আমাদের বহুত্ববাদের গাইডিং স্টার ফকির লালন সাঁই: কুমারখালীর মাটি, ঐতিহ্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অবিনাশী ধ্রুবতারা

গঙ্গা-কপোতাক্ষ-কালীগঙ্গার পলিবিধৌত আমাদের কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলা কেবল ভূখণ্ডের কোনো প্রশাসনিক সীমানা নয়; এটি বাংলা ও বাঙালির আত্মিক, সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক জাগরণের এক পুণ্যভূমি। আমি কুমারখালীর সন্তান। এই মাটির সোঁদা গন্ধ, এই বাতাসের উদারতা আর এখানকার মানুষের সহজ-সরল জীবনধারার মধ্য দিয়েই আমার বেড়ে ওঠা। নিজের জন্মভূমির শিকড়ের দিকে তাকালে আমি এক অলৌকিক বিশ্বয়বোধে স্তব্ধ হয়ে যাই। কুষ্টিয়াকে বলা হয় বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী, আর সেই সাংস্কৃতিক হৃদপিণ্ডের প্রকম্পিত প্রাণকেন্দ্রটি হলো আমাদের এই কুমারখালী।
ইতিহাসের পানে তাকালে একটি প্রশ্ন বারবার আমার মনে জাগে—ভারতবর্ষের এত শত স্থান, এত এত নদীকূল ও নগরের ভিড়ে কেন ঠিক এই কুমারখালীর মাটিতেই একই সঙ্গে, একই আবহাওয়ায় আবির্ভূত হয়েছিলেন ফকির লালন সাঁই, কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার এবং মীর মোশাররফ হোসেনের মতো যুগান্তকারী মহাপুরুষেরা? এটি কি কেবলই কোনো ঐতিহাসিক আকস্মিকতা? না, মোটেই তা নয়। কুমারখালীর মাটি, হাওয়া আর এখানকার সাধারণ মানুষেরা যুগে যুগে এমন একটি বিরল ও উর্বর সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছিলেন—যেখানে জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যের জয়গান গাওয়া সম্ভব হয়েছিল। বলা চলে, এখানকার মাটি ও মানুষের সমন্বয়ে সেই মহান ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে “ঘটেছিল”।
এমন একটি পুণ্যময় আবহ সৃষ্টি হয়েছিল বলেই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতবর্ষের অসংখ্য কোলাহলময় স্থান ছেড়ে বারবার আমাদের এই কুমারখালীর শিলাইদহে ছুটে এসেছিলেন। পদ্মার বুকে ‘পদ্মা বোটে’ বসে তিনি শান্তির পরশ খুঁজে পেয়েছেন, সৃষ্টি করেছেন সাহিত্যের অজস্র অমূল্য রত্ন। আমাদের এই মাটি, আমাদের এই মানুষগুলো অত্যন্ত বিশেষ ছিলেন—তারা ছিলেন আমাদের গর্বিত পূর্বপুরুষ। আমাদের চরম ভাগ্য যে, আমরা এমন এক মহান ঐতিহ্যবাহী মাটিতে জন্মগ্রহণ করেছি।
কিন্তু আজ যখন চারপাশে বৈষম্য, সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প এবং মৌলবাদী অন্ধকার গ্রাস করতে চায়, তখন আমাদের থমকে দাঁড়াতে হয়। এই যে শতাব্দীপ্রাচীন বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা আমাদের পূর্বপুরুষেরা রক্ত ও সাধনা দিয়ে গড়ে তুলেছেন—কোনো অবস্থাতেই কোনো অপশক্তি বা মৌলবাদী মন্ত্র যেন আমাদের মনকে বিষাক্ত করতে না পারে। কোনো বিভ্রান্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন আমাদের এই অসাম্প্রদায়িক অখণ্ড চেতনায় ফাটল ধরাতে না পারে, সে বিষয়ে আমাদের চরম সজাগ হতে হবে। কারণ, যখনই আমরা জাতীয় জীবনে, নৈতিকতায় কিংবা মানবিকতার পথে দিশেহারা হয়ে পড়ব, যখনই আমরা পথ হারিয়ে ফেলব—তখনই আমাদের ফিরে তাকাতে হবে লালন সাঁইজির দিকে। সাঁইজী আমাদের বহুত্ববাদের ‘গাইডিং স্টার’ বা ‘ধ্রুবতারা’। তিনি আমাদের আলোর পথ দেখাবেন।
আজকের এই শুভ দোলপূর্ণিমা উৎসব ও সাঁইজীর স্মরণোৎসবকে সামনে রেখে আসুন, আমরা আমাদের সেই অনন্য গাইডিং স্টার ফকির লালন সাঁই সম্পর্কে আমাদের জানাশোনা ও চেতনাকে আবার চাঙ্গা করে নিই। নতুন করে চিনে নিই আমাদের সাঁইজীকে, চিনে নিই আমাদের নিজেদের শিকড়কে।
ছেঁউড়িয়ায় লালন সাঁইয়ের সমাধিসৌধ ও বাউল সাধকদের সন্ধ্যার ভক্তি-অর্ঘ্য
ছেঁউড়িয়ায় লালন সাঁইয়ের সমাধিসৌধ ও বাউল সাধকদের সন্ধ্যার ভক্তি-অর্ঘ্য

