মরমিয়া তুমি চলে গেলে – সতীনাথ মুখোপাধ্যায় (কথা: শ্যামল গুপ্ত, সুর: সতীনাথ মুখোপাধ্যায়)

বাংলা আধুনিক গানের স্বর্ণযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও গভীর বিষাদঘন সৃষ্টি “মরমিয়া তুমি চলে গেলে”। বিশিষ্ট গীতিকার শ্যামল গুপ্তের মর্মস্পর্শী ও অনুভূতিপ্রবণ কাব্যমালায় এবং প্রবাদপ্রতিম শিল্পী ও সুরকার সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের রাগাশ্রয়ী ধ্রুপদী সুর ও গম্ভীর মন্দ্রকণ্ঠে গানটি বিচ্ছেদের এক শাশ্বত রূপ ধারণ করেছে।

জীবনের পথে সহস্র মানুষের আনাগোনা থাকলেও অন্তরের নিভৃত ক্ষত ও না-বলা কথা বোঝার মতো একজন দরদী মানুষের অভাব যে মানুষের সমগ্র অস্তিত্বকে রিক্ত করে দেয়—গানটিতে সেই আত্মিক একাকীত্ব ফুটে উঠেছে অনুপম সংবেদনশীলতায়।

গানের বিস্তারিত তথ্য

তথ্যবিবরণবিস্তারিত তথ্য
গানের নামমরমিয়া তুমি চলে গেলে (দরদী আমার কোথা পাব)
মূল কণ্ঠশিল্পীসতীনাথ মুখোপাধ্যায় (Satinath Mukhopadhyay)
সুরকারসতীনাথ মুখোপাধ্যায়
গীতিকারশ্যামল গুপ্ত (Shyamal Gupta)
সংগীতধারাআধুনিক বাংলা গান / ধ্রুপদী অঙ্গের বিরহগীতি
মূল উপজীব্যঅন্তরের সমব্যথী হারানোর শূন্যতা, গভীর একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতার হাহাকার
প্রধান চিত্রকল্পমরমিয়া সঙ্গী, শিউলী ফুলের মালা, বিদায়ের বারতা ও ব্যথিত প্রাণ
আবেগীয় আবহশান্ত বিষাদ, নস্টালজিয়া ও পরম নির্ভরতা হারানোর অনুভূতি

মরমিয়া তুমি চলে গেলে বাংলা লিরিক

মরমিয়া তুমি চলে গেলে
দরদী আমার কোথা পাব
কারে আমি, এ ব্যাথা জানাব
কারে আমি এ ব্যাথা জানাব
মরমিয়া তুমি চলে গেলে
দরদী আমার কোথা পাব
কারে আমি, এ ব্যাথা জানাব

কে বল আর, শুনবে এ গান
রাঙিয়ে দেবে আমার এ প্রাণ
কে বল আর, শুনবে এ গান
রাঙিয়ে দেবে আমার এ প্রাণ
শিউলী ফুলের মালা গেঁথে
কারে পরাব
কারে আমি, এ ব্যাথা জানাব

বলনা গো বিদায়ের বারতা
মনে আমার, সইবেনা যে,সে ব্যাথা
বলনা গো বিদায়ের বারতা

কে আছে আর, বন্ধু আমার
দুঃখ-সুখের কথা শুনার
কে আছে আর, বন্ধু আমার
দুঃখ-সুখের কথা শুনার
কার নয়নের আশা নিয়ে
মন ভরাব
কারে আমি, এ ব্যাথা জানাব
মরমিয়া তুমি চলে গেলে
দরদী আমার কোথা পাব
কারে আমি, এ ব্যাথা জানাব

 

 

Moromiya Tumi Chole Gele (Romanized Quote)

Moromiya tumi chole gele
Dorodi amar kotha pab
Kare ami, e byatha janab
Kare ami e byatha janab
Moromiya tumi chole gele
Dorodi amar kotha pab
Kare ami, e byatha janab

Ke bol ar, shunbe e gan
Rangiye debe amar e pran
Ke bol ar, shunbe e gan
Rangiye debe amar e pran
Shiuli phuler mala genthe
Kare porab
Kare ami, e byatha janab

Bolona go biday-er barota
Mone amar, soibe na je, se byatha
Bolona go biday-er barota

Ke ache ar, bondhu amar
Dukkho-sukher kotha shunar
Ke ache ar, bondhu amar
Dukkho-sukher kotha shunar
Kar noyner asha niye
Mon bhorab
Kare ami, e byatha janab

