শ্যামল গুপ্ত । বাঙ্গালি গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত শিল্পী

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বাংলা আধুনিক ও চলচ্চিত্র সঙ্গীত যে অতুলনীয় সৌন্দর্য, কাব্যময়তা ও গভীরতায় পৌঁছায়, তার অন্যতম প্রধান রূপকার ছিলেন শ্যামল গুপ্ত (১৯২২–২০১০)। বিশ শতকের পঞ্চাশ থেকে সত্তরের দশক পর্যন্ত সময়কালকে বাংলা গানের ‘স্বর্ণযুগ’ বলা হয়। এই স্বর্ণযুগের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব হিসেবে শ্যামল গুপ্ত একাধারে গীতিকার, সুরকার, প্রাবন্ধিক, গল্পকার, চিত্রনাট্যকার এবং সংগীতশিল্পী হিসেবে অবিস্মরণীয় অবদান রেখে গেছেন।

তিনি প্রায় দুই সহস্রাধিক কালজয়ী গান রচনা করেছেন, যার মধ্যে তিন শতাধিক গান স্থান পেয়েছে বাংলা চলচ্চিত্রে। রোমান্টিক আধুনিক গান থেকে শুরু করে রাগাশ্রয়ী সঙ্গীত, আকাশবাণীর রম্যগীতি, লঘুসংগীত ও ছায়াছবির গীতিআলেখ্যে তাঁর সাবলীল ও নিপুণ সৃষ্টিশীলতা বাংলা সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ।

এক নজরে শ্যামল গুপ্ত
  • পূর্ণ নাম: শ্যামল গুপ্ত
  • জন্ম: ৩ ডিসেম্বর ১৯২২, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ
  • মৃত্যু: ২৮ জুলাই ২০১০ (বয়স ৮৭ বছর), কলকাতা
  • শিক্ষাগত যোগ্যতা: রসায়ন শাস্ত্রে বি.এসসি (অনার্স), সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ, কলকাতা (১৯৪৫)
  • প্রধান পরিচয়: গীতিকার, সুরকার, চিত্রনাট্যকার ও সাহিত্যিক
  • মোট রচিত গান: ২,০০০-এর বেশি (চলচ্চিত্রের গান প্রায় ৩০০টি)
  • উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: ‘আধুনিক গান’ (গীত সংকলন, ১৯৬৩)
  • জীবনসঙ্গিনী: গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় (বিবাহ: ১৯৬৬)
  • শ্রেষ্ঠ সম্মাননা: পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার পুরস্কার (তপন সিংহ পরিচালিত হারমোনিয়াম চলচ্চিত্রের জন্য)

Table of Contents

প্রাথমিক জীবন, বংশপরিচয় ও শিক্ষাজীবন

শ্যামল গুপ্ত ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ৩ ডিসেম্বর ব্রিটিশ ভারতের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পারিবারিক মূল ধারার শেকড় ছিল বর্তমান উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার ঐতিহ্যবাহী হালিশহরে। পরবর্তীতে তাঁর পরিবার বিহারের জামালপুর ও মুঙ্গের অঞ্চলে দীর্ঘ সময় বসবাস করে।

পারিবারিক পটভূমি

শ্যামল গুপ্তের পরিবার ছিল সুশিক্ষিত ও আইনি পেশায় সুপ্রতিষ্ঠিত। তাঁর পিতামহ (দাদু) এবং পিতা উভয়েই বিহারের মুঙ্গের আদালতের নামকরা আইনজীবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ফলে শৈশব থেকেই তিনি এক সাহিত্য-সংস্কৃতিমনস্ক ও সুশৃঙ্খল পারিবারিক পরিবেশ পেয়েছিলেন।

শিক্ষা ও অ্যাকাডেমিক সাফল্য

কলকাতা শহরের শিক্ষালয়েই তাঁর প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষার ধাপ সম্পন্ন হয়:
  • স্কুল ও ইন্টারমিডিয়েট: কলকাতার খ্যাতনামা স্কটিশ চার্চ স্কুল এবং স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন।
  • স্নাতক ডিগ্রি: ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার ঐতিহাসিক সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে রসায়ন শাস্ত্রে অনার্সসহ বিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক (B.Sc. Chemistry Hons.) ডিগ্রি লাভ করেন।

