সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ই ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১:২২ পিএম
আবহমান বাংলার লোকসংস্কৃতির এক অমূল্য ও গভীর আধ্যাত্মিক সৃষ্টি হলো ‘মনে ময়লা থাকে যদি’। দেহতত্ত্ব ও আধ্যাত্মিক দর্শনে সমৃদ্ধ এই গানটি মূলত ঐতিহ্যবাহী বাউল ভাবধারার একটি উৎকৃষ্ট নিদর্শন। গানটির স্থায়ী অংশে গীতিকার হিসেবে ‘মথুর’ নামের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা লোকসংগীতের চিরন্তন ভণিতা প্রথার অংশ। বাউল সাধকদের সাধন-ভজনের প্রধান মাধ্যমই হলো গান, আর এই গানের মধ্য দিয়ে তাঁরা জাগতিক মোহমুক্তি ও আত্মশুদ্ধির বাণী সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেন।
এই গানটির মূল প্রেক্ষাপট গড়ে উঠেছে বাউল দর্শনের আধ্যাত্মিক জীবনবোধকে কেন্দ্র করে। বাউলরা বিশ্বাস করেন, মানুষের এই দৃশ্যমান দেহই হলো পরমেশ্বরের মন্দির এবং মানুষের অন্তরেই সেই ‘অধর মানুষ’ বা স্রষ্টার বাস। তবে হিংসা, নিন্দা, অহংকার ও জাগতিক লোভের কারণে মানুষের মন কলুষিত হয়ে পড়ে, যাকে বাউল পরিভাষায় ‘মনে ময়লা’ বলা হয়েছে। এই কলুষতা দূর না করে কোনো প্রকার সাধন-ভজন বা স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভ সম্ভব নয়—এই পরম সত্যটিই অত্যন্ত সহজ ও বাস্তবসম্মত রূপকের মাধ্যমে গানটিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
Table of Contents
মনে ময়লা থাকে যদি, সাধন সিদ্ধি হয় না তার
হিংসা আর নিন্দা ছাড়ো, মনটা করো পরিষ্কার।
প্রভুর নামে সাবান মাখো, ধুইয়া অন্তর সাফা করো
কাতর হইয়া সদাই ডাকো, প্রেমে মজে থাকো তাঁর
হিংসা আর নিন্দা ছাড়ো, মনটা করো পরিষ্কার।
জ্ঞান পরীক্ষায় পাস করিলে, ধ্যান যোগে তাঁর দেখা মেলে
নজরেতে ঠিক পড়িলে, দেখবে শুধু চমৎকার
হিংসা আর নিন্দা ছাড়ো, মনটা করো পরিষ্কার।
তুমি গুরুর ছবি দিলে আঁকো, ভাব সাগরে ডুইবা থাকো
মথুরে কয় খুঁইজা দেখো, দেখবে স্বরূপ চমৎকার
হিংসা আর নিন্দা ছাড়ো, মনটা করো পরিষ্কার।
Mone moyla thake jodi, sadhon siddhi hoy na tar
Hingsa ar ninda charo, monta koro porishkar.
Probhurer name saban makho, dhuiya ontor safa koro
Kator hoiya sodai dako, preme moje thako tar
Hingsa ar ninda charo, monta koro porishkar.
Gyan porikkhay pass korile, dhyan joge tar dekha mele
Nojorete thik porile, dekhbe shudhu chomotkar
Hingsa ar ninda charo, monta koro porishkar.
Tumi gurur chobi dile ako, bhab sagore duiba thako
Mothure koy khuijha dekho, dekhbe shorup chomotkar
Hingsa ar ninda charo, monta koro porishkar.
গানটির সুরের ধরন সম্পূর্ণ ঐতিহ্যবাহী বাউল ও লোকসংগীতের অঙ্গভুক্ত। একতারা, দোতারা এবং খমকের চিরায়ত বোলে গানটির সুর সাধারণ শ্রোতার মনকে এক অপার্থিব শান্তিতে ভরিয়ে দেয়। লোকজ সুরের এই সহজ ও সাবলীল গতিশীলতা গানের আধ্যাত্মিক বাণীকে তাত্ত্বিক জটিলতা থেকে মুক্ত করে অতি সাধারণ মানুষের বোধগম্য করে তুলেছে।
গানের মূল ভাব আবর্তিত হয়েছে আত্মশুদ্ধি এবং গুরুবাদের ওপর ভিত্তি করে। গীতিকার এখানে ‘প্রভুর নামে সাবান’ মাখার মতো অত্যন্ত চমৎকার ও আটপৌরে রূপক ব্যবহার করেছেন, যার অর্থ হলো নিয়মিত ঈশ্বরস্মরণ ও সৎ চিন্তার মাধ্যমে হৃদয়ের কালিমা ধুয়ে ফেলা। বাউল দর্শনে গুরুর স্থান সবার ওপরে, তাই মনের ভাবসাগরে ডুবে গুরুর নির্দেশিত পথে চললে এবং জ্ঞান ও ধ্যানের সংযোগ ঘটাতে পারলে নিজের ভেতরের সেই পরম সত্তা বা ‘স্বরূপ’-এর সন্ধান পাওয়া সম্ভব—এটাই এই গানের মূল উপদেশ।
এই গানের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর রূপকধর্মী সহজ শব্দচয়ন ও শক্তিশালী জীবনদর্শন। কোনো জটিল তাত্ত্বিক কথা না বলে অত্যন্ত প্রাত্যহিক জীবনের শব্দ ব্যবহার করে মানুষের ভেতরের নৈতিক পরিবর্তন ও অহংকারমুক্তির আহ্বান জানানো হয়েছে। গ্রামীণ বাউল শিল্পীদের দরদভরা কণ্ঠের টান এবং মেকি আধুনিকতাহীন এই সুর মানুষের আত্মিক চেতনার গভীরে এক প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করে।
উৎস (Sources)
এই নিবন্ধের আধ্যাত্মিক তত্ত্ব ও বাউল দর্শনসংক্রান্ত তথ্যসমূহ লালন একাডেমি ও কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার বাউল আখড়ার মৌখিক ঐতিহ্য, বাংলা একাডেমি প্রকাশিত লোকসংগীত কোষ এবং বাংলাদেশের লোকসংগীত গবেষকদের প্রামাণ্য নথিপত্র থেকে সংগ্রহ ও যাচাই করা হয়েছে।
মন্তব্য