Table of Contents

১. বহুত্ববাদের ধ্রুবতারা: কেন লালন সাঁই আমাদের ‘গাইডিং স্টার’?

মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংকট হলো বিভাজন। ধর্ম, বর্ণ, জাত, গোত্র ও সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে মানুষকে বিভক্ত করার প্রক্রিয়াটি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। কিন্তু এই কৃত্রিম বিভাজনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী ও করুণাসিক্ত সুরটি উচ্চারিত হয়েছিল আমাদের ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে। ফকির লালন সাঁই কোনো পুঁথিগত প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিধারী দার্শনিক ছিলেন না, কিন্তু তিনি ছিলেন মানুষের আত্মিক মুক্তির সর্বপ্রধান জ্ঞানাবতার।
লালন সাঁইজির দর্শন ছিল অত্যন্ত সরল, কিন্তু গভীরতায় তা সমুদ্রের চেয়েও তলহীন। তিনি মানুষকে চিনেছিলেন কেবলই ‘মানুষ’ হিসেবে। তাঁর বিখ্যাত বাণী:
“সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে। / লালন বলে জাতের কী রূপ দেখলে না এই নজরে।।”
এই একটিমাত্র সত্য উচ্চারণ বাংলা সাহিত্যের সমস্ত জাতপ্রথা ও সামাজিক বৈষম্যের ভিত্তি কাঁপিয়ে দিয়েছিল। যখন ব্রিটিশ আমলে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক বিভেদ তুঙ্গে উঠছিল, যখন উগ্র ধর্মান্ধতা সমাজকে বিভক্ত করছিল, তখন লালন সাঁই কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া থেকে অসাম্প্রদায়িকতার যে আলোকবর্তিকা জ্বালিয়েছিলেন, তা আজ পর্যন্ত আমাদের পথ দেখাচ্ছে।
লালন সাঁইকে কেবল একজন বাউল সাধক বা কবি হিসেবে দেখলে তাঁর প্রতি অবিচার করা হবে। তিনি ছিলেন আমাদের সমাজ সংস্কারক, আমাদের সর্বজনীন দার্শনিক এবং বহুত্ববাদের পরম আলোকস্তম্ভ। বহুত্ববাদ (Pluralism) বলতে যা বোঝায়—অর্থাৎ সকল ধর্ম, মত, বিশ্বাস ও দর্শনের সুষম সহাবস্থান এবং পরম সহিষ্ণুতা—তার পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন ঘটেছে লালনের জীবন ও সংগীতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই পর্যবেক্ষণ করেছিলেন যে, লালন সাঁই হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের নিগূঢ় সত্তাকে এক সূত্রে গেঁথে এক অপূর্ব সমন্বয় সাধন করেছিলেন।
আজকের এই সহিংস ও দ্বন্দ্বে ভরা বিশ্বে যখন ধর্মের নামে মানুষে-মানুষে কাটাকাটি হয়, তখন লালনের ধাম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—আমাদের আসল পরিচয় “মানবধর্ম”। তিনি আমাদের আত্মজ্ঞানের শিক্ষা দিয়েছেন, ‘মনের মানুষ’-কে চেনার পথ দেখিয়েছেন। তাই যেকোনো সাংস্কৃতিক সংকট বা নৈতিক বিভ্রান্তিতে লালন সাঁইজীই আমাদের একমাত্র ভরসাস্থল—আমাদের ‘গাইডিং স্টার’।

