লোকসংগীতের মুকুটহীন সম্রাট: দোতারার জাদুকর কানাইলাল শীলের মহাপ্রয়াণ দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা

বাংলার মাটির গন্ধ, নদীর কলতান আর গ্রামীণ জীবনের চিরায়ত সুখ-দুঃখকে যিনি চার তারের একটি সাধারণ বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছিলেন, তিনি কানাইলাল শীল। লোকসংগীতের রসিক মহলে যিনি “দোতারার যাদুকর” নামে সমধিক সমাদৃত। আজ ২০ জুলাই, লোকসংস্কৃতির এই মহান সুরসাধক, সংগ্রাহক ও সংগীতস্রষ্টার প্রয়াণ দিবস। ১৯৭৪ সালের আজকের এই দিনে ঢাকায় অবসান ঘটেছিল তাঁর বর্ণিল ও সাধনাময় জীবনের। তাঁর প্রয়াণ তিথিতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করে তাঁর গৌরবময় জীবন ও সৃষ্টির প্রতি আলোকপাত করা হলো।

দারিদ্র্যের কশাঘাত ও সুরের আঙিনায় আত্মপ্রকাশ

১৮৯৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা উপজেলার কইরাল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কানাইলাল শীল। তাঁর পিতা আনন্দচন্দ্র শীল ছিলেন একজন সরল স্বভাবের মানুষ এবং মাতা সৌদামিনী শীল ছিলেন গৃহিণী। মাত্র আড়াই বছর বয়সেই কানাইলাল তাঁর পিতাকে হারান। পিতৃবিয়োগের পর চরম আর্থিক অনটন ও বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রাম শুরু হয় তাঁর জীবনে। তবে দারিদ্র্যের সেই তীব্র কশাঘাতও তাঁর ভেতরে লুকিয়ে থাকা সুরের সুপ্ত প্রতিভাকে দমন করতে পারেনি।

শৈশবের অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে মাত্র আট বছর বয়সে তিনি ওস্তাদ বসন্ত কুমার শীলের কাছে বেহালার হাতেখড়ি নেন। এরপর তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে ওস্তাদ মতিলাল তাঁকে বেহালা শিক্ষার পূর্ণাঙ্গ তালিম দেন, যখন কানাইলালের বয়স মাত্র এগারো বছর। বেহালায় পারদর্শী হলেও, পরবর্তীতে গ্রামীণ জনপদের লোকজ সুরের টানে তিনি দোতারা হাতে তুলে নেন। আর এই দোতারাই শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং আত্মপরিচয়ের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

জসীমউদ্দীন ও আব্বাসউদ্দীনের সাথে ঐতিহাসিক মিলন

কানাইলাল শীলের জীবনের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে যায় ফরিদপুরের অম্বিকাপুরে আয়োজিত এক যাত্রাপালার আসরে। সেখানে তাঁর দোতারার মোহনীয় সুর শুনে মুগ্ধ হন পল্লীকবি জসীমউদ্দীন। জসীমউদ্দীন এই ক্ষণজন্মা শিল্পীর ভেতরের সুরের গভীরতা উপলব্ধি করতে পেরে তাঁকে তৎকালীন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র কলকাতায় নিয়ে যান। কলকাতায় পল্লীকবির সূত্র ধরেই কানাইলালের পরিচয় ঘটে লোকসংগীতের প্রবাদপ্রতিম শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদের সাথে। আব্বাসউদ্দীন আহমদের আন্তরিক সান্নিধ্য ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় তিনি তৎকালীন বিশ্বখ্যাত গ্রামোফোন কোম্পানির সাথে যুক্ত হন। শুরু হয় লোকগান রচনা, সুরারোপ এবং তা সংরক্ষণের এক নতুন অধ্যায়।

নজরুল ইসলামের সাহচর্য ও বেতারে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা

কলকাতার ব্যস্ত সাংস্কৃতিক জীবনে কানাইলাল শীল সান্নিধ্য লাভ করেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের। বিদ্রোহী কবির লোকজ ধারার অসংখ্য গানে কানাইলাল শীলের দোতারার সুর এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছিল। নজরুলের গানের ভাবার্থকে দোতারার তারে ফুটিয়ে তুলতে তাঁর জুড়ি ছিল মেলা ভার। এর কিছুদিন পর তিনি ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’র কলকাতা কেন্দ্রে নিয়মিত দোতারাবাদক হিসেবে স্থায়ীভাবে কর্মজীবন শুরু করেন। তাঁর এই বেতার পরিবেশনা বাংলার লোকসংগীতকে তৎকালীন শহুরে শিক্ষিত ও অভিজাত শ্রোতাদের কাছে ভীষণভাবে জনপ্রিয় করে তোলে।

লোকঐতিহ্য সংরক্ষণ ও জাতীয় স্বীকৃতি

কানাইলাল শীল কেবল একজন দক্ষ সুরকার বা বাদক ছিলেন না, তিনি ছিলেন লোকসংস্কৃতির একজন একনিষ্ঠ গবেষক। বাংলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে ঘুরে তিনি বিলুপ্তপ্রায় অসংখ্য লোকগান ও সুর সংগ্রহ করেন, যা বাঙালি সংস্কৃতির এক অমূল্য দলিল। তাঁর এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৭ সালে তাঁকে মরণোত্তর ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে।

এক নজরে কানাইলাল শীলের জীবন ও কর্মের ইতিহাস

লোকসংগীতের এই মহান পথপ্রদর্শকের জীবন ও কর্মের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ নিচে টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:

ক্রমিকঐতিহাসিক বিষয় / মাইলফলকবিস্তারিত বিবরণ
পূর্ণ নামকানাইলাল শীল
জনপ্রিয় উপাধিদোতারার যাদুকর
জন্ম ও স্থান৫ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দ; কইরাল গ্রাম, ফরিদপুর
পারিবারিক পরিচয়পিতা: আনন্দচন্দ্র শীল, মাতা: সৌদামিনী শীল
সংগীতে প্রথম গুরুওস্তাদ বসন্ত কুমার শীল (বেহালা শিক্ষা, বয়স: ৮ বছর)
উচ্চতর সংগীত শিক্ষাওস্তাদ মতিলাল (বেহালার পূর্ণাঙ্গ তালিম, বয়স: ১১ বছর)
প্রধান বাদ্যযন্ত্রদোতারা (যার মাধ্যমে বিশ্বজোড়া খ্যাতি লাভ করেন)
পথপ্রদর্শক ব্যক্তিত্বপল্লীকবি জসীমউদ্দীন (যিনি তাঁকে কলকাতায় নিয়ে যান)
প্রধান সাঙ্গীতিক সহযোগীলোকসম্রাট আব্বাসউদ্দীন আহমদ
১০বিশিষ্ট সংযোগজাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গানে দোতারাবাদন
১১প্রাতিষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রঅল ইন্ডিয়া রেডিও (কলকাতা কেন্দ্র) ও গ্রামোফোন কোম্পানি
১২রাষ্ট্রীয় সম্মাননাএকুশে পদক (১৯৮৭ সালে, মরণোত্তর)
১৩জীবনাবসান২০ জুলাই, ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দ; ঢাকা, বাংলাদেশ

সুরের অমরত্বে কানাইলাল শীল

১৯৭৪ সালের ২০ জুলাই ঢাকার মাটিতে এই সুরসাধক শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করলেও, সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে তিনি চিরকাল অমর হয়ে আছেন। দোতারার প্রতিটি টংকার আর লোকগানের প্রতিটি ভাঁজে আজও যেন অনুরণিত হয় তাঁরই স্পর্শ। বর্তমান প্রজন্মের সংগীতশিল্পীদের জন্য কানাইলাল শীলের জীবন ও সাধনা এক পরম অনুকরণীয় আদর্শ। তাঁর প্রয়াণ দিবসে বাংলার এই মহান কৃতি সন্তানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

Tags :

শরীফ আল নাহিয়ান | উপ-সম্পাদক | সঙ্গীত গুরুকুল

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।