বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের দেহতত্ত্ব ও মারফতি দর্শনাশ্ৰিত এক অবিস্মরণীয় লোকসংগীত “রঙ্গিলা বাড়ই” (বা “রঙ্গিলা বারই”)। লৌকিক অর্থে ‘বাড়ই’ বলতে যিনি ঘর তৈরি করেন বা কারিগর/সূত্রধরকে বোঝায়। এই গানে শাহ আবদুল করিম পরমাত্মা বা সৃষ্টিকর্তাকে ‘রঙ্গিলা বাড়ই’ রূপে সম্বোধন করেছেন, যিনি মানবদেহ ও নিখিল ভুবনের পরম কারিগর। নিজের কর্মের দায়ভার সৃষ্টিকর্তার ওপর সঁপে দিয়ে, লোকনিন্দা ও সামাজিক কুল-মান বিসর্জন দিয়ে পরম প্রেমের সান্নিধ্য লাভের এক নিঃশর্ত আকুলতা এই গানে প্রকাশিত হয়েছে।
Table of Contents
গানের বিস্তারিত তথ্য
| তথ্যবিবরণ | বিস্তারিত তথ্য |
| গানের নাম | রঙ্গিলা বাড়ই (রঙ্গিলা বারই) |
| গীতিকার ও সুরকার | শাহ আবদুল করিম |
| ধারা / পর্যায় | বাউল গান / দেহতত্ত্ব ও মারফতি দর্শন |
| সুরশৈলী | ভাটি অঞ্চলের বাউল সুর |
| মূল উপজীব্য | ঈশ্বরের লীলা, মানবদেহের নশ্বরতা, লোকনিন্দা ও নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ |
| অঞ্চল | ভাটি অঞ্চল (সুনামগঞ্জ, সিলেট) |
রঙ্গিলা বাড়ই লিরিক্স:
রঙ্গিলা বারই রে
তুমি নানান রঙের খেলা খেলো।
আমি তোমার প্রেমের পাগল
তোমায় বাসি ভালো,
রঙ্গিলা বারই রে
তুমি নানান রঙের খেলা খেলো।
তোমার কর্ম তুমি করো
মিছা দোষী আমি।
পুরাইতে তোমার বাসনা
দেশ-বিদেশে ভ্রমি।
তোমার কর্ম তুমি করো
মিছা দোষী আমি।
পুরাইতে তোমার বাসনা
দেশ-বিদেশে ভ্রমি।
আমার ঘরে থাক তুমি
তোমার ভবে চলো।
রঙ্গিলা বারই রে
তুমি নানান রঙের খেলা খেলো।
করার আর কি করি আমি
ভাবি দিবা-নিশি!
লোকে বলে কাদায় ঘান খাই,
ব্যঙ্গের গলায় ফাঁসি।
করার আর কি করি আমি
ভাবি দিবা-নিশি!
লোকে বলে কাদায় ঘান খাই,
ব্যঙ্গের গলায় ফাঁসি।
তোমার লাগি কুল বিনাশি
বিফলে দিন গেল।
রঙ্গিলা বারই রে
তুমি নানান রঙের খেলা খেলো।
যাক না জাতি, হোক না ক্ষতি
দুঃখ নাই রে আর!
সত্য করে কওরে বারই
তুমি নি আমার?
যাক না জাতি, হোক না ক্ষতি
দুঃখ নাই রে আর!
সত্য করে কওরে বারই
তুমি নি আমার?
তোমার প্রেমে আব্দুল করিম
মরে যদি ভালো!
রঙ্গিলা বারই রে
তুমি নানান রঙের খেলা খেলো।
Rongila Baroi Lyrics:
Rongila Baroi re
Tumi nanan ronger khela khelo.
Ami tomar premer pagol
Tomay bashi bhalo,
Rongila Baroi re
Tumi nanan ronger khela khelo.
Tomar kormo tumi koro
Micha doshi ami.
Puraite tomar bashona
Desh-bideshe bhromi.
Tomar kormo tumi koro
Micha doshi ami.
Puraite tomar bashona
Desh-bideshe bhromi.
Amar ghore thako tumi
Tomar bhobe cholo.
Rongila Baroi re
Tumi nanan ronger khela khelo.
Korar ar ki kori ami
Bhabi dibanishi!
Loke bole kaday ghan khai,
Byanger golay phাঁsi.
Korar ar ki kori ami
Bhabi dibanishi!
Loke bole kaday ghan khai,
Byanger golay phাঁsi.
Tomar lagi kul binashi
Bifole din gelo.
Rongila Baroi re
Tumi nanan ronger khela khelo.
Jak na jati, hok na khoti
Dukkho nai re ar!
Shotyo kore kowre Baroi
Tumi ni amar?
Jak na jati, hok na khoti
Dukkho nai re ar!
Shotyo kore kowre Baroi
Tumi ni amar?
Tomar preme Abdul Karim
More jodi bhalo!