Moromiya tumi chole gele
Dorodi amar kotha pab
Kare ami, e byatha jan

 

 

গানের মূল ভাব

“মরমিয়া তুমি চলে গেলে” গানটির মূল ভিত্তি হলো মানুষের অন্তরের গভীর বেদনা অনুধাবন করতে পারা একজন খাঁটি সমব্যথী বা দরদী মানুষের অভাববোধ। প্রাচ্য ও মরমি দর্শনে ‘মরমিয়া’ কেবল লৌকিক কোনো সঙ্গী নয়; সে এমন এক আত্মার আত্মীয়, যার সান্নিধ্যে পার্থিব সমস্ত আবরণ খসে পড়ে এবং আত্মিক মুক্তির পথ উন্মুক্ত হয়।
গীতিকার শ্যামল গুপ্ত গানটিতে বিচ্ছেদকে দেখেছেন সৃষ্টিশীলতা ও জীবনের অর্থহীনতার পটভূমিতে। যে মানুষটি শিল্পীর সুরের গভীরতাকে স্পর্শ করতে পারত, যার জন্য ভোরের স্নিগ্ধ শিউলী ফুলের মালা গাঁথা হতো—সে-ই যদি হারিয়ে যায়, তবে গান আর ফুলের নৈবেদ্য সবই নিস্ফল হয়ে পড়ে। প্রিয় মানুষের বিদায়ের বারতা মনকে এমন এক নিস্তব্ধ একাকীত্বের মুখোমুখি দাঁড় করায়, যেখানে কোনো সান্ত্বনাই আর অবশিষ্ট থাকে না।

চরণ ও ভাব বিশ্লেষণ

১. দরদীহীন অস্তিত্ব ও ক্ষতের গোপন আর্তি

  • “মরমিয়া তুমি চলে গেলে দরদী আমার কোথা পাব / কারে আমি এ ব্যথা জানাব…”
    গানটির সূচনাতেই পরম একাকীত্বের সংকট উন্মোচিত। মানুষের ভিড়ে দুঃখ প্রকাশের মানুষের অভাব হয় না, কিন্তু অন্তরের তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছে অনুভূতির মর্যাদা দিতে পারে কেবল একজন ‘মরমিয়া’। তার প্রস্থানের পর নিজের ভেতরের দহনকে প্রকাশ করার আর কোনো পথ থাকে না।

২. গানের সার্থকতা ও শিউলী ফুলের নৈবেদ্য

  • “কে বল আর শুনবে এ গান, রাঙিয়ে দেবে আমার এ প্রাণ / শিউলী ফুলের মালা গেঁথে কারে পরাব…”
    সৃষ্টির সাথে সমঝদার রসিকের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। শিল্পের পূর্ণতা আসে সেই রসিকের উপস্থিতিতে যে প্রাণকে নতুন রঙে রাঙাতে পারে। শরতের ক্ষণস্থায়ী কিন্তু সুবাসিত শিউলী ফুলের মালা যেমন ভালোবাসার পবিত্র অর্ঘ্য, তেমনি তা গ্রহণ করার মতো মানুষ না থাকলে সমগ্র সাধনাই অর্থহীন ঠেকে।

৩. বিদায়ের আঘাত ও আশাহীন নয়ন

  • “বলনা গো বিদায়ের বারতা, মনে আমার সইবেনা যে সে ব্যথা / কার নয়নের আশা নিয়ে মন ভরাব…”
    বিদায়ের আকস্মিকতাকে গ্রহণ করতে না পারার চরম মানসিক আর্তি। প্রিয়জনের চোখের আশ্বস্ত দৃষ্টিই ছিল সমস্ত প্রতিকূলতার মাঝে বেঁচে থাকার অবলম্বন। সেই আশা বিলীন হয়ে গেলে মন এক অনন্ত শূন্যতার মুখে পড়ে।

