সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ই অক্টোবর ২০২২, ৬:২৮ পিএম

বাংলা আধুনিক গানের ইতিহাসে অনেক নাম উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা, কিন্তু কিছু নাম নিঃশব্দ অথচ গভীর আলোয় দীপ্ত। অনল চট্টোপাধ্যায় সেই শ্রেণির মানুষ — এক নীরব নির্মাতা, যিনি সৃষ্টিশীলতা, সাহিত্য ও সঙ্গীতের মেলবন্ধনে রেখে গেছেন এক অনন্য ছাপ।
১৯৪৩ সালের দেশব্যাপী দুর্ভিক্ষে ক্ষত-বিক্ষত বাংলার যন্ত্রণাকে তিনি শব্দে প্রকাশ করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত গান “আজ বাংলার বুকে দারুণ হাহাকার”–এর মাধ্যমে। এই গান শুধু একটি সংগীত নয়, এটি হয়ে উঠেছিল সময়ের সাক্ষ্য, সমাজচেতনার এক কাব্যিক প্রতিবেদন।
Table of Contents
অনল চট্টোপাধ্যায় ছিলেন মূলত সাহিত্যপ্রেমী মানুষ। তাঁর লেখার ঝোঁক ছোটবেলা থেকেই। ১৯৪৬ সালে কলকাতার প্রসিদ্ধ প্রকাশনা ‘দেব সাহিত্য কুটির’ থেকে তাঁর লেখা কাহিনিসংকলন ‘রত্নতৃষ্ণা কাহিনী’ প্রকাশিত হয়। এটি তাঁর সাহিত্যজীবনের প্রথম বড় পদক্ষেপ। তাঁর ভাষা ছিল সহজ অথচ আবেগপ্রবণ। সমাজ, সাহিত্য ও রাজনীতির ক্রান্তিলগ্নে থাকা এক তরুণ লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি এ বইয়ে প্রতিফলিত হয় স্পষ্টভাবে।
১৯৪৬ সালে অনল চট্টোপাধ্যায় যুক্ত হন ভারতীয় গণনাট্য সংঘে (IPTA – Indian People’s Theatre Association)। এই সংস্থাই ছিল বাংলার সংস্কৃতি ও সমাজচেতনার এক প্রাণকেন্দ্র, যেখানে শিল্পীরা একত্রিত হয়েছিলেন মানুষের কথা বলার জন্য। এই পরিপ্রেক্ষিতেই তাঁর পরিচয় হয় সলিল চৌধুরী-র সঙ্গে। সলিলের সহকারী ও ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে অনল বহুকাজে অংশ নেন—
তাঁদের যৌথ প্রয়াসে তৈরি হয়েছিল অনেক উল্লেখযোগ্য সুররচনা যেমন –
‘পাশের বাড়ি’, ‘আজ সন্ধ্যায়’, ‘মহিলা মহল’, ‘ভোর হয়ে এল’, ‘তাসের কেল্লা’, ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ ইত্যাদি ছবির গান।
এই সময়ের কাজেই অনল নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন নির্ভরযোগ্য সহলেখক ও সহসুরকার হিসেবে।
সুরস্রষ্টা হিসেবেও অনল চট্টোপাধ্যায় ছিলেন স্বকীয়। তাঁর গানের সুরে ছিল বাংলার গ্রামীণ লোকগীতি, রবীন্দ্রনাথের কাব্যরস, আর শহুরে আধুনিকতার সূক্ষ্ম মিশ্রণ।
ভোজপুরী সিনেমা “গঙ্গা মাইয়া তোহে পিয়রি চড়াইবো”–এর জনপ্রিয় সুর থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি বাংলা ভাষায় দুটি গান সুর করেন, গেয়েছিলেন প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়—
উভয় গানই শ্রোতাদের হৃদয় জয় করে নেয়, আর প্রতিমার কণ্ঠে তার অনুবাদী আবেগ পায় নতুন মাত্রা।
অনলের লেখা ও সুরে অনেক গানই আজও স্মরণীয় হয়ে আছে—
এছাড়া, ‘ছলকে পড়ে কলকে ফুলে’ গানে তিনি লোকগীতি ও ঠুংরির অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটান।
এই গান শুনে পণ্ডিত রবিশঙ্কর নিজে অনলের সুরসাধনার প্রসংসা করেছিলেন, যা তাঁর জীবনের এক বিশেষ স্বীকৃতি হয়ে থাকে।
অনল চট্টোপাধ্যায় কেবল গীতিকার বা সুরকার নন— তিনি ছিলেন একজন সম্পূর্ণ সঙ্গীত পরিচালকও।
১৯৫৪ সালে তাঁর প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয় হিজ মাস্টার্স ভয়েস (HMV) থেকে।
পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৫৫ সালে, তিনি মৃণাল সেন পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘রাতভোর’–এর জন্য সঙ্গীত পরিচালনা করেন।
তাঁর সেই ছবির উল্লেখযোগ্য গানগুলো হলো—
এই গানগুলোতেই দেখা যায় তাঁর সুরের বৈচিত্র্য— কখনও ব্যথাভরা, কখনও আশাবাদী, কখনও যেন নিঃশব্দ আত্মকথন।
চলচ্চিত্রের বাইরেও অনল চট্টোপাধ্যায় কাজ করেছেন যাত্রাপালা, লোকগীতি ও মঞ্চসঙ্গীত–এর জগতে। তাঁর সুরে লোকঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক মেলবন্ধন দেখা যায়। তিনি বিশ্বাস করতেন— সঙ্গীত কেবল বিনোদনের জন্য নয়, সমাজের চেতনাকে স্পর্শ করার এক মাধ্যম।
অনল চট্টোপাধ্যায় হয়তো আজ খুব বেশি আলোচিত নাম নন, কিন্তু তাঁর অবদান বাংলা সংগীতচর্চার ইতিহাসে অনস্বীকার্য। তিনি ছিলেন এমন এক স্রষ্টা, যিনি জনপ্রিয়তার জন্য নয়, গানে সত্য ও সৌন্দর্যের সন্ধানেই আজীবন প্রয়াসী ছিলেন। তাঁর লেখায় ছিল সাহিত্যরস, আর সুরে ছিল হৃদয়ের কম্পন। সলিল চৌধুরীর মতো ব্যতিক্রমী স্রষ্টার সহপথিক হওয়া সত্ত্বেও, অনল নিজের নীরবে গড়ে তুলেছিলেন এক নিজস্ব সঙ্গীতভুবন।

বাংলা গানের ইতিহাসে অনল চট্টোপাধ্যায়ের নাম উচ্চারিত হলে আমরা স্মরণ করি এক আর্ত মানবিক কণ্ঠস্বরকে— যিনি সময়ের বুকে এক সততার ছাপ রেখে গেছেন, যাঁর সুরের ভেতর জড়িয়ে আছে ইতিহাস, প্রেম, বেদনা ও সমাজের সত্যি ছোঁয়া। তাঁর গান আজও প্রমাণ করে — একজন প্রকৃত গীতিকার কেবল গান লেখেন না, তিনি সময়কে অনুভব করান।
মন্তব্য