Rongila Baroi re
Tumi nanan ronger khela khelo.
গানের মূল ভাব
পদ ও ভাবনা বিশ্লেষণ
১. পরম কারিগর ও তাঁর বিচিত্র খেলা
- “রঙ্গিলা বারই রে / তুমি নানান রঙের খেলা খেলো…”সৃষ্টিকর্তাকে রঙিন লীলার অধিপতি হিসেবে দেখা হয়েছে। তিনিই এই জগত ও জীবনের নানা রঙ সাজিয়েছেন এবং নিজেই অন্তরে বসে সেই খেলা পরিচালনা করছেন।
২. কর্মের কর্তা ও নির্লিপ্ত সাধক
- “তোমার কর্ম তুমি করো / মিছা দোষী আমি…”জীবাত্মা কেবল পরমাত্মার হাতের যন্ত্র মাত্র। পরম কারিগর নিজেই সাধকের ভেতর থেকে সবকিছু পরিচালনা করছেন, অথচ পার্থিব জগতের মানুষ মনে করে মানুষই সবকিছুর কর্তা। এই দ্বৈততাকে কবি রূপকের মাধ্যমে উন্মোচিত করেছেন।
৩. লোকলজ্জা ও সামাজিক বিচার
- “লোকে বলে কাদায় ঘান খাই, ব্যঙ্গের গলায় ফাঁসি / তোমার লাগি কুল বিনাশি বিফলে দিন গেল…”বাউল সাধকদের আত্মিক প্রেম সাধারণ মানুষের সামাজিক দৃষ্টিতে প্রায়শই অবাস্তব ও কৌতুককর মনে হয়। লোকসমাজে উপহাস ও লাঞ্ছনা সহ্য করেও সাধক তাঁর প্রেমপথ থেকে বিচ্যুত হন না।
৪. চরম সমর্পণ ও সত্যের অন্বেষণ
- “যাক না জাতি, হোক না ক্ষতি দুঃখ নাই রে আর! / সত্য করে কওরে বারই তুমি নি আমার?”জাত-পাত, সামাজিক মর্যাদা এবং পার্থিব সমস্ত ক্ষতি স্বীকার করতে সাধক প্রস্তুত, যদি তিনি নিশ্চিত হতে পারেন যে সেই পরম সত্তা তাঁর একান্ত আপনার। সবশেষে আত্মবিলুপ্তির মাধ্যমেই প্রকৃত প্রেম সার্থক হয়।
সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য
- লৌকিক রূপক ও দেহতত্ত্ব: ‘বাড়ই’ বা ছুতোরমিস্ত্রিকে ঈশ্বরের রূপক হিসেবে ব্যবহার করে গ্রামীণ জীবনের বাস্তব উপকরণকে আধ্যাত্মিক তত্ত্বে উন্নীত করা হয়েছে।
- গ্রামীণ বাগধারা ও প্রবাদের প্রভাব: ‘কাদায় ঘান খাওয়া’ বা ‘ব্যাঙের গলায় ফাঁসি’-র মতো আঞ্চলিক প্রবাদের ব্যবহারে গানের লোকজ রূপ ও তীক্ষ্ণতা স্পষ্ট হয়েছে।
- সরল অথচ দার্শনিক ভাষা: সিলেট অঞ্চলের সহজিয়া সুর ও চাটুল ভাবাবেগের সংমিশ্রণে এক গভীর আধ্যাত্মিক সত্যকে প্রাঞ্জলভাবে রূপায়িত করা হয়েছে।
সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য
- ভাটিয়ালি ও বাউল অঙ্গের সুর: গানটি ভাটি অঞ্চলের লোকসুর এবং বাউল গানের গভীর মেজাজে নিবদ্ধ।
- লোকজ বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার: ঐতিহ্যগতভাবে দোতারা, মন্দিরা, খমক ও ঢোলের মিষ্টি তালের সাথে গানটি গাওয়া হয়, যা সুরের উদাসী ও ভক্তিভাবকে তীব্র করে তোলে।
প্রেক্ষাপট ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
উৎস ও তথ্যসূত্র
- বাউল শাহ আবদুল করিমের গান সমগ্র, বাংলা একাডেমী, ঢাকা।
- শাহ আবদুল করিম: জীবন ও গান, সুমনকুমার দাশ।
- ভাটি অঞ্চলের লোকসাহিত্য ও বাউল দর্শন আর্কাইভ।
সব ধরনের প্রচলিত ও অপ্রচলিত বাংলা গানের কথা সংগ্রহ করে সঙ্গীতপ্রেমীদের জন্য প্রকাশে কাজ করছে ‘লিরিক ডেস্ক’। আপনার কাঙ্ক্ষিত গানটি আমাদের ওয়েবসাইটে না পেলে জানান; আমরা তা সংগ্রহ করে দ্রুত আপলোড করে দেব।













