প্রত্যাখ্যান পেরিয়ে সাফল্য, শিল্পা রাওয়ের অন্যরকম পথচলা

বলিউডের জনপ্রিয় প্লেব্যাক গায়িকা শিল্পা রাওয়ের কণ্ঠে মুগ্ধ হয়েছেন অসংখ্য শ্রোতা। ‘চালেয়া’, ‘ঘুঙরু’, ‘বেশরম রঙ’ ও ‘ছুট্টামালে’র মতো গানের মাধ্যমে তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রসংগীতে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন। পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিতি মিলেছে তাঁর কণ্ঠের। তবে আজকের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রস্তুতি, প্রত্যাখ্যানের অভিজ্ঞতা এবং নিজের গায়কির ওপর আস্থা রাখার গল্প।

সম্প্রতি মুম্বাইয়ে একটি সংগীতানুষ্ঠানে তাঁর পারফরম্যান্স বন্ধ হয়ে যাওয়ার অভিযোগ ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন শিল্পা রাও। ‘বলিউড মিউজিক প্রজেক্ট’-এর দশম বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার সময় মাইক্রোফোন ও মঞ্চের আলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিল্পী। তাঁর স্বামীও ঘটনাটিকে দুঃখজনক ও লজ্জাজনক বলে মন্তব্য করেছেন।

তবে সাম্প্রতিক এই বিতর্কের বাইরেও শিল্পা রাওয়ের জীবন ও সংগীতজীবনের রয়েছে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল দিয়ে শুরু করে বলিউডের অন্যতম পরিচিত কণ্ঠ হয়ে ওঠার যাত্রাটি মোটেও সহজ ছিল না।

‘চালেয়া’ থেকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার

শাহরুখ খান অভিনীত ‘জওয়ান’ সিনেমার রোমান্টিক গান ‘চালেয়া’ শিল্পা রাওয়ের ক্যারিয়ারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাজ। গানটিতে তাঁর কণ্ঠের আবেগ ও সাবলীলতা শ্রোতাদের প্রশংসা কুড়ায়। এই গানের জন্য ২০২৫ সালে তিনি শ্রেষ্ঠ নারী প্লেব্যাক গায়িকা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

এর আগে ও পরেও একাধিক জনপ্রিয় গানে নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন শিল্পা। ‘ঘুঙরু’, ‘বেশরম রঙ’ এবং ‘অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল’ সিনেমার গান তাঁর পরিচিতি বাড়িয়েছে। ‘ছুট্টামালে’র মতো গানও তাঁকে নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছে আরও জনপ্রিয় করেছে।

শিল্পার গায়কির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো গানের ধরন অনুযায়ী কণ্ঠের প্রকাশভঙ্গি বদলে নেওয়ার ক্ষমতা। রোমান্টিক গান থেকে শুরু করে আধুনিক ছন্দনির্ভর সংগীত—বিভিন্ন ধারায় তিনি নিজেকে মানিয়ে নিতে পেরেছেন। তাঁর কণ্ঠের স্বাতন্ত্র্য তাঁকে বলিউডের অন্য অনেক গায়িকার থেকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।

গ্র্যামি মনোনীত অ্যালবামে কণ্ঠ

শিল্পা রাওয়ের সংগীতচর্চা শুধু হিন্দি চলচ্চিত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রখ্যাত সেতারশিল্পী আনুশকা শঙ্করের ‘লাভ লেটার্স’ অ্যালবামেও কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি। অ্যালবামটি ২০২১ সালে গ্র্যামি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছিল।

এই অভিজ্ঞতা শিল্পার সংগীতজীবনে আন্তর্জাতিক পরিচিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। চলচ্চিত্রের গানের বাইরে ভিন্ন সংগীতধারার শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ তাঁর কণ্ঠের বৈচিত্র্য তুলে ধরেছে।

তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি—গ্র্যামি মনোনয়নটি ছিল অ্যালবামের জন্য, শিল্পার ব্যক্তিগত গ্র্যামি পুরস্কারের জন্য নয়। তবু আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি সংগীত প্রকল্পে তাঁর অংশগ্রহণ তাঁর কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলোর একটি।

মঞ্চে পারফরম্যান্স বন্ধ, তৈরি হয়েছে বিতর্ক

সম্প্রতি মুম্বাইয়ে ‘বলিউড মিউজিক প্রজেক্ট’-এর দশম বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার সময় অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে পড়েন শিল্পা রাও বলে জানা গেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, গান চলাকালে তাঁর মাইক্রোফোন বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই সময়ে মঞ্চের আলোও নিভিয়ে দেওয়া হলে তাঁর পরিবেশনা আকস্মিকভাবে থেমে যায়। এ ঘটনায় উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে হট্টগোল শুরু হয়। পরে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনার জন্ম দেয়।

ঘটনা নিয়ে শিল্পা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুঃখ প্রকাশ করে একটি পোস্ট দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর স্বামীও প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, শিল্পার সঙ্গে যা ঘটেছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও লজ্জাজনক।

তবে ঠিক কী কারণে তাঁর পরিবেশনা বন্ধ করা হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। কার নির্দেশে মাইক্রোফোন ও মঞ্চের আলো বন্ধ করা হয়েছিল, সেটিও স্পষ্ট নয়। ফলে ঘটনার পেছনের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