বিজ্ঞানাগার থেকে কাব্যচর্চা: পেশাগত জীবনের প্রথম পর্ব

রসায়নের মতো একটি বিশুদ্ধ বিজ্ঞান বিষযের মেধাবী ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও শিল্প ও সাহিত্যের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল জন্মগত। স্নাতকোত্তর বা গবেষণার স্বাভাবিক গতিপথ ছেড়ে তিনি বিচিত্র পেশাগত অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
[সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ (রসায়ন অনার্স, ১৯৪৫)]
                     │
                     ▼
[পুণে মিলিটারি এক্সপ্লোসিভ ল্যাবরেটরি (বিজ্ঞানী/রসায়নাগরিক)]
                     │
                     ▼ (১৯৪৭ সালে ইস্তফা)
[বিজ্ঞাপনী সংস্থার কপিরাইটার (১ বছর, কলকাতা)]
                     │
                     ▼
[পূর্ণকালীন সাহিত্য, গীতিকবিতা ও সঙ্গীত সাধনা]
  • পুণেতে বৈজ্ঞানিক গবেষণা (১৯৪৫-১৯৪৭): স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পরপরই তিনি মহারাষ্ট্রের পুণেতে অবস্থিত ভারত সরকারের ‘মিলিটারি এক্সপ্লোসিভ ল্যাবরেটরি’তে (Military Explosive Laboratory) বিজ্ঞানী/রসায়নাগরিক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
  • ইস্তফা ও কলকাতায় প্রত্যাবর্তন: ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষণে তিনি সরকারি বিজ্ঞানের চাকরি ছেড়ে কলকাতায় ফিরে আসেন।
  • বিজ্ঞাপনের কপিরাইটার: কলকাতায় এসে তিনি এক বছর একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কপিরাইটার হিসেবে কাজ করেন। এই সময়টিতেই শব্দ চয়ন, সংক্ষিপ্ত বাক্যে গভীর অর্থ প্রকাশ এবং মানুষের মনস্তত্ত্বকে স্পর্শ করার অনন্য দক্ষতা অর্জন করেন, যা পরবর্তীকালে তাঁর গান রচনায় ভীষণভাবে কাজে লেগেছিল। এরপর তিনি সম্পূর্ণভাবে গান ও সাহিত্য রচনায় আত্মনিয়োগ করেন।

সঙ্গীত ও সাহিত্য সাধনায় আত্মপ্রকাশ

শ্যামল গুপ্তের শিল্পজীবনের সূচনা ঘটেছিল একজন কণ্ঠশিল্পী হিসেবে, যা সাধারণ শ্রোতাদের অনেকের কাছেই অজানা।

১. গায়ক হিসেবে প্রাথমিক যাত্রা

সংগীত জীবনের শুরুতে তিনি বিখ্যাত গ্রামোফোন কোম্পানি ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’ (HMV)-এর অধীনে তিনটি আধুনিক গানের রেকর্ড করেন। তাঁর কণ্ঠ প্রশংসিত হলেও তিনি অনুধাবন করেন যে তাঁর প্রকৃত সৃজনশীল শক্তি গায়কির চেয়ে গান রচনার গভীরতায় বেশি কার্যকর। ফলে গায়ন ছেড়ে তিনি পুরোপুরি গীতিকবিতায় মনোযোগ দেন।

২. শাস্ত্রীয় সংগীত শিক্ষা ও সাহিত্যিক অনুপ্রেরণা

  • মার্গ সংগীতের পাঠ: ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রাথমিক জ্ঞান অর্জনের জন্য তিনি বিখ্যাত সংগীতসাধক তারাপদ চক্রবর্তীর প্রধান শিষ্য মণি ঘোষের কাছে তালিম নেন। এই শাস্ত্রীয় ভিতই তাঁকে রাগাশ্রয়ী গান রচনায় অতুলনীয় ব্যুৎপত্তি এনে দেয়।
  • রবীন্দ্র-প্রভাব: কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষসপ্তক’ কবিতাগুচ্ছ ছিল শ্যামল গুপ্তের গীত ও কবিতা রচনার মূল উৎস ও প্রেরণা। গদ্যছন্দের দোলা এবং কাব্যের সূক্ষ্ম অনুভূতির মেলবন্ধন তিনি রবীন্দ্রসাহিত্য থেকেই আহরণ করেছিলেন।

৩. কবিতায় ও কথাসাহিত্যে অবদান

কেবল গান নয়, লিটল ম্যাগাজিন ও মূলধারার সাহিত্য পত্রিকাতেও তাঁর নিয়মিত পদচারণা ছিল:
  • কবিতা: সমকালের প্রভাবশালী কাব্যপত্রিকা ‘অরণি’, ‘অভ্যুদয়’ এবং ‘একক’-এ তাঁর একাধিক কবিতা প্রকাশিত হয়।
  • ছোটগল্প: সেকালের জনপ্রিয় দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘দৈনিক বসুমতী’ এবং ‘সত্যযুগ’-এ তাঁর বেশ কিছু মনস্তাত্ত্বিক ছোটগল্প পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছিল।

গীতিকার হিসেবে স্বকীয়তা ও গানের বৈচিত্র্যময় আঙ্গিক

শ্যামল গুপ্তের রচিত গানের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল—সহজ-সরল শব্দের অলঙ্কারময় ব্যবহার, গভীর রোমান্টিকতা, জীবনের সূক্ষ্ম আবেগ এবং রাগের শাস্ত্রীয় প্রয়োগ। তিনি আধুনিক বাংলা গানকে কেবল সুরের বাহক করেননি, বরং প্রতিটি গানকে এক একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ কবিতা হিসেবে রূপ দিয়েছিলেন।

১. বৈচিত্র্যময় গানের ধারা

  • আধুনিক রোমান্টিক গান: বিচ্ছেদ, মিলন ও প্রেমের সূক্ষ্ম রূপক নিয়ে লেখা শত শত আধুনিক গান আজও বাঙালির হৃদয়ে অমলিন।
  • রাগাশ্রয়ী ও লঘুসংগীত: উত্তর ভারতীয় ধ্রুপদী রাগের ওপর ভিত্তি করে রচিত তাঁর গানগুলো মেলোডির চরম উৎকর্ষ নির্দেশ করে।
  • আকাশবাণীর রম্যগীতি: আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে প্রচারিত বিভিন্ন বিশেষ সঙ্গীতানুষ্ঠান ও গীতিআলেখ্যের জন্য তিনি অজস্র রম্যগীতি রচনা করেন।
  • গীত সংকলন প্রকাশ: ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে তাঁর নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ গীতিকবিতাগুলো নিয়ে ‘আধুনিক গান’ নামক একটি সুদৃশ্য গীত সংকলন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়।

বাংলা চলচ্চিত্রে অবদান: চিত্রনাট্য, গল্প ও গীতিআলেখ্য

বাংলা সিনেমার ইতিহাসে শ্যামল গুপ্তের নাম কেবল গীতিকার হিসেবে নয়, বরং একজন সফল কাহিনীকার ও চিত্রনাট্যকার হিসেবেও স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।
+-----------------------------------------------------------------------------------+
|                     চলচ্চিত্র শিল্পে শ্যামল গুপ্তের বহুমাত্রিক অবদান              |
+-----------------------------------------------------------------------------------+
|  • কাহিনী ও চিত্রনাট্য রচনা   --> 'বধূবরণ', 'পুতুলঘর'                                 |
|  • কালজয়ী গীত রচনা         --> 'হারমোনিয়াম', 'কাঁচকাটা হীরে', 'আরোহী', 'জীবন তৃষ্ণা'|
|  • রাজ্য পুরস্কার লাভ        --> 'হারমোনিয়াম' (পরিচালনা: তপন সিংহ)                   |
+-----------------------------------------------------------------------------------+

১. চিত্রনাট্য ও কাহিনী রচনা

তিনি ‘বধূবরণ’ এবং ‘পুতুলঘর’ ছায়াছবির মতো সমাদৃত চলচ্চিত্রের মূল কাহিনী ও চিত্রনাট্য রচনা করেন। চলচ্চিত্রের সংলাপ ও দৃশ্যনাট্যে তাঁর সামাজিক বাস্তবতা ও মনস্তাত্ত্বিক রূপায়ণের মুন্সিয়ানা দেখা যায়।