সাহিত্যিক ও কাব্যিক বৈশিষ্ট্য

  • শ্যামল গুপ্তের অনুভূতিপ্রবণ লেখনী: শ্যামল গুপ্তের কাব্যশৈলীর অন্যতম বিশেষত্ব ছিল গভীর অন্তর্বেদনাকে অত্যন্ত পরিমিত ও ধ্রুপদী শব্দচয়নে রূপ দেওয়া। ‘মরমিয়া’, ‘দরদী’, ‘বারতা’র মতো শব্দের মেলবন্ধন গানটিকে সাধারণ প্রেমের সীমানা ছাড়িয়ে এক আত্মিক উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।
  • শিল্প ও বিচ্ছেদের মেলবন্ধন: গান গাওয়া এবং মালা গাঁথার মতো শৈল্পিক অনুষঙ্গগুলোকে বিরহের সাথে একাত্ম করে সৃষ্টিশীল মানুষের একাকীত্বকে মূর্ত করা হয়েছে।
  • সংযত আর্তি: চরণের ভেতরে কোনো চটুল বা অতিনাটকীয় হাহাকার নেই; রয়েছে এক নীরব ও সম্ভ্রান্ত কান্নার আবহ।

সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সুরের নান্দনিকতা

  • সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের ধ্রুপদী সুর ও গায়কী: শাস্ত্রীয় সংগীতে অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী সতীনাথ মুখোপাধ্যায় সুরের ভেতরে মীড়, গমক ও কোমল স্বরের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন পরম মমতায়। ধীর লয়ের রাগাশ্রয়ী চাল গানটিকে প্রার্থনার মতো ভাবগম্ভীর করে তোলে।
  • মন্দ্র কণ্ঠের গভীরতা: সতীনাথের স্বভাবসুলভ ভরাট ও মন্দ্র স্বরপ্রক্ষেপণ প্রতিটি শব্দকে এক বিশেষ ওজন ও বিষাদের তীব্রতা দান করেছে, যা সরাসরি শ্রোতার অন্তস্থলকে আর্দ্র করে দেয়।
  • ন্যূনতম বাদ্যের আবহ: অতিরিক্ত কোলাহলপূর্ণ অর্কেস্ট্রেশন পরিহার করে বাঁশি, সারিন্দা বা ভায়োলিনের মৃদু বিষাদময় টানে সুরের শূন্যতাকে আরও জীবন্ত করা হয়েছে।

শিল্পী ও স্রষ্টা পরিচিতি

  • সতীনাথ মুখোপাধ্যায় (১৯২৫–১৯৯২): আধুনিক বাংলা গানের সোনালী যুগের অন্যতম স্থপতি। তিনি ছিলেন একাধারে সুগায়ক, সুরস্রষ্টা ও সংগীত পরিচালক। ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীতের নিখাদ ভিত্তির ওপর আধুনিক গানের কাঠামো নির্মাণে তাঁর অবদান ঐতিহাসিক। “আকাশ এত মেঘলা”, “জীবন নামের নদীটি”, “তুমি এখন অনেক দূরে”-র মতো কালজয়ী গানের মাধ্যমে তিনি সংগীতাঙ্গনে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।
  • শ্যামল গুপ্ত (১৯২২–২০১০): বাংলা গানের ইতিহাসের অন্যতম প্রবাদপ্রতিম গীতিকার। মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় সহ শীর্ষ শিল্পীদের জন্য তিনি শত শত কালজয়ী গান রচনা করেছেন। তাঁর লেখায় রোমান্টিকতা ও বিরহের যে মেলবন্ধন দেখা যায়, তা বাংলা কাব্যগীতিকে সমৃদ্ধ করেছে।

সাংস্কৃতিক তাৎপর্য

“মরমিয়া তুমি চলে গেলে” বাংলা সংগীত ইতিহাসের এমন একটি দলিল, যা প্রমাণ করে প্রকৃত বিরহ কেবল সম্পর্কের ভাঙনে থাকে না—থাকে আত্মার আত্মীয় হারানোর স্থায়ী ক্ষতে। বাংলা আধুনিক গানের স্বর্ণযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিরহগীতি হিসেবে এটি আজও রসজ্ঞ সংগীতবোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ ও অনুভবে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত।

উৎস ও তথ্যসূত্র

  1. সতীনাথ মুখোপাধ্যায় আধুনিক গান সংকলন, এইচএমভি/সারেগামা অডিও আর্কাইভ।
  2. শ্যামল গুপ্তের নির্বাচিত গীতিসংগ্রহ ও মূল্যায়ন।
  3. বাংলা আধুনিক গানের স্বর্ণযুগ সমীক্ষা, কলকাতা সংগীত গবেষণা কেন্দ্র।
Tags :

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

সম্পাদক ও প্রকাশক : সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর।

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।