সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই জানুয়ারি ২০২৩, ৯:৬ পিএম

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সুবিশাল আঙিনায় কিছু রাগ থাকে, যারা তাদের সমগোত্রীয় জনপ্রিয় রাগের খুব কাছাকাছি থেকেও নিজের একটুখানি ভিন্ন চলনের জন্য স্বতন্ত্র আভিজাত্য তৈরি করে। তেমনই একটি চমৎকার ও বৈচিত্র্যময় রাগ হলো ‘রাগ বেহগড়া’ (বা বেহাগরা)। উত্তর ভারতীয় সঙ্গীতশাস্ত্রে বর্ণিত এই রাগটি মূলত ‘বিলাবল’ ঠাট থেকে উৎপন্ন হয়েছে। নামের মধ্যেই যেমন রাগ বেহাগের একটা চেনা ছোঁয়া পাওয়া যায়, তেমনি এর রূপের ক্ষেত্রেও দেখা যায় এক অনন্য কারিগরি। এর মূল আরোহণে ‘ঋষভ’ (রে) স্বরটি বর্জিত থাকে বলে এটি ষাড়ব রূপ নেয়, কিন্তু অবরোহণে সাতটি স্বরই ফিরে আসায় এটি পরিণত হয় এক পূর্ণাঙ্গ ‘ষাড়ব-সম্পূর্ণ’ জাতের রাগে। এই রাগের আসল সৌন্দর্য ও রঙের খেলা ফুটে ওঠে যখন এর সুষম সুরের অবয়বে সামান্য ‘কড়ি মধ্যম’ (হ্ম) এবং বিবাদী স্বর হিসেবে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে ‘কোমল নিষাদ’ (ণ)-এর প্রয়োগ করা হয়।
চলুন, রাত্রের এই মিষ্টি রাগের কারিগরি ও ভেতরের রূপটা একটু গভীরে গিয়ে চিনে নেওয়া যাক:
রাগ বেহগড়ার ব্যাকরণ ও এর প্রধান স্বর নিয়ে পণ্ডিতদের মাঝে বেশ চমৎকার দুটি মত প্রচলিত আছে, যা এর চরিত্রকে আরও রহস্যময় করে তোলে:
ভিন্ন মত: তবে অনেক ওস্তাদ ও সঙ্গীতজ্ঞের মতে, এই রাগের আরোহণে কেবল ঋষভ নয়, বরং ‘ধৈবত’ (ধা) স্বরটিও বর্জিত থাকে। সেই মত অনুযায়ী এর জাতি হয় ‘ঔড়ব-সম্পূর্ণ’ এবং এর বাদীস্বর হয় ‘মধ্যম’ (ম) ও সমবাদী স্বর হয় ‘ষড়জ’ (স)।
রাগ বেহগড়ার আসল আবেদন ও ভেতরের আবেগটি টের পাওয়া যায় এর পরিবেশনের নিগূঢ় সময়ে। এই রাগের জন্য ওস্তাদরা বেছে নেন রাত্রি দ্বিতীয় প্রহর বা মধ্যরাতের শান্ত সময়টিকে।
চারপাশ যখন একদম নিঝুম হয়ে আসে, কোলাহল ফুরিয়ে প্রকৃতি যখন এক গভীর ঘুমে মগ্ন—ঠিক তখনই তানপুরার জাদুকরী ঝংকারে জেগে ওঠে রাগ বেহগড়া। এর বাদীস্বর ‘গান্ধার’-এর গভীর চলন, কড়ি মধ্যমের সামান্য ছোঁয়া আর কোমল নিষাদের আলতো ব্যবহার শ্রোতার মনে এক তীব্র রোমান্টিকতা, গভীর আর্তি এবং এক অপার্থিব ব্যাকুলতার জন্ম দেয়। বেহাগ রাগের চিরচেনা আকুলতার সাথে এই রাগের নিজস্ব স্বরবৈচিত্র্য শ্রোতার অবচেতন মনকে এক অন্য রকম প্রশান্তিতে ভরিয়ে দেয়। এটি কেবল কিছু স্বরের নিখুঁত জোড়াতালি নয়, বরং মাঝরাতের নিস্তব্ধতায় মানুষের হৃদয়ের গোপন কোনো অনুভূতিকে সুরের ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলার এক অনন্য মনস্তাত্ত্বিক ম্যাজিক।
তথ্যসূত্র:
সঙ্গীত শাস্ত্র (তৃতীয় খণ্ড) — শ্রীইন্দু ভূষণ রায়।
মন্তব্য