পণ্ডিত পান্নালাল ঘোষ

পণ্ডিত পান্নালাল ঘোষ ( অন্য নাম : অমলজ্যোতি ঘোষ), একজন ভারতীয় বাঙালী বাঁশী বাদক ও সুরকার। তিনি ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর শিষ্য ছিলেন এবং ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে বাঁশিকে একটি অংশ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তাকে কৃতিত্ব দেওয়া হয়। ভারতীয় ফিল্মের খ্যাতনামা নেপথ্যগায়িকা সুপ্রভা ঘোষ তাঁর স্ত্রী। তাঁর ২৪ জুলাই ১৯১১ এবং মৃত্যু ২০ এপ্রিল ১৯৬০।

পান্নালাল ঘোষের শৈশবজীবন:

পান্নালাল ঘোষ বাংলাদেশের বরিশালে ২৪ জুলাই ১৯১১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার ডাকনাম অমলজ্যোতি ঘোষ তার পিতা, অক্ষয় কুমার ঘোষ ছিলেন একজন সেতার বাদক তিনি পারিবারিকভাবে সেতার বাজানো শেখা শুরু করেন। কিন্তু শৈশবে দুইটি কারণে তিনি বাঁশির প্রতি আকৃষ্ট হন। তাদের পৈতৃক বাসা ছিল কীর্তনখোলা নদীর পাড়ে।

তার অক্ষয়কুমার ভালো সেতার বাজাতেন। পিতামহ হরকুমার ঘোষ প্রখ্যাত ধ্রুপদীশিল্পী ছিলেন। মা সুকুমারী ছিলেন একজন সুগায়িকা।পান্নালালের ছোট ভাই নিখিল ঘোষ ছিলেন প্রখ্যাত তবলাবাদক।

বংশীবাদন ছাড়া শরীরচর্চাতেও পান্নালাল ঘোষের খ্যাতি ছিল। চৌদ্দ বছর বয়সে পান্নালাল বাঁশি শিখতে শুরু করেন। পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে ১৯২৬ সালে বরিশাল থেকে কলকাতায় চলে যান। ১৯৩৬খ্রি. ব্যান্টম ভারোত্তলন প্রতিয়োগিতায় চ্যাম্পিয়ন হন। ১৯৩৫খ্রি. অল বেঙ্গল মিউজিক কনফারেন্সে প্রথম পুরস্কার পান। এ সময় ফিল্ম কোম্পানি নিউ থিয়েটার্সে চাকরি নেন। এখানে অমৃতসরের ওস্তাদ খুশি মহম্মদ হারমোনিয়াম বাজাতেন। তাঁর কাছে মার্গসংগীত শিখতে থাকেন। পরে শিখেন গিরিজাশঙ্কর এর কাছে। তবে বাঁশরিয়া হিসাবেই তাঁর খ্যাতি। ১৯৩৮ সালে সেরাইকেল্লার যুবরাজের নাচের দলের সঙ্গে তিনি ইউরোপ ভ্রমণে যান। এরপর দেশ-বিদেশের বহু কনফারেন্সে আমন্ত্রণ পেয়ে বাঁশি বাজিয়েছেন। অল ইন্ডিয়া রেডিওতে বেশ কয়েকটি ঐক্যতানবাদন পরিচালনা করেছেন।

 

পেশাজীবন:

কলকাতা নিউ থিয়েটার্সে কাজ করার সময় তিনি সঙ্গীতে সহায়তা করতেন। ১৯৪০ সালে তিনি বোম্বে চলে আসেন সঙ্গীতজীবনের উন্নতির জন্য। ১৯৪০ সালে “স্নেহ বন্ধন” ছবির মাধ্যমে তার স্বতন্ত্র সঙ্গীত পরিচালক হিসাবে অভিষেক ঘটে। এই ছবির দুই জনপ্রিয় গানে “Aabroo Ke Kamaanon Mein” এবং “Sneh Bandhan Mein Bandhe Hue” কণ্ঠ দেন কাহ্ন মাস্তান এবং বিব্বু পান্নালাল ঘোষ যৌথভাবে ওস্তাদ আলী আকবর খান ও পণ্ডিত রবিশঙ্কর -এর সাথে “Aandhiyan” (১৯৫২) সিনেমার নেপথ্যে কাজ করেন। তিনিই প্রথম সাত গর্তের বাঁশির প্রচলন শুরু করেন।  আনজান (১৯৪১), বসন্ত্ (১৯৪২), দুহাই (১৯৪৩), নন্দকিশোর (১৯৫১), বসন্ত বাহার (১৯৫৬), মুঘল-এ-আজম (১৯৬০) প্রভৃতি বিখ্যাত ছবির গান ও আবহসংগীতে মিশে আছে তাঁর বাঁশির কারুকাজ।