২. কুমারখালীর মাটি ও মহৎ প্রাণের মিলনক্ষেত্র

আমাদের কুমারখালী কেন এত অনন্য? কেন এই মাটি বারবার ইতিহাসের পথপ্রদর্শকদের জন্ম দিয়েছে? কুমারখালীর দিকে তাকালে দেখা যায়, এটি একটি আশ্চর্য বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক উর্বর ক্ষেত্র।
একদিকে ছেঁউড়িয়ায় বসে ফকির লালন সাঁই মানবমুক্তির সুর সাধনা করছেন; অন্যদিকে তাঁরই অতি নিকটে কুমারখালীতে বসে কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার (কাঙ্গাল ফিকিরচাঁদ) ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকার মাধ্যমে সামাজিক অত্যাচার, জমিদারি শোষণের বিরুদ্ধে লেখনী চালাচ্ছেন এবং কাঙ্গাল ফিকিরচাঁদের দল গড়ে বাউল গানের মাধ্যমে গ্রামীণ জনমানুষকে জাগ্রত করছেন। ঠিক একই সময়ে কুমারখালীরই সন্তান মীর মোশাররফ হোসেন ‘বিষাদ-সিন্ধু’র মতো মহাকাব্যিক উপন্যাস এবং সামাজিক নাটক রচনা করে বাংলা সাহিত্যের গতিপথ বদলে দিচ্ছেন।
ভাবলে শিহরিত হতে হয়, কাঙ্গাল হরিনাথ সাঁইজিকে জানতেন, মীর মোশাররফ হোসেন তাঁকে চিনতেন। এই তিন মহাপ্রাণের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও উপস্থিতি কুমারখালীকে একটি অখণ্ড বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক দুর্গে পরিণত করেছিল।
এই মাটির সাংস্কৃতিক শক্তিতে আকৃষ্ট হয়েই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে বছরের পর বছর কাটিয়েছেন। শিলাইদহের পদ্মার বুকে বোটে বসে রবীন্দ্রনাথ যখন লিখছেন, তার মাত্র ছয় মাইল দূরে ছেঁউড়িয়ায় তখন লালন সাঁইজী তাঁর শিষ্যদের নিয়ে ‘অধর মানুষ’ সাধনায় মগ্ন। রবীন্দ্র-গবেষণায় দেখা গেছে, রবীন্দ্রনাথের ‘গীতিমাল্য’, ‘গীতাঞ্জলি’ এবং ‘গোরা’ উপন্যাসের ভেতরের যে আত্মিক দর্শন, তাতে লালনের স্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ লালনের গান শুনেছিলেন, লালনের গান সংগ্রহ করেছিলেন এবং লালনকে আখ্যায়িত করেছিলেন “King of the Bauls” বা বাউলদের মুকুটহীন সম্রাট হিসেবে।
এই যে মহৎ প্রাণগুলোর পারস্পরিক আদান-প্রদান এবং মেলবন্ধন—তা কুমারখালীর মাটি ও বাতাসেরই অবদান। এখানকার মানুষেরা সহনশীলতা, উদারতা ও শিল্পানুরাগকে নিজেদের রক্তে ধারণ করেছিলেন। আমরা এই পূর্বপুরুষদের উত্তরসূরি। এই মাটিতে জন্ম নেওয়া আমাদের জন্য পরম গৌরবের ও ভাগ্যের ব্যাপার।
কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়ায় সংরক্ষিত প্রাচীন পাণ্ডুলিপির একটি পাতা
কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়ায় সংরক্ষিত প্রাচীন পাণ্ডুলিপির একটি পাতা

