ভারতের অস্কারজয়ী সংগীত পরিচালক ও গায়ক এ আর রহমান মনে করেন, সংগীতের আবেদন কোনো নির্দিষ্ট ভাষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গানের কথা বুঝতে না পারলেও সুর, ছন্দ, সংগীতায়োজন এবং শিল্পীর পরিবেশনা শ্রোতাদের আবেগাপ্লুত করতে পারে। তাই কনসার্টে কোন ভাষার গান কতটা পরিবেশন করা হচ্ছে, তার চেয়ে সংগীতের সামগ্রিক আবেদনকেই বেশি গুরুত্ব দেন তিনি। বিভিন্ন ভাষার গান পরিবেশন নিয়ে শ্রোতাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও বিষয়টি নিয়ে খুব একটা বিচলিত নন এই খ্যাতিমান সুরকার।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে কনসার্টের গানের তালিকা তৈরি, বিভিন্ন ভাষার গানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা এবং শ্রোতাদের পছন্দ নিয়ে নিজের ভাবনা তুলে ধরেছেন রহমান। তাঁর ‘দ্য ওয়ান্ডারমেন্ট ট্যুর’-এর ভারতীয় পর্বকে সামনে রেখে এই আলোচনা সামনে এসেছে। সফরের অংশ হিসেবে মুম্বাই ও দিল্লি-এনসিআরে তাঁর সংগীত পরিবেশনার সূচি রয়েছে।
Table of Contents
বিভিন্ন ভাষার গান বাছাই করাই বড় চ্যালেঞ্জ
কনসার্টের জন্য গানের তালিকা তৈরি করা রহমানের কাছে সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। ভারতের উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের শ্রোতাদের সামনে একই মঞ্চে সংগীত পরিবেশনের সুযোগকে তিনি বিশেষ প্রাপ্তি হিসেবে দেখেন। তবে দেশটির ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি পরিবেশনা সাজানো সহজ নয়।
রহমানের মতে, কোন গানগুলো কনসার্টে রাখা হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তিনি নিজের সংগীতবোধের ওপর নির্ভর করেন। একজন সাধারণ শ্রোতা হিসেবে তিনি নিজে কী শুনতে চাইতেন, তা বিবেচনা করেই গানের তালিকা সাজানোর চেষ্টা করেন। তাঁর কাছে সংগীতের মান, পরিবেশনার ধরন এবং গানের আবেগ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
একটি কনসার্টে বিভিন্ন বয়স, অঞ্চল ও ভাষার মানুষের সমাগম ঘটে। তাঁদের প্রত্যেকের পছন্দ আলাদা হতে পারে। কেউ পরিচিত হিন্দি গান শুনতে চান, আবার কেউ তামিল কিংবা অন্য ভাষার জনপ্রিয় সুরের অপেক্ষায় থাকেন। ফলে একটি নির্দিষ্ট গানের তালিকার মাধ্যমে সবাইকে সমানভাবে সন্তুষ্ট করা কঠিন। রহমানের দৃষ্টিতে, এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই একজন সংগীতশিল্পীকে নিজের সৃজনশীল সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
তামিল গান নিয়ে সমালোচনা, তবু নিজের অবস্থানে অনড়
এর আগে রহমানের একটি কনসার্টে তামিল গানের সংখ্যা বেশি থাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা করেছিলেন কয়েকজন শ্রোতা। তাঁদের আপত্তির বিপরীতে অনেক ভক্ত যুক্তি দিয়েছিলেন, তামিল ভাষায় রহমানের অসংখ্য জনপ্রিয় গান রয়েছে। তাঁর দীর্ঘ সংগীতজীবন এবং বিভিন্ন ভাষার চলচ্চিত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই বৈচিত্র্য স্বাভাবিকভাবেই জড়িয়ে আছে।
এ প্রসঙ্গে রহমান বলেন, কোনো অনুষ্ঠানে হিন্দি গান পরিবেশন করলেও তামিলনাড়ুর কিছু শ্রোতা প্রশ্ন তুলতে পারেন। আবার অন্য কোনো অঞ্চলে তামিল গান বেশি গাওয়া হলে সেখানকার দর্শকদের একাংশের মধ্যেও আপত্তি দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ, কোন ভাষার গান পরিবেশন করা হচ্ছে, তার ওপর শ্রোতাদের প্রত্যাশা ও প্রতিক্রিয়া অনেকটাই নির্ভর করে।
‘রোজা’ ও ‘বম্বে’র মতো চলচ্চিত্রের গানও এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। এসব চলচ্চিত্রের তামিল ও হিন্দি সংস্করণের গান বিভিন্ন শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে আলাদা আবেদন তৈরি করেছে। একই সুরের ভিন্ন ভাষার সংস্করণও শ্রোতাদের কাছে ভিন্নভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
রহমানের বক্তব্য, কয়েক হাজার মানুষের সামনে সংগীত পরিবেশনের সময় প্রত্যেকের ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী গানের তালিকা তৈরি করা সম্ভব নয়। শুরুতে তাঁর কনসার্টে গানের ভাষা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলেও সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন ভাষার গান পরিবেশন তাঁর আয়োজনের অন্যতম বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।