 

আঁধিয়া (১৯৫২) ছবির আবহসংগীতে তিনি কাজ করেন ওস্তাদ আলী আকবর খান ও পন্ডিত রবিশঙ্কর-এর সঙ্গে যৌথভাবে। ১৯৪৭খ্রি. আলাউদ্দীন খাঁর কাছে কিছুদিন শিক্ষাগ্রহণ করেন। তাঁরই উৎসাহে সৃষ্টি করেন নানা রাগ: নূপুরধ্বনি, চন্দ্রমৌলি, দীপাবলি, কুমারী। ফৈয়াজ খান ও ওঙ্কারনাথ ঠাকুরের মতো কণ্ঠশিল্পীদের অনুরোধে পান্নালাল তাঁদের খেয়ালের সঙ্গে বাঁশিতে সঙ্গত করেছেন। ১৯৪২ খ্রি. ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে বন্দি অবস্থায় অসুস্থ গান্ধীজিকে তিনি বাঁশি শুনিয়ে তাঁর আর্শীবাদ লাভ করেছিলেন। ১৯৫৬ সালে আকাশবাণী দিল্পী কেন্দ্রে সংগীত নির্দেশক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন।

বাঁশির যে আধুনিক রূপটি আমরা দেখি, সেটি পান্নালাল ঘোষের উদ্ভাবন। ৩২ ইঞ্চি আকৃতির সাত ছিদ্রবিশিষ্ট বাঁশির প্রথম প্রচলন তিনিই করেছিলেন। আগেকার বাঁশিতে দু’একটি স্বর বাজানো বেশ অসুবিধাজনক ছিল। সপ্তম ছিদ্রটি উদ্ভাবন করে পান্নালাল সেই সমস্যার সমাধান করেন। তিনিই বাঁশিকে উন্নীত করেছিলেন সেতার, সরোদ, সানাই, সারেঙ্গীর পর্যায়ে যা এককভাবে ধ্রুপদী সংগীতের গৌরবে বাজতে পারে মূল যন্ত্র হিসেবে।

ভারতীয় ফিল্মের খ্যাতনামা নেপথ্যগায়িকা সুপ্রভা ঘোষ তাঁর স্ত্রী।

পৃথিবীর প্রথম ৭ ছিদ্রযুক্ত বাঁশের বাঁশিটি বাজিয়েছিলেন ‘ফ্লুট-গড’ পান্নালাল ঘোষ। দীর্ঘকাল বাঁশি আকারে ছিল ছোটো। স্থান ছিল প্রধানত পল্লিসংগীতে। এক বঙ্গ-সন্তান সেটিকে দিলেন নতুন রূপ, নিয়ে গেলেন আবিশ্ব ধ্রুপদী সংগীতের আসরে—পৃথিবীর প্রথম ৩২ ইঞ্চি লম্বা, সাতটি ছিদ্রযুক্ত বাঁশের বাঁশি। কিশোর বয়সেই ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে ব্রিটিশ পুলিশের হাত থেকে বাঁচার জন্য, জন্মস্থান বরিশাল থেকে ১৯২৬ সালে কলকাতায় পালিয়ে আসা পান্নালাল ঘোষ বাঁশিকে করে তুলতে পেরেছিলেন ‘কনসার্ট’ যন্ত্র—সেতার, সরোদ সানাই, সারেঙ্গীর সমান, অর্থাৎ ধ্রুপদী সংগীতের আসরে যা একক গরিমায় বাজতে পারে মূল যন্ত্র হিসেবে।

 

YaifwwriN4BzRFCyqbslL4 পণ্ডিত পান্নালাল ঘোষ
আমাদেরকে গুগল নিউজে ফলো করুন

 