৩. লালন সাঁইজির জীবনসন্ধান, লোকশ্রুতি ও ঐতিহাসিক সত্য

ফকির লালন সাঁইজির জীবন ইতিহাস যেন এক রহস্যময় ও অলৌকিক গাঁথা। তিনি নিজে কখনো নিজের জাত, কুল, বংশ বা জন্মস্থানের পরিচয় প্রকাশ করেননি। কারণ তিনি জানতেন, জন্মপরিচয় প্রকাশ করলে মানুষ তাকে কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মের বা জাতের খাঁচায় বন্দি করে ফেলবে।

জন্মস্থান ও জীবনের মোড় ঘোরা ঘটনা

লালন গবেষণার পথিকৃৎ শ্রীবসন্ত কুমার পাল মনে করেন, লালন কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানার চাপড়া ইউনিয়নের অন্তর্গত ভাঁড়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তবে তাঁর প্রারম্ভিক জীবন নিয়ে নানাবিধ মতভেদ রয়েছে। ঐতিহাসিক সূত্র ও মুখনিঃসৃত লোকশ্রুতি অনুসারে, লালন তরুণ বয়সে সঙ্গীদের সঙ্গে তীর্থভ্রমণে বের হয়েছিলেন। পথিমধ্যে তিনি মরণঘাতী গুটিবসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। রোগাক্রান্ত ও অজ্ঞান লালনকে তাঁর সঙ্গীরা মৃত ভেবে কালীগঙ্গা নদীর তীরে ফেলে রেখে নিজ নিজ গন্তব্যে চলে যায়।
মুমূর্ষু, ভাসমান লালনকে নদী থেকে উদ্ধার করেন সাঁধক মাওলানা মলম শাহ এবং তাঁর স্ত্রী মতিজান বিবি। এই মহীয়সী ও করুণাময় দম্পতি লালনকে পরম মমতায় সেবা-শুশ্রূষা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। গুটিবসন্তের নির্মম আক্রমণে লালন তাঁর একটি চোখ হারান এবং মুখে বসন্তের দাগ থেকে যায়। সুস্থ হওয়ার পর লালন যখন নিজ গ্রামে ফিরে যান, তখন সমাজ ও স্বজনেরা তাকে ‘জাত গিয়েছে’ বলে প্রত্যাখ্যান করে, কারণ তিনি এক মুসলিম পরিবারে অন্ন গ্রহণ করেছিলেন ও সেবা পেয়েছিলেন।
সমাজ কর্তৃক পরিত্যক্ত লালন পুনরায় ছেঁউড়িয়াতে ফিরে আসেন। পালিত পিতা-মাতা মলম শাহ ও মতিজান বিবি তাঁকে নিজের বাড়ির কাছেই জায়গা দেন, যেখানে লালন একটি কাঁচা ঘর তুলে বসবাস শুরু করেন। এই ছেঁউড়িয়াই পরবর্তীকালে বিশ্ববাউলদের পরম তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয়।