ভাষা না বুঝলেও সংগীতের আবেগ ছুঁয়ে যায় শ্রোতাদের
রহমানের সংগীতভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে সুরের সর্বজনীন আবেদন। তাঁর মতে, একটি গানের ভাষা শ্রোতার অজানা হলেও এর সুর, ছন্দ ও সংগীতায়োজন তাঁকে আকৃষ্ট করতে পারে। গানের কথা বোঝা সংগীত উপভোগের একমাত্র শর্ত নয়। অনেক সময় শিল্পীর কণ্ঠ, বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার কিংবা মঞ্চে পরিবেশনার ধরন শ্রোতার মনে গভীর ছাপ ফেলে।
এ বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেছেন রহমান। দুবাইয়ে তাঁর দ্বিতীয় কনসার্টে ‘মুস্তাফা মুস্তাফা’ গানটি প্রত্যাশার চেয়েও বেশি উচ্ছ্বাস তৈরি করেছিল। ওই পরিবেশনায় শ্রোতারা মোবাইল ফোনের আলো জ্বালানোর পরিবর্তে লাইটার জ্বালিয়ে অংশ নিয়েছিলেন। জ্বর নিয়েও সেদিন মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন রহমান। শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও দর্শকদের এমন স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া তাঁর কাছে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে।
এই অভিজ্ঞতা তাঁর সংগীতের প্রতি শ্রোতাদের আবেগ ও সংযোগের বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে। কোনো গান দীর্ঘদিন ধরে মানুষের স্মৃতিতে জায়গা করে নিলে তার আবেদন কেবল ভাষার মধ্যে আটকে থাকে না। পরিচিত সুর বাজতে শুরু করলে শ্রোতারা নিজেরাই গানের সঙ্গে গলা মেলান, তৈরি হয় শিল্পী ও দর্শকের মধ্যে এক ধরনের সম্মিলিত অভিজ্ঞতা।
পুরোনো গানের সঙ্গে নতুন পরিবেশনাতেও উচ্ছ্বাস
রহমান জানিয়েছেন, তাঁর কনসার্টে শ্রোতাদের একটি প্রজন্ম এখন গানগুলোর কথা মুখস্থ গাইছে। শুধু জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের গান নয়, পিয়ানো ও কণ্ঠনির্ভর সিম্ফনির মতো পরিবেশনাতেও দর্শকদের উচ্ছ্বাস তাঁকে মুগ্ধ করে। এতে বোঝা যায়, শ্রোতাদের সঙ্গে তাঁর সংগীতের সম্পর্ক কেবল পরিচিত হিট গানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; পরিবেশনার ধরন বদলালেও সেই সংযোগ বজায় থাকতে পারে।
নব্বইয়ের দশকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের সংগীতে নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন রহমান। তাঁর সুরে তৈরি অনেক গান এখনো বিভিন্ন প্রজন্মের শ্রোতার কাছে জনপ্রিয়। পাশাপাশি নতুন কাজ ও ভিন্নধর্মী সংগীতায়োজনের মাধ্যমে তিনি নিজের সংগীতভাষাকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। কনসার্টে পুরোনো জনপ্রিয় সুরের সঙ্গে সাম্প্রতিক কাজ রাখার পরিকল্পনাও সেই ধারাবাহিকতার অংশ।
মুম্বাই ও দিল্লিতে ‘দ্য ওয়ান্ডারমেন্ট ট্যুর’
রহমানের ‘দ্য ওয়ান্ডারমেন্ট ট্যুর’-এর সূচি অনুযায়ী, আগামী ১ নভেম্বর মুম্বাইয়ের জিও ওয়ার্ল্ড গার্ডেন এবং ২১ নভেম্বর দিল্লির ব্যাকইয়ার্ড স্পোর্টস ক্লাবে তাঁর সংগীতানুষ্ঠান আয়োজনের কথা রয়েছে। প্রায় তিন ঘণ্টার এই পরিবেশনায় নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় সুরের পাশাপাশি সাম্প্রতিক কাজও স্থান পাবে।
এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন সময়ের সংগীতকে একই মঞ্চে তুলে ধরার সুযোগ পাবেন শ্রোতারা। পুরোনো গানের স্মৃতি আর নতুন পরিবেশনার অভিজ্ঞতা মিলিয়ে কনসার্টগুলো সাজানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, চলচ্চিত্রের সংগীতেও নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে যুক্ত হয়েছেন রহমান। ‘রামায়ণ’ চলচ্চিত্রের সংগীত নিয়ে হলিউডের খ্যাতিমান সুরকার হ্যান্স জিমারের সঙ্গে প্রথমবারের মতো কাজ করেছেন তিনি। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দুই সংগীতস্রষ্টার এই সহযোগিতা চলচ্চিত্রটির সংগীত নিয়ে আগ্রহ তৈরি করেছে।
ভাষা, অঞ্চল ও সংস্কৃতির পার্থক্য সত্ত্বেও সংগীত যে মানুষকে একই আবেগে যুক্ত করতে পারে, রহমানের কনসার্টের অভিজ্ঞতা তারই প্রতিফলন। তাঁর কাছে গানের ভাষা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই চূড়ান্ত বিবেচ্য নয়। শেষ পর্যন্ত সুরের আবেদন, পরিবেশনার শক্তি এবং শ্রোতাদের সঙ্গে তৈরি হওয়া সংযোগই একটি সংগীতানুষ্ঠানকে স্মরণীয় করে তোলে।















