সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ই জুলাই ২০২৬, ২:২৯ পিএম

উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় ও আধুনিক সংগীতের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র, সুরসম্রাজ্ঞী মিতালী মুখার্জীর শুভ জন্মদিন। ১৯ জুলাই ময়মনসিংহের এক সম্ভ্রান্ত, শিক্ষিত ও প্রগতিশীল সংস্কৃতিমনা পরিবারে এই গুণী শিল্পীর জন্ম হয়। তাঁর পিতা অমূল্য কুমার মুখার্জী ছিলেন তৎকালীন পুলিশের ডিআইজি এবং মাতা কল্যাণী মুখার্জী ছিলেন শিল্প-সংস্কৃতির পরম অনুরাগী। পারিবারিক পরিমণ্ডলেই শৈশবে মিতালী মুখার্জীর সংগীতের হাতেখড়ি এবং সুরের প্রতি গভীর অনুরাগের সৃষ্টি হয়।
পরবর্তীকালে তিনি ওস্তাদ পিটার মিঠুন দে-র কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীতের প্রাতিষ্ঠানিক তালিম গ্রহণ করেন। সংগীতের প্রতি প্রবল টান থেকে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ভারতে যান এবং বরোদার বিখ্যাত মহারাজা সায়াজিরাও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংগীত বিষয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। শাস্ত্রীয় সংগীতের শুদ্ধতা, আধুনিক গানের সাবলীল আবেগ এবং গজলের মায়াবী মাধুর্যের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে তাঁর কণ্ঠে, যা তাঁকে উপমহাদেশের সংগীতাঙ্গনে এক অনন্য ও বহুমাত্রিক শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মিতালী মুখার্জীর সংগীতজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো ১৯৮২ সালে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘দুই পয়সার আলতা’ চলচ্চিত্রের গান। আলাউদ্দিন আলীর সুর ও সংগীতে “এই দুনিয়া এখন তো আর সেই দুনিয়া নাই” গানটি গেয়ে তিনি শ্রোতাকূলকে মন্ত্রমুগ্ধ করেন। এই একটি গানই তাঁকে বাংলা সংগীতের ইতিহাসে অমরত্ব এনে দেয়।
এই কালজয়ী গানটির জন্য ১৯৮২ সালে তিনি শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পী হিসেবে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’-এ ভূষিত হন। বাংলা গানের পাশাপাশি তিনি হিন্দি, পাঞ্জাবি, গুজরাটি, তামিলসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় কণ্ঠ দিয়ে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৫ সালের ৯ অক্টোবর তিনি ঐতিহ্যবাহী সিটি ব্যাংক আয়োজিত “গানে গানে গুণীজন সংবর্ধনা” লাভ করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে মিতালী মুখার্জী ভারতবর্ষের প্রখ্যাত গজলসম্রাট ভূপেন্দ্র সিংহের সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। ১৯৮২ সাল থেকে এই সংগীতশিল্পী দম্পতি মুম্বইয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এই জুটি যৌথ সংগীত পরিবেশনার মাধ্যমে উপমহাদেশের সংগীতপ্রেমীদের হৃদয় জয় করে রেখেছিলেন। তবে ২০২২ সালের ১৮ জুলাই—মিতালী মুখার্জীর জন্মদিনের ঠিক একদিন আগে—ভূপেন্দ্র সিংহ পরলোকগমন করেন। জীবনসঙ্গী ও সহশিল্পীর এই চিরবিদায় তাঁর জীবনে এক গভীর ও অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করে।
দীর্ঘ ২৮ বছর পর মিতালী মুখার্জী যখন তাঁর প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন, তখন তা রূপ নিয়েছিল শিকড়ে ফেরার এক আবেগঘন অধ্যায়ে। দেশের মানুষ তাঁকে বরণ করে নিয়েছিল অকৃত্রিম ভালোবাসা ও পরম শ্রদ্ধায়। তিনি কেবল একজন কণ্ঠশিল্পী নন, বরং ভারত ও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
| বিষয়/ক্ষেত্র | বিবরণ ও তথ্য |
| নাম | মিতালী মুখার্জী |
| জন্মদিন | ১৯ জুলাই |
| জন্মস্থান | ময়মনসিংহ, বাংলাদেশ |
| পিতা | অমূল্য কুমার মুখার্জী (তৎকালীন পুলিশের ডিআইজি) |
| মাতা | কল্যাণী মুখার্জী |
| প্রথম গুরু | পিটার মিঠুন দে (উচ্চাঙ্গ সংগীত) |
| উচ্চশিক্ষা | মহারাজা সায়াজিরাও বিশ্ববিদ্যালয়, বরোদা, ভারত |
| দক্ষতা | শাস্ত্রীয় সংগীত, আধুনিক বাংলা গান ও গজল |
| ভাষাগত দক্ষতা | বাংলা, হিন্দি, পাঞ্জাবি, গুজরাটি, তামিল ইত্যাদি |
| স্বামীর নাম | ভূপেন্দ্র সিংহ (প্রখ্যাত গজলশিল্পী) |
| বিয়ের পর স্থায়ী নিবাস | মুম্বই, ভারত (১৯৮২ সাল থেকে) |
| স্বামীর প্রয়াণ | ১৮ জুলাই, ২০২২ |
| বিখ্যাত গান | “এই দুনিয়া এখন তো আর সেই দুনিয়া নাই” |
| চলচ্চিত্র | দুই পয়সার আলতা (১৯৮২) |
| জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার | ১৯৮২ সাল (শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পী) |
| গুণীজন সংবর্ধনা | সিটি ব্যাংক আয়োজিত (৯ অক্টোবর, ২০১৫) |
সংগীতের সীমানা পেরিয়ে মিতালী মুখার্জীর কণ্ঠ আজও নতুন ও পুরোনো প্রজন্মের শ্রোতাদের সমানভাবে আলোড়িত করে। তাঁর সুরের সাধনা ও অমলিন শিল্পীসত্তা বাংলা গানের ভুবনকে সমৃদ্ধ করেছে। জন্মদিনের এই বিশেষ ক্ষণে সুরসম্রাজ্ঞী মিতালী মুখার্জীর প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা, সুস্থতা ও দীর্ঘায়ুর নিরন্তর শুভকামনা।
মন্তব্য