গুরু সিরাজ সাঁইয়ের সঙ্গ ও লালনের অশ্বারোহণ

ছেঁউড়িয়ায় অবস্থানকালেই লালনের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি ঘটে। তিনি সাক্ষাৎ পান দরবেশ সিরাজ সাঁইয়ের। সিরাজ সাঁই ছিলেন একজন উঁচুমার্গের সুফি সাধক। তাঁর সান্নিধ্যে এসে লালন আত্মতত্ত্ব ও দেহতত্ত্বের গভীর জ্ঞান লাভ করেন এবং সিরাজ সাঁইকে নিজের গুরু হিসেবে বরণ করে নেন। লালনের অসংখ্য গানে গুরু সিরাজ সাঁইয়ের প্রতি গভীর ভক্তি ও নিবেদনের উল্লেখ পাওয়া যায়:
“সিরাজ সাঁই বিবেচনা করে, / লালন তোমার হয় না রে একতরা।।”
লালন সম্পর্কে পাক্ষিক ‘হিতকরী’ (৩১ অক্টোবর ১৮৯০) পত্রিকার বিবরণ থেকে জানা যায়, সাঁইজী বার্ধক্যে উপনীত হয়েও অত্যন্ত শারীরিক সামর্থ্যের অধিকারী ছিলেন। তিনি অশ্বারোহণে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন এবং বৃদ্ধ বয়সেও ঘোড়ায় চড়ে বিভিন্ন দূর-দূরান্তের সাধুসঙ্গে ও শিষ্যাঙ্গনে যাতায়াত করতেন।

জাত-পরিচয় বিতর্ক ও বাস্তব সত্য

লালনের জাত পরিচয় নিয়ে তাঁর জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পরও গবেষণার অন্ত ছিল না। প্রথম লালন জীবনী রচয়িতা বসন্ত কুমার পাল ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় লিখেছিলেন: “সাঁইজি হিন্দু কি মুসলমান, এ কথা আমিও স্থির বলিতে অক্ষম।”
লালনের পরিচয় দিতে গিয়ে বিশিষ্ট গবেষক সুধীর চক্রবর্তী লিখেছেন:
“কাঙ্গাল হরিনাথ তাকে জানতেন, মীর মশাররফ তাকে চিনতেন, ঠাকুরদের হাউসবোটে যাতায়াত ছিল, লেখক রায় বাহাদুর জলধর সেন, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় তাকে সামনাসামনি দেখেছেন, গান শুনেছেন, তবু জানতে পারেন নি লালনের জাত পরিচয়, বংশধারা বা ধর্ম।”
ঔপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ‘মনের মানুষ’ উপন্যাসে লালনের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে যথার্থই বলেছেন:
“লালন ধার্মিক ছিলেন, কিন্তু কোনো বিশেষ ধর্মের রীতিনীতি পালনে আগ্রহী ছিলেন না। সব ধর্মের বন্ধন ছিন্ন করে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন জীবনে।”
লালন কোনো প্রথাগত হিন্দু বা মুসলিম আচার অনুসরণ করেননি। তিনি নিজ সাধনার বলে বেদ, উপনিষদ, পুরাণ এবং কুরআন, হাদিস, সুফিদর্শনের গভীর তত্ত্বজ্ঞান অর্জন করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সব মানুষের ভেতরে বাস করে এক ‘অধর মানুষ’ বা ‘মনের মানুষ’।
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪৯-১৯২৫) অঙ্কিত ফকির লালন সাঁইয়ের ঐতিহাসিক স্কেচ
জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪৯-১৯২৫) অঙ্কিত ফকির লালন সাঁইয়ের ঐতিহাসিক স্কেচ