২. চলচ্চিত্রে কালজয়ী গীতি রচয়িতা

তপন সিংহ, অরুন্ধতী দেবী, অসিত সেনের মতো কিংবদন্তি পরিচালকদের ছবিতে শ্যামল গুপ্তের লেখা গান ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছিল। চলচ্চিত্র পরিচালনা ও আবহসংগীতের সাথে তাঁর গানের কাব্যিক সংযোগ ছিল নিখুঁত।

স্বর্ণযুগের শিল্পী ও সুরকারদের সঙ্গে যুগলবন্দী

বাংলা সংগীতের স্বর্ণযুগের প্রায় প্রতিটি প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী ও সুরকার শ্যামল গুপ্তের লেখা গানে সুর দিয়েছেন ও কণ্ঠ মিলিয়েছেন।

কণ্ঠশিল্পীদের তালিকা

শ্যামল গুপ্তের রচিত গান গেয়ে যাঁরা বাঙালি শ্রোতাদের আপ্লুত করেছেন:
  • স্ত্রী ও প্রধান সহশিল্পী: গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় (তাঁর লেখা অজস্র গান সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে অমরত্ব পেয়েছে)।
  • মহিলা কণ্ঠশিল্পীগণ: লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুপ্রীতি ঘোষ, রমা দেবী, ইলা বসু, গায়ত্রী বসু, বাণী ঘোষাল, আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়, কল্পনা মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায়, নির্মলা মিশ্র, উৎপলা সেন, ললিতা ধরচৌধুরী, মাধুরী চট্টোপাধ্যায়, বনশ্রী সেনগুপ্ত, কৃষ্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, হৈমন্তী শুক্লা প্রমুখ।
  • পুরুষ কণ্ঠশিল্পীগণ: হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, তালাত মাহমুদ, জগন্ময় মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, শৈলেন মুখোপাধ্যায়, পিন্টু ভট্টাচার্য, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়, অনুপ ঘোষাল, আব্দুল জব্বার প্রমুখ।

সুরকারবৃন্দের সঙ্গত

রবীন চট্টোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরী, নচিকেতা ঘোষ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, সুধীন দাশগুপ্ত, সতীনাথ মুখোপাধ্যায় এবং মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের মতো সুরসাধকদের সুরবিন্যাসে শ্যামল গুপ্তের গীতিধারা নতুন প্রাণ পেয়েছিল।

শ্যামল গুপ্ত রচিত কালজয়ী গানসমূহের নির্বাচিত তালিকা

শ্যামল গুপ্তের লেখা কিছু অত্যন্ত জনপ্রিয় গান, গায়ক ও সুরকারের বিস্তারিত তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
গানের শিরোনামকণ্ঠশিল্পীসুরকারধরণ / চলচ্চিত্র
গানে মোর কোন ইন্দ্রধনুসন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়সলিল চৌধুরীআধুনিক গান
এ শুধু গানের দিনসন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়হেমন্ত মুখোপাধ্যায়আধুনিক গান
মায়াবতী মেঘে এলো রাত্তিসন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়সলিল চৌধুরীআধুনিক গান
কে তুমি আমারে ডাকোসন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়রবীন চট্টোপাধ্যায়চলচ্চিত্র: বধূবরণ
ও বকো বকো কুম্সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ছায়াছবি
এবার আমার সময় হলো যাবারসন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়সলিল চৌধুরীআধ্যাত্মিক / আধুনিক
তুমি না হয় রহিতে পাশেসন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়শ্যামল গুপ্ত/রবীন চ্যাটার্জীআধুনিক রাগাশ্রয়ী
ঝড় উঠেছে বাউল বাতাসমানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়রাগাশ্রয়ী আধুনিক
যদি ভুল করেই আমাকে মনে পড়ে যায়শ্যামল মিত্রশ্যামল মিত্রআধুনিক রোমান্টিক
শোনো কোনো এক দিনআরতি মুখোপাধ্যায়সুধীন দাশগুপ্তআধুনিক গান
এ আনন্দ এই ছন্দপ্রসেসড/বিভিন্ন শিল্পীতপন সিংহচলচ্চিত্র: হারমোনিয়াম

ব্যক্তিগত জীবন ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে সুরের বন্ধন

