দীর্ঘদিন ধরে বড় কনসার্ট ও বাণিজ্যিক সংগীতানুষ্ঠানে দেখা যাচ্ছে না সংগীতশিল্পী আনুশেহ আনাদিলকে। তাঁর এই অনুপস্থিতি নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও জল্পনা তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, আসক্তির কারণে সংগীতজগৎ থেকে দূরে সরে গেছেন তিনি, আবার কারও ধারণা, আগের মতো গান গাওয়ার সক্ষমতা হয়তো আর নেই তাঁর। তবে এসব ধারণার বিপরীতে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন এই শিল্পী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওতে তিনি জানিয়েছেন, আসক্তির কারণে নয়, বরং নিজের জীবনযাপন সহজ করা এবং শারীরিক সুস্থতাকে অগ্রাধিকার দিতেই তিনি কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ভিডিওতে আনুশেহ বলেন, ‘দূরে বসে আমাকে নিয়ে কোনো কিছু ধরে নেবেন না। এমন বিচার করবেন না যে আমি আসক্তির কারণে গান ছেড়ে দিয়েছি কিংবা এখন আর গান গাইতে পারি না। আমি এখনো ঠিকঠাক গান গাইতে সক্ষম। কিছুক্ষণ আগেই এই নারীদের জন্য গান গেয়েছি।’
তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, সংগীতের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা কিংবা গান গাওয়ার সামর্থ্য না থাকা তাঁর মঞ্চ থেকে দূরে থাকার কারণ নয়। বরং বড় আয়োজন ও বাণিজ্যিক পরিবেশনায় অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তটি তিনি নিজের জীবনযাপনের সঙ্গে মিল রেখেই নিয়েছেন।
এ বিষয়ে আনুশেহ বলেন, ‘আমি শুধু বড় কনসার্টে পারফর্ম করি না কিংবা বাণিজ্যিকভাবে গান গাই না। নিজের জীবনকে একটু সহজ করার জন্য হয়তো কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
শ্রবণসমস্যা ও টিনিটাসের সঙ্গে লড়াই
আনুশেহর সংগীতজগৎ থেকে দূরে থাকার পেছনে তাঁর শারীরিক অবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানিয়েছিলেন, ধীরে ধীরে তাঁর শ্রবণক্ষমতা কমে আসছে। একই সঙ্গে টিনিটাস নামের একটি সমস্যায় ভুগছেন তিনি, যার কারণে উচ্চ শব্দ সহ্য করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
টিনিটাস এমন একটি শারীরিক অবস্থা, যেখানে বাইরে কোনো শব্দের উৎস না থাকলেও কানে শোঁ শোঁ, ভোঁ ভোঁ, ঝিঁঝিঁ কিংবা ঘণ্টাধ্বনির মতো শব্দ শোনা যেতে পারে। কারও ক্ষেত্রে এই সমস্যা সাময়িক হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী হয়। শব্দের তীব্রতা ও প্রকৃতি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। অনেকের স্বাভাবিক জীবনযাপন, ঘুম ও মনোযোগের ওপরও এর প্রভাব পড়ে।
আনুশেহর বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁর কানের ভেতরে ক্রমাগত জোরে শব্দ হওয়ার অনুভূতি তৈরি হয়। এতে শ্রবণক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন। উচ্চ শব্দের সংস্পর্শে এলে কানে ব্যথাও অনুভব করেন তিনি। একজন সংগীতশিল্পীর জন্য এ ধরনের সমস্যা বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং। কারণ গান গাওয়ার পাশাপাশি সংগীত শোনা, বাদ্যযন্ত্রের শব্দ বোঝা এবং মঞ্চের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া তাঁর পেশার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
চিকিৎসকের পরামর্শে শুরুতে হিয়ারিং এইড বা শ্রবণসহায়ক যন্ত্র ব্যবহার করেছিলেন আনুশেহ। কিন্তু তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সেটি ব্যবহারের পর টিনিটাসের উপসর্গ আরও প্রকট হয়ে ওঠে। পরে তিনি যন্ত্রটি ব্যবহার বন্ধ করে দেন। তবে তাঁর ক্ষেত্রে শ্রবণসহায়ক যন্ত্রের ব্যবহার কেন অস্বস্তি বাড়িয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত চিকিৎসাবিষয়ক তথ্য প্রকাশিত হয়নি। তাই তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সবার জন্য একই ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
কোলাহল থেকে দূরে শান্ত জীবন বেছে নিয়েছেন
শারীরিক অসুবিধার কারণে আনুশেহ এখন শহরের ব্যস্ততা ও কোলাহল থেকে দূরে তুলনামূলক শান্ত পরিবেশে থাকতে পছন্দ করেন। তাঁর জীবনযাপনে নিরিবিলি পরিবেশের গুরুত্ব বেড়েছে। বড় কনসার্ট, উচ্চ শব্দের সংগীতানুষ্ঠান কিংবা বাণিজ্যিক পরিবেশনার ব্যস্ত সূচির বদলে নিজের শারীরিক স্বস্তি ও ব্যক্তিগত জীবনকে প্রাধান্য দিচ্ছেন তিনি।
সংগীতশিল্পীদের পেশাগত জীবনে মঞ্চে নিয়মিত উপস্থিতি, শ্রোতাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নতুন কাজ প্রকাশের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। তবে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত পরিস্থিতি অনেক সময় শিল্পীদের কাজের ধরন ও সময়সূচিতে পরিবর্তন আনতে বাধ্য করে। আনুশেহর ক্ষেত্রেও বড় আয়োজন থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্তকে তাঁর নিজের ভাষ্য ও শারীরিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষ করে টিনিটাস ও শ্রবণসমস্যার মতো পরিস্থিতিতে শব্দের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলা গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ শব্দের পরিবেশে দীর্ঘ সময় অবস্থান শ্রবণস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তবে টিনিটাসের কারণ, উপসর্গ ও চিকিৎসা একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হওয়ায় ব্যক্তিভিত্তিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।
আনুশেহর সাম্প্রতিক বক্তব্যে একটি বিষয় পরিষ্কার—বড় মঞ্চে নিয়মিত দেখা না যাওয়াকে তাঁর সংগীতচর্চার সমাপ্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। তিনি নিজেই জানিয়েছেন, গান গাওয়ার সক্ষমতা তাঁর রয়েছে এবং সম্প্রতি তিনি গানও গেয়েছেন। তাঁর অনুপস্থিতির কারণ নিয়ে অনুমাননির্ভর মন্তব্যের পরিবর্তে তাঁর বক্তব্য ও স্বাস্থ্যগত বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বানই জানিয়েছেন এই শিল্পী।
নিজের জীবনকে সহজ করা, শারীরিক স্বস্তি বজায় রাখা এবং পছন্দমতো পরিবেশে থাকা—এই সিদ্ধান্তগুলোকে তিনি ব্যক্তিগত পছন্দ হিসেবেই তুলে ধরেছেন। ফলে আনুশেহর সংগীতজীবনের বর্তমান পর্যায়কে কেবল মঞ্চে অনুপস্থিতির মধ্য দিয়ে বিচার না করে তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা ও পছন্দের আলোকে বোঝাই বেশি যুক্তিসংগত।