এই ঘটনা সরাসরি পরিবেশনার ক্ষেত্রে শিল্পী ও আয়োজকদের মধ্যে সমন্বয়ের গুরুত্বও সামনে এনেছে। একটি সফল সংগীতানুষ্ঠানের জন্য শিল্পীর প্রস্তুতির পাশাপাশি শব্দব্যবস্থা, মঞ্চের আলো এবং অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সমন্বিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল দিয়ে শুরু

আজকের পরিচিতি অর্জনের আগে শিল্পা রাওকে দীর্ঘ সময় ধরে নিজের দক্ষতা তৈরি করতে হয়েছে। চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে তিনি প্রায় তিন বছর বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল রেকর্ড করেছিলেন।

ক্যাডবেরি মাঞ্চ, সানসিল্ক ও অ্যাঙ্কর জেলের মতো ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনে তাঁর কণ্ঠ ব্যবহৃত হয়েছিল। এসব বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাঁর কণ্ঠ বহু মানুষের কাছে পৌঁছালেও তখনও অধিকাংশ শ্রোতার কাছে তিনি পরিচিত নাম হয়ে ওঠেননি।

তবে এই সময়টিকে কেবল অপেক্ষার অধ্যায় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিজ্ঞাপনের জন্য নিয়মিত রেকর্ডিং করতে গিয়ে স্টুডিওতে কাজ করার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন শিল্পা। অল্প সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট সুর ও ছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কণ্ঠ দেওয়া, রেকর্ডিংয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করা এবং গানের আবেগ যথাযথভাবে প্রকাশ করার মতো দক্ষতা তাঁর মধ্যে তৈরি হয়।

সংগীতজীবনের শুরুর দিকে শঙ্কর মহাদেবনের নির্দেশনায় কাজ করার অভিজ্ঞতাও তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ছোট পরিসরে কাজ শুরু করতে তিনি পিছপা হননি। বরং নিয়মিত রেকর্ডিংয়ের মধ্য দিয়ে নিজের গায়কিকে আরও পরিণত করেছেন।

শিল্পা নিজেও তাঁর ক্যারিয়ারের শুরুর সময়টিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বর্ণনা করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্রের গানে কাজ করার জন্য তাঁকে প্রস্তুত হতে সাহায্য করে।

কণ্ঠের স্বাতন্ত্র্যই হয়ে ওঠে শক্তি

শিল্পা রাওয়ের সাফল্যের গল্পে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর কণ্ঠের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। বলিউডের প্রচলিত গায়কির ধরন থেকে তাঁর কণ্ঠের কিছু বৈশিষ্ট্য আলাদা হওয়ায় ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে তাঁকে প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি হতে হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

সংগীতজগতে নতুন শিল্পীদের জন্য নিজস্ব পরিচিতি তৈরি করা সহজ নয়। বিশেষ করে চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক গানের ক্ষেত্রে কণ্ঠের ধরন, সুরের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এবং সংগীতপরিচালকের চাহিদা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিল্পার ক্ষেত্রেও এই চ্যালেঞ্জগুলো ছিল।

তবে তিনি হাল ছাড়েননি। নিজের কণ্ঠের স্বাতন্ত্র্যকে দুর্বলতা হিসেবে না দেখে সেটিকেই শক্তিতে পরিণত করেছেন। সময়ের সঙ্গে তাঁর গায়কির নিজস্ব ধরন শ্রোতাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের গান থেকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সংগীত প্রকল্প—বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করেছেন।

অপেক্ষা থেকে শিল্পা হওয়ার গল্প

শিল্পা রাওয়ের জন্ম ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের জামশেদপুরে। তাঁর জন্মনাম অপেক্ষা রাও। বলিউডে প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার আগে তিনি নিজের নাম পরিবর্তন করে শিল্পা রাও রাখেন।

নাম পরিবর্তনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘শিল্পা’ নামটি তাঁর কাছে শিল্পকর্ম ও সৃজনশীলতার ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। ‘শিল্প’ শব্দের অর্থ ও তাৎপর্য তাঁকে নিজের কাজের আরও কাছাকাছি অনুভব করাত। সংগীতের প্রতি তাঁর নিবেদন এবং শিল্পী হিসেবে নিজস্ব পরিচয় গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে নামটি মানানসই বলেই তিনি মনে করেছিলেন।

তবে তাঁর সাফল্যকে শুধু নাম পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করা ঠিক হবে না। দীর্ঘদিনের অনুশীলন, স্টুডিওতে কাজের অভিজ্ঞতা, প্রত্যাখ্যানের পরও চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এবং নিজের কণ্ঠের ওপর আস্থা—এসবই তাঁর ক্যারিয়ার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

আজ শিল্পা রাও বলিউডের পরিচিত ও চাহিদাসম্পন্ন প্লেব্যাক গায়িকাদের একজন। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং গ্র্যামি মনোনীত অ্যালবামে অংশগ্রহণ তাঁর সংগীতযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। সাম্প্রতিক মঞ্চের ঘটনা তাঁকে নতুন করে আলোচনায় আনলেও তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের মূল পরিচয় রয়ে গেছে অধ্যবসায়, সংগীতের প্রতি নিবেদন এবং নিজস্ব কণ্ঠস্বরের ওপর আস্থায়।

Tags :

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

সম্পাদক ও প্রকাশক : সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর।

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।