৪. লালনের গান, সুর ও সাধনার ঐতিহাসিক দলিল

সংগীতের বাণী ও সুর-সুধার মাধ্যমে জীবদ্দশাতেই নিজের সাধনকথা প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করে গেছেন বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানাবতার ফকির লালন সাঁই। তথ্যের দুর্লভতা এবং কিছুটা অজ্ঞতার কারণেও লালন সাঁইকে অনেকে কেবল একজন সাধক কবির মধ্যে সীমায়িত করেন। কিন্তু ইতিহাস ও দলিল প্রমাণ করে, তিনি ছিলেন এক অনন্যসংগীতস্রষ্টা ও সাধক।
আমরা তিনটি মৌলিক প্রশ্ন ও ঐতিহাসিক উত্তরের মাধ্যমে সাঁইজির সংগীতচর্চার প্রামাণ্য ইতিহাস বিশ্লেষণ করব:

প্রশ্ন ১: ফকির লালন সাঁই কি নিজে গান পরিবেশন করতেন?

উত্তর: ঐতিহাসিক দলিল ও প্রামাণ্য সূত্র স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, লালন সাঁইজী কেবল গান রচয়িতাই ছিলেন না, তিনি নিজে পরম উন্মাদনায় গান পরিবেশন করতেন।
লালন সাঁইয়ের দেহত্যাগের মাত্র ১৪ দিন পর, ১২৯৭ বঙ্গাব্দের ১৫ কার্তিক (৩১ অক্টোবর ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দ) কুষ্টিয়ার লাহিনীপাড়া থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক ‘হিতকরী’ পত্রিকায় প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে ‘মহাত্মা লালন ফকির’ শিরোনামে একটি ঐতিহাসিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেই প্রতিবেদনে লেখা হয়:
“লালন ফকীরের নাম এ অঞ্চলে কাহারও শুনিতে বাকী নাই। শুধু এ অঞ্চলে কেন, পূর্বে চট্টগ্রাম, উত্তরে রঙ্গপুর, দক্ষিণে যশোহর এবং পশ্চিমে অনেক দূর পর্যন্ত বঙ্গদেশের ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বহুসংখ্যক লোক এই লালন ফকীরের শিষ্য; শুনিতে পাই ইঁহার শিষ্য দশ হাজারের উপরে।”
একই প্রতিবেদনে লালন সাঁইয়ের অন্তিম মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে সম্পাদক/প্রতিবেদক লেখেন:
“পীড়িতকালেও পরমেশ্বরের নামে পূর্ববৎ সাধন করিতেন; মধ্যে মধ্যে গানে উন্মত্ত হইতেন। ধর্মের আলাপ পাইলে নববলে বলীয়ান হইয়া রোগের যাতনা ভুলিয়া যাইতেন। এই সময়ের রচিত কয়েকটি গান আমাদের নিকট আছে। অনেক সম্প্রদায়ের লোক ইঁহার সহিত ধর্মালাপ করিয়া তৃপ্ত হইতেন। মরণের পূর্বের রাত্রিতেও প্রায় সমস্ত সময় গান করিয়া রাত্রি ৫টার সময় শিষ্যগণকে বলেন ‘আমি চলিলাম’।”
এই বিবরণ প্রমাণ করে, সংগীতেই ছিল লালনের প্রাণ। তিনি অসুস্থ অবস্থাতেও গানে মেতে উঠতেন।
লালনপন্থী সাধক ফকির আনোয়ার হোসেন মন্টু শাহ্ সাঁইজির শেষ মুহূর্তের এক মর্মস্পর্শী বর্ণনা দিয়েছেন। মৃত্যুর আগের রাতে সাঁইজী শিষ্যদের ডেকে বলেন, “শোনো, আমি তোমাদের একটা গান শোনাব। মনিরুদ্দিন, তুমি গানটি লিপিবদ্ধ করো।”
শিষ্যরা ভাবল, সাঁইজী হয়তো বার্ধক্যে পৌছে গেছেন, আর গান গাইবেন না। আজ শেষ গান শোনাবেন। সাঁইজী পরম আকুলতায় সুর করে গাইতে শুরু করলেন:
“পার কর হে দয়াল চাঁদ আমারে। / ক্ষম হে অপরাধ আমার এ ভব কারাগারে। / পাপী অধম জীব হে তোমার / তুমি যদি না কর পার / দয়া প্রকাশ করে; / পতিত পাবন পতিত নাশন / কে বলবে আর তোমারে।।”
গানের শেষ কলি গাইতে গিয়ে আস্তে করে গান শেষ করলেন, তারপর চাদর মুড়ি নিয়ে নীরব হয়ে গেলেন। অতি নিকটে থেকেও তাঁর শিষ্যরা বুঝতে পারল না যে, তাঁদের প্রাণপ্রতিম ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ির গানের পাখিটি তাঁর শেষ গানের শেষ কলি গাইতে গাইতেই ইহলীলা সাঙ্গ করে চলে গেলেন!