১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে শ্যামল গুপ্ত বাংলা গানের প্রখ্যাত সুরসম্রাজ্ঞী গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়-এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই বিবাহ কেবল দুটি মানুষের জীবনকে যুক্ত করেনি, বরং বাংলা সংগীতের দুই দিকপাল প্রতিভা এক ছাদের নিচে এসে এক অভূতপূর্ব সৃজনশীল পরিবেশের জন্ম দিয়েছিলেন।
                  +-----------------------------------+
                  |   শ্যামল গুপ্ত ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়  |
                  |     (সঙ্গীত ও জীবনের যুগলবন্দী)    |
                  +-----------------------------------+
                                    │
         +--------------------------+--------------------------+
         │                                                     │
         ▼                                                     ▼
 [শ্যামল গুপ্তের কাব্যময় শব্দচয়ন]               [সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের অতুলনীয় গায়কি]
         │                                                     │
         +--------------------------+--------------------------+
                                    │
                                    ▼
                 [বাংলা আধুনিক গানের অন্যতম সেরা কালজয়ী ধারা]
সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের একক অ্যালবামের অজস্র রোমান্টিক ও কাব্যময় গান শ্যামল গুপ্তেরই লেখা। স্বামীর রচিত কাব্যিক ভাব ও সুরের ব্যঞ্জনাকে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় তাঁর জাদুকরী গায়কি দিয়ে শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন পাইয়ে দিয়েছিলেন।

পুরস্কার, স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন

শ্যামল গুপ্ত তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে অসংখ্য সম্মাননা লাভ করেছেন।
  • পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার পুরস্কার: বিখ্যাত চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব তপন সিংহ পরিচালিত ‘হারমোনিয়াম’ চলচ্চিত্রে অসামান্য গীতিকবিতা ও গান রচনার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক শ্রেষ্ঠ গীতিকারের পুরস্কার লাভ করেন।
  • সঙ্গীত বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন: সুরকার ও সঙ্গীত গবেষকদের মতে, শ্যামল গুপ্তের গানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল—কঠিন শব্দ ব্যবহার না করেও বাঙালির চিরায়ত প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিক ভাবকে অতি প্রাঞ্জলভাবে ফুটিয়ে তোলা। রবীন্দ্রোত্তর বাংলা গীতসাহিত্যে গৌরীকিশোর ঘোষ, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশাপাশি শ্যামল গুপ্তের নামও সমমর্যাদায় উচ্চারিত হয়।

মহাপ্রয়াণ ও কালজয়ী উত্তরাধিকার

২০১০ খ্রিস্টাব্দের ২৮ জুলাই ৮৮ বছর বয়সে কলকাতায় এই কিংবদন্তি গীতিকার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে বাংলা গানের স্বর্ণযুগের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পাতন ঘটে।
শ্যামল গুপ্ত চলে গেলেও তাঁর রচিত হাজার হাজার গান আজ বাংলা ভাষার আনাচে-কানাচে, রেডিওর ফ্রিকোয়েন্সিতে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এবং সাধারণ মানুষের গুনগুন করে গাওয়া সুরে জীবন্ত হয়ে আছে। বাংলা গানের আধুনিক কাব্যরূপায়ণে শ্যামল গুপ্ত যে মাইলফলক স্থাপন করে গেছেন, তা আগামী দিনের গান রচিয়তাদের জন্য চিরকাল এক বাতিঘর হিসেবে কাজ করবে।

তথ্যসূত্র ও সহায়ক গ্রন্থাবলী

১. গুপ্ত, শ্যামল (১৯৬৩)। আধুনিক গান (গীত সংকলন)। কলকাতা।
২. মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা (২০০১)। গান সাগরে জোয়ার ভাঁটা (আত্মজীবনী)। আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা।
৩. ভারতীয় ছায়াছবি ও সংগীত আর্কাইভ (পশ্চিমবঙ্গ সরকার)। বাংলা চলচ্চিত্রের গান ও গীতিকারদের ইতিহাস (১৯৫০-১৯৮০)।
৪. আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র সংরক্ষণাগার (Archive): রম্যগীতি ও সুরসাধক শ্যামল গুপ্ত সম্পর্কিত নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকার।
Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

সম্পাদক ও প্রকাশক : সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর।

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।