জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস, ইসলামপ্রেম ও মানবতা নিয়ে সুশীল সমাজের উদ্দেশে একটি দীর্ঘ বার্তা দিয়েছেন। মুসলমান হিসেবে ইসলামের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা, ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মানবসেবার সঙ্গে ধর্মীয় বিশ্বাসের সম্পর্ক নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন তিনি। রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা লেখেন এই কণ্ঠশিল্পী।
পোস্টের শুরুতে নিজের পরিচয় তুলে ধরে কনকচাঁপা লেখেন, তিনি একজন বাংলাদেশি, সচেতন নাগরিক এবং গর্বিত মুসলমান। সংগীতজগতে তাঁর নিজস্ব পরিচিতি রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে অসংখ্য ভক্ত, যাঁদের তিনি নিজের ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখেন। ভক্তদের প্রতি নিজের ভালোবাসা ও সম্মানের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
নিজের পারিবারিক পরিচয় জানাতে গিয়ে কনকচাঁপা উল্লেখ করেন, তাঁর বাবা আজিজুল হক মোর্শেদ বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপপরিচালক ছিলেন। তিনি ছিলেন সৌখিন সব্যসাচী মানুষ। তাঁর মা মোমেনা জাহান একজন ইসলামি চিন্তাবিদ ও সমাজসেবক। তাঁদের আদি নিবাস সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে হলেও কনকচাঁপার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। তাঁর স্বামী মইনুল ইসলাম খান একজন সুরকার ও সংগীত পরিচালক। নিজের পড়াশোনার আগ্রহের কথাও জানিয়েছেন তিনি। বয়স বাড়লেও শিক্ষার্থীর মতো নিয়মিত পড়াশোনা করার অভ্যাস ধরে রেখেছেন বলে জানান এই শিল্পী।
ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রসঙ্গে কনকচাঁপা বলেন, তিনি নিজের ধর্মের মৌলিক বিষয়গুলোতে গভীরভাবে বিশ্বাস করেন। অন্য সব ধর্মের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা থাকলেও ইসলাম, আল্লাহ এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি তাঁর ভালোবাসা সবচেয়ে বেশি। নিজের বিশ্বাস প্রকাশ করতে তাঁর কোনো সংকোচ বা দ্বিধা নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
কনকচাঁপার ভাষ্য, তিনি নিয়মিত আল্লাহকে স্মরণ করতে ভালোবাসেন। মৃত্যুর বিষয়টিও তাঁর চিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। তাঁর বিশ্বাস, আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের পথে মৃত্যুর অনিবার্য বাস্তবতা রয়েছে। একই সঙ্গে কেয়ামত, হাশরের ময়দান, আল্লাহর বিচার এবং পরকালের অনন্ত শান্তিতে তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে। পৃথিবীর মানুষ ও প্রাণের প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি বেহেশতের আনন্দময় জীবনের প্রত্যাশাও তাঁকে আশাবাদী করে তোলে। এসব বিশ্বাস নিয়ে তাঁর কোনো লজ্জাবোধ নেই বলে স্পষ্ট করেছেন তিনি।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং মহানবীকে নিয়ে বিদ্রূপের বিষয়েও নিজের মতামত প্রকাশ করেন এই সংগীতশিল্পী। তাঁর মতে, যারা মহানবীকে ব্যঙ্গ করে, তারা বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করলে এমন কাজ করত না। তাঁর বিশ্বাস, এ ধরনের আচরণ ইসলামের মর্যাদা বা মহানবীর সম্মান ক্ষুণ্ন করতে পারে না। একইভাবে ইসলামের শিষ্টাচার ও ধর্মীয় রীতিনীতি নিয়ে কটাক্ষকারীদের কথাকেও তিনি গুরুত্ব দিতে চান না।
পড়াশোনা ও জ্ঞান অর্জনের প্রসঙ্গে কনকচাঁপা জানান, পাঠ্যবইয়ের বাইরেও তিনি নিয়মিত নানা ধরনের বই পড়েন। তবে পবিত্র আল-কোরআন তাঁর কাছে বিশেষ বিস্ময় ও আগ্রহের বিষয়। তিনি আরবিতে কোরআন পড়েন, পাশাপাশি বাংলায় এর অর্থ ও অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বোঝার চেষ্টা করেন। তাঁর কথায়, কোরআন পড়া ও এর অর্থ জানার আগ্রহ তাঁর মধ্যে প্রতিনিয়ত কাজ করে।
মানবতা ও ধর্মের সম্পর্ক নিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কনকচাঁপা বলেন, মানুষের মধ্যে মানবিক গুণাবলি থাকা অবশ্যই প্রয়োজন। তবে ধর্মীয় বিশ্বাস বজায় রেখে মানবসেবায় যুক্ত হতেও কোনো সমস্যা দেখেন না তিনি। তাঁর মতে, মানবতার কথা বলে ধর্মীয় বিধিনিষেধ এড়িয়ে চলাকে তিনি সমর্থন করেন না। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করা—দুটিকে তিনি পরস্পরবিরোধী বলে মনে করেন না।
পোস্টের শেষাংশে কনকচাঁপা বলেন, সব ধর্মের মূল শিক্ষার মধ্যে শান্তির কথা রয়েছে। তবে মানবতার জন্য কাজ করতে হলে সুশীল সমাজের অংশ হতে হবে এবং সুশীল হতে গেলে ধর্মীয় বিশ্বাস অস্বীকার করতে হবে—এমন ধারণার সঙ্গে তিনি একমত নন। তাঁর মতে, মানবিক মূল্যবোধ ধারণ করার জন্য নিজের ধর্মীয় পরিচয় বা বিশ্বাস থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
নিজের পরিবারের প্রসঙ্গ টেনে এই শিল্পী আরও বলেন, অন্য পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা বা সামাজিক আভিজাত্য বেশি হতে পারে। কিন্তু তাঁর নিজের পরিবারের অভিভাবকদের নির্ধারণ করে দেওয়া নিয়মকানুন তাঁর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কনকচাঁপা স্পষ্টভাবে জানান, কেবল মুসলমানের ঘরে জন্মেছেন বলেই নয়, বরং নিজের অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাস ও ভালোবাসা থেকেই তিনি ইসলামকে ধারণ করেছেন। পোস্টের শেষে আল্লাহর কাছে সবার মঙ্গল কামনা করেন তিনি। একই সঙ্গে নিজের ও পরিবারের জন্য সবার কাছে দোয়া চান।
কনকচাঁপার এই বক্তব্যে ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাস, ধর্মীয় অনুশাসন, মানবসেবা এবং সুশীল সমাজের ভূমিকা নিয়ে তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছে। ধর্মীয় পরিচয় ও মানবিক মূল্যবোধকে পাশাপাশি ধারণ করার বিষয়ে নিজের অবস্থান প্রকাশের পাশাপাশি তিনি নিজের বিশ্বাস নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার স্বাধীনতার কথাও তুলে ধরেছেন।