প্রশ্ন ২: লালন সাঁইয়ের গানের কোনো মূল পাণ্ডুলিপি আছে কি না?

উত্তর: হ্যাঁ, লালন সাঁইয়ের গানের প্রত্যক্ষ পাণ্ডুলিপি ও অনুলিপি বিদ্যমান রয়েছে।
লালন সাঁই মুখে মুখে গান রচনা করতেন এবং নিজ মুখে সুর দিতেন। তাঁর সাক্ষাৎ শিষ্যরা (যেমন পণ্ডিত মনিরুদ্দিন শাহ্) সাঁইজির মুখ থেকে শোনামাত্রই সেই গান খাতায় লিপিবদ্ধ করে রাখতেন।
সাঁইজির জীবদ্দশাতেই তাঁর গানের পাণ্ডুলিপি তৈরি ও প্রকাশের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল।
১. প্রথম মুদ্রিত গান (জীবদ্দশায়): ১২৯২ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণে (১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে) কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে কাঙাল হরিনাথ মজুমদার প্রণীত ও কাঙ্গাল ফিকিরচাঁদ ফকীর সম্পাদিত ‘কাঙ্গালের ব্রহ্মা-বেদ: আত্ম ও সাধনতত্ত্ব’ গ্রন্থের ‘উপাসনা’ অংশে লালন সাঁইয়ের “কে বোঝে সাঁইয়ের লীলাখেলা” গানটি মুদ্রিত হয়। এটিই লালনের জীবদ্দশায় মুদ্রিত প্রথম গান।
২. মৃত্যুর পর প্রথম মুদ্রিত গান: ১৮৯০ সালের ৩১ অক্টোবর ‘হিতকরী’ পত্রিকায় সাঁইজির দেহত্যাগের সংবাদের সাথে মুদ্রিত হয় “সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে” গানটি।
৩. মূল পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ: লালনের সাক্ষাৎ শিষ্যদের হাতে লেখা মূল গানের খাতা বা পাণ্ডুলিপি গুরু-শিষ্য পরম্পরায় কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া, ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলের লালনপন্থী সাধকদের অন্দরমহলে সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালনের আখড়া থেকে ২৯৮টি গানের একটি পাণ্ডুলিপি অনুলিপি করিয়ে নিয়েছিলেন, যা বর্তমানে বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রভবনে সংরক্ষিত আছে।

প্রশ্ন ৩: লালন সাঁইয়ের সব গানের সুর ও বাণী সংরক্ষিত আছে কি না?