পৃথিবীর প্রথম ৭ ছিদ্রযুক্ত বাঁশেব বাঁশি বাজিয়েছিলেন ‘ফ্লু ট-গড’ পান্নালাল ঘোষ পান্নালাল ঘোষ সম্বন্ধে কবীর সুমন তার ‘সুমনামি’-তে লিখেছেন সারা দুনিয়ায় যাঁর স্থান একেবারে ওপরের সারিতে সেই মহাশিল্পী ছিলেন আশ্চর্য সরল প্রকৃতির। তাঁর বাবা সুধীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে তিনি শুনেছিলেন:

কলকাতার অক্রূর দত্ত লেনে হিন্দুস্তান রেকর্ডসের স্টুডিয়োয় তরুণ সুধীন্দ্রনাথ গ্রামোফোন রেকর্ড করছেন। শৈলেশ দত্তগুপ্তর সুরে বাংলা গান ও রবীন্দ্রনাথের একটি গান। রিহার্সাল চলছে। এমন সময়ে রেকর্ডিং ইঞ্জিনিয়ার এসে জানা লেন, নিজের কাজে স্টুডিয়োয় এসে পান্নালাল ঘোষ মনিটরে সুধীন্দ্রনাথের গলা ও গান শুনে বায়না ধরেছেন এই তরুণ শিল্পীর সঙ্গে তিনি বাঁশি বাজাবেন। তখন ব্রিটিশ আমল। স্বয়ং বড়লাট হঠাৎ এসে হাজির হলেও শিল্পীরা অত অবাক হতেন না।

পান্নালালের তর সইছিল না; তিনি ঢুকে পড়লেন স্টুডিয়ো ফ্লোরে। হাত জোড় করে বললেন, “আমায় একটু বাজাতে দিন”। সেশন-বাঁশিশিল্পীর কাছে করজোড়ে ক্ষমা চাইলেন, তাঁর অনুমতি প্রার্থনা করলেন বাঁশির দেবতা। সুধীন্দ্রনাথের প্রায় হার্টএটাকের উপক্রম। সেশন-বাঁশি শিল্পী পান্নালালের পা ছুঁয়ে বললেন – “আমরা ধন্য”। পান্নালাল সুধীন্দ্রনাথের কাছেও অনুমতি চেয়ে নেন। বয়সে এমন কিছুবড় ছিলেন না তিনি সুধীন্দ্রনাথের থেকে, তাও সুধীন্দ্রনাথ তাঁকে প্রণাম করলেন।

পান্নালাল তো আর সঙ্গে বাঁশি আনেননি, এসে ছিলেন অন্য কাজে। সেশন-শিল্পীর কাছ থে কে তাঁর বাঁশিটি চেয়ে নিলেন পান্নালাল। সে-যুগের রেওয়াজ ছিল রে কর্ডিং-এ বাঁশি গোটা গানটাই বাজাতো কণ্ঠশিল্পীর সঙ্গে। পান্নালাল কিন্তু তা করেননি। কেবল প্রিলিউড ও ইন্টারলিউডে বাজালেন তিনি।

সুধীন্দ্রনাথ বলতেন, “গাইব কী। লোকটা যেভাবে গুনগুন করে, প্রায় ফিসফিস করে বাজাচ্ছে বাঁশিটা, আমার গলা দিয়ে তারপর গান আর বেরোচ্ছে না”। গ্রামোফোন রেকর্ডেঅন্য কোনও যন্ত্রীর নাম ছাপা হয়নি। রেকর্ডের লেব্‌ল্‌-এ শুধু উল্লেখ করা হয়েছিল: বাঁশিতে পান্নালাল ঘোষ।

সারাজীবন ধরে সুধীন্দ্রনাথ বারবার বলে উঠেছেন, “ভেবে দ্যাখ্‌, খোদ পান্না ঘোষ যেচে বাঁশি বাজিয়ে দিলে রে! ও তো মানুষ না রে, দেবতা। যেচে, গায়ে পড়ে বাজিয়ে দিলে! জীবনে এটাও ঘটে গেল।” এইরকমই কত মনিমুক্ত কথা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পান্নালাল আর তাঁর বাঁশির মহানুভবে, রাগসংগীতের গভীর আবেগে।

Leave a Comment