণ্ঠে থাকত কোমলতা, আর বিরহের গানে ফুটে উঠত অপেক্ষা ও বেদনার গভীর অনুভব। ফলে তাঁর গান কেবল সংগীত হিসেবে নয়, মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতি ও অনুভূতির সঙ্গী হিসেবেও জায়গা করে নেয়।

জগন্ময় মিত্র আধুনিক গান ও নজরুলগীতির পাশাপাশি ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুংরি, টপ্পাসহ শাস্ত্রীয় সংগীতের বিভিন্ন ধারায় দক্ষতা দেখিয়েছিলেন। এই বহুমুখী সংগীতজ্ঞান তাঁর পরিবেশনায় আলাদা মাত্রা যোগ করে। তবে কাব্যগীতির শিল্পী হিসেবেই তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচিতি গড়ে ওঠে।

দীর্ঘ সংগীতজীবনের পর ২০০৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি জগন্ময় মিত্রের জীবনাবসান ঘটে। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে একটি স্বতন্ত্র কণ্ঠের জীবন্ত উপস্থিতির অবসান হলেও তাঁর গান থেকে যায় শ্রোতাদের কাছে।

বাংলা সংগীতের ইতিহাসে তাঁর গুরুত্ব মূলত এখানেই—তিনি প্রেম ও বিরহের অনুভূতিকে এমন এক সংগীতভাষা দিয়েছিলেন, যা সময়ের পরিবর্তনেও আবেদন হারায়নি। তাঁর গাওয়া গান আজও পুরোনো দিনের বাংলা সংগীতের অনুরাগীদের কাছে স্মৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে ‘চিঠি—তুমি আজ কত দূরে’ গানটি তাঁর নামের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে বাংলা কাব্যগীতির আলোচনা এলে তাঁর অবদান অনিবার্যভাবেই সামনে আসে।

শিল্পীর জীবন থেমে গেছে বহু বছর আগে। কিন্তু তাঁর কণ্ঠের গান থেমে যায়নি। পুরোনো রেকর্ড, পরবর্তী সময়ের ধারণ করা সংগীত কিংবা স্মৃতিতে ফিরে আসা কোনো সুর—বিভিন্নভাবে তাঁর গান আজও শ্রোতার কাছে পৌঁছে যায়।

জগন্ময় মিত্র তাই শুধু একটি সময়ের জনপ্রিয় শিল্পী নন; বাংলা কাব্যগীতির ইতিহাসে তিনি এমন এক নাম, যার কণ্ঠে প্রেম, অপেক্ষা ও বিচ্ছেদের অনুভূতি পেয়েছিল দীর্ঘস্থায়ী শিল্পরূপ। তাঁর গান যতদিন নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছাবে, ততদিন বাংলা সংগীতের স্মৃতিতে তাঁর নামও বেঁচে থাকবে।

Tags :

সামিউর রহমান রাতুল | উপ-সম্পাদক | সঙ্গীত গুরুকুল

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।