উত্তর: লালনের গানের মূল প্রামাণ্য সংখ্যা সাকল্যে প্রায় ৬৫০টি। এই গানগুলোর বাণী ও ঐতিহ্যবাহী আদি সুর সংরক্ষণের একটি দীর্ঘ ও ঐতিহাসিক যাত্রা রয়েছে।
  • প্রথম স্বরলিপি: লালনের গানের প্রথম স্বরলিপি করেন রবীন্দ্রনাথের ভাগিনী, প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী। তিনি জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পাদিত ‘বীণা-বাদিনী’ পত্রিকার ১৩০৫ বঙ্গাব্দের (১৮৯৮-৯৯ খ্রিষ্টাব্দ) মাঘ-ফাল্গুন সংখ্যায় লালনের দুটি গান—“ক্ষম অপরাধ ও দীননাথ” এবং “কথা কয় কাছে দেখা যায় না”—এর স্বরলিপি প্রকাশ করেন।
  • সুধীন দাসের ঐতিহাসিক উদ্যোগ: ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে সংগীতসাধক সুধীন দাস লালনের আদি সুর সংরক্ষণে উদ্যোগী হন। তিনি লালনসংগীত বিশারদ খোদাবক্শ সাঁই-এর কণ্ঠ থেকে ১৯৮৩-৮৪ সালে শতাধিক গান রেকর্ড করেন এবং ১৯৮৬ ও ২০০৭ সালে ৭০টি গানের স্বরলিপি গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন।
  • আন্তর্জাতিক আর্কাইভ ও রেকর্ডিং: ১৯৮০-র দশক থেকে আমেরিকার ড. ক্যারোল সলোমন, জাপানের মাসাইয়্যুকি ওনিশি, আজাদ রহমান, তপন মজুমদার প্রমুখ গবেষক খোদাবক্শ সাঁই, মকছেদ আলী সাঁই, মহিন শাহ, করিম শাহের মতো সাধকদের কণ্ঠ থেকে শত শত গান রেকর্ড করেন। ড. ক্যারোল সলোমনের রেকর্ডিংগুলো বর্তমানে সিয়াটলের ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের এথনোমিউজিকোলজি ডিজিটাল আর্কাইভে নিরাপদ রয়েছে।
  • রঙ্গন মোমেনের বিশাল আর্কাইভ: ২০০১ থেকে ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত লন্ডনপ্রবাসী রঙ্গন মোমেন বৃহত্তর কুষ্টিয়ার সাধকদের কাছ থেকে ৩,০০০ গানের অডিও রেকর্ড করেন, যার মধ্যে লালনের প্রায় ৬৫০টি গানের আদি সুর ও বাণী সংরক্ষিত রয়েছে।
বসন্তকুমার পাল ১৩৩২ বঙ্গাব্দে (১৯২৫) ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় লিখেছিলেন, সাঁইজির যখন গানের ভাব জাগত, তিনি শিষ্যদের বলতেন, “ওরে আমার পোনা মাছের ঝাঁক এসেছে।” শিষ্যরা ছুটিয়া আসত, সাঁইজি গান ধরতেন আর শিষ্যরা তা খাতায় লিখে নিত ও মুখে মুখে গাইতে থাকত। বাণী ও সুরকে লালন কখনোই আলাদা করেননি, দুটোই একসঙ্গে প্রস্ফুটিত হয়েছিল।
লালন সাঁইজীর মাজারের পুরনো ছবি
লালন সাঁইজীর মাজারের পুরনো ছবি

৫. বাউল সম্রাট ও “মহাত্মা” উপাধির অনন্য ইতিহাস

ফকির লালন সাঁইকে আমরা আজ ‘বাউল সম্রাট’ কিংবা ‘মহাত্মা’ বলে ডাকি। কিন্তু অনেকেই জানেন না, ভারতীয় উপমহাদেশে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে ‘মহাত্মা’ উপাধি দেওয়ার ঠিক ২৫ বছর আগে আমাদের লালন সাঁইজীকে ‘মহাত্মা’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল!
১৮৯০ সালের ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত পাক্ষিক ‘হিতকরী’ পত্রিকায় সাংবাদিক রাইচরণ দাস তাঁর নিবন্ধের শিরোনাম দিয়েছিলেন—‘মহাত্মা লালন ফকির’। এটিই লিখিত ইতিহাসে লালনের নামের পূর্বে ‘মহাত্মা’ ব্যবহারের প্রথম প্রামাণ্য দলিল।
লালনের একটি প্রামাণ্য প্রতