সঙ্গীত গুরুকুল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ই অক্টোবর ২০২২, ২:৩২ পিএম

বাংলাদেশের সঙ্গীত সংস্কৃতির আকাশে আজাদ রহমান এক অনন্য ও প্রাতঃস্মরণীয় নাম। তিনি কেবল চলচ্চিত্রের চেনা সুরকারই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ও খেয়াল গানের প্রথিতযশা সাধক, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক এবং কণ্ঠশিল্পী। তাঁর হাত ধরেই বাংলা চলচ্চিত্রে ও আধুনিক গানে ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিকের এক অভূতপূর্ব ও মেলোডিয়াস মেলবন্ধন ঘটেছিল।
Table of Contents

বাঙালি শ্রোতাদের হৃদয়ে কিছু গানের সুর এমনভাবে গেঁথে থাকে, যা যুগের পর যুগ পেরিয়েও ম্লান হয় না। “জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো”—র মতো কালজয়ী দেশাত্মবোধক গানের সেই চিরন্তন সুর যিনি বুনেছিলেন, তিনি আর কেউ নন, আমাদের সঙ্গীত আকাশের ধ্রুবতারা আজাদ রহমান। চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় গান থেকে শুরু করে জটিল খেয়াল বা ধ্রুপদী সঙ্গীত, সবখানেই তাঁর ছিল রাজকীয় ও সাবলীল বিচরণ। পর্দার আড়ালে থেকে সুরের যে মায়াজাল তিনি বুনেছেন, তা আজও আমাদের সঙ্গীত সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ।
১৯৪৪ সালের ১ জানুয়ারি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় জন্মগ্রহণ করেন আজাদ রহমান। ছোটবেলা থেকেই সুরের প্রতি তাঁর ছিল এক ঈশ্বরদত্ত টান। সঙ্গীতের প্রাতিষ্ঠানিক ও শুদ্ধ পাঠ নিতে তিনি ভর্তি হন ভারতের বিখ্যাত রবীন্দ্র ভারতী কলেজে (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়), সেখান থেকে তিনি খেয়াল গানে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে অনার্স সম্পন্ন করেন।
রবীন্দ্র ভারতীতে পড়ার সময় আজাদ রহমান নিজেকে কেবল একটি নির্দিষ্ট ঘরানায় আটকে রাখেননি। তিনি একাধারে ফোক গান, কীর্তন, ধ্রুপদী সঙ্গীত, খেয়াল, টপ্পা, ঠুমরি, রবীন্দ্র সঙ্গীত, অতুল প্রসাদের গান, দ্বিজেন্দ্রগীতি ও রজনীকান্তের গানের নিবিড় চর্চা করেন। শুধু দেশীয় সঙ্গীতই নয়, পাশ্চাত্যের সুরের প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল অগাধ। আর তাই রবীন্দ্র ভারতীতে থাকাকালীনই একজন খ্রিষ্টান পুরোহিতের কাছ থেকে তিনি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পিয়ানো বাজানো শেখেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষে তিনি পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাংলাদেশে চলে আসেন এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করে তরুণ প্রজন্মের মাঝে সুরের আলো ছড়াতে থাকেন।
আজাদ রহমানের চলচ্চিত্র জীবনের অভিষেক ঘটেছিল ওপার বাংলায়, ১৯৬৩ সালে কলকাতার ‘মিস প্রিয়ংবদা’ চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনার মধ্য দিয়ে। নিজের প্রথম ছবিতেই তিনি বাজিমাত করেন। তাঁর তৈরি মায়াবী সুরে সে সময় কণ্ঠ দিয়েছিলেন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায় এবং প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো কিংবদন্তি শিল্পীরা।
পরবর্তীতে বাংলাদেশে এসে তিনি বাবুল চৌধুরীর ‘আগন্তুক’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে এদেশের সিনেমা জগতে সুরকার হিসেবে পদার্পণ করেন। সত্তরের দশকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে তিনি এক নতুন যুগের সূচনা করেন। সঙ্গীত পরিচালনার পাশাপাশি তাঁর নিজের কণ্ঠে গাওয়া ও সুর করা গানগুলো শ্রোতাদের মাঝে উন্মাদনা তৈরি করেছিল।
চলচ্চিত্রের বাইরেও তাঁর সুর করা “জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো” গানটি বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক গান হিসেবে অমরত্ব লাভ করেছে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অসামান্য ও কালজয়ী অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আজাদ রহমান একাধিকবার দেশের সর্বোচ্চ ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’-এ ভূষিত হন।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি বহু ব্যবসাসফল ও প্রশংসিত চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:
মিস প্রিয়ংবদা, আগন্তুক, রাতের পর দিন, বাদী থেকে বেগম, এপার ওপার, মাস্তান, আগুন, দস্যু বনহুর, মায়ার বাঁধন, অনন্ত প্রেম, যাদুর বাঁশি, মতিমহল, কুয়াশা, ডুমুরের ফুল, দি ফাদার, নতুন বউ, আমার সংসার, মায়ার সংসার, পাগলা রাজা, চাঁদাবাজ, দেশপ্রেমিক ইত্যাদি।
২০২০ সালের ১৬ মে, এক বুক সুর আর কোটি ভক্তের ভালোবাসা পেছনে ফেলে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহান সঙ্গীতসাধক।

আজাদ রহমান কেবল সুর তৈরি করেননি, তিনি বাংলা গানের ব্যাকরণ ও মানকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের মতো কঠিন ধারাকে যেভাবে তিনি সাধারণ শ্রোতাদের মনের মতো করে চলচ্চিত্রের গানে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা এক কথায় অতুলনীয়। তিনি আজ শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি করা গান আর কালজয়ী সুরগুলো আজও প্রতিটি বাঙালির মনে ভক্তি, দেশপ্রেম আর ভালোবাসার আলো জ্বেলে চলেছে। এই ক্ষণজন্মা গুণী শিল্পীর প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।
মন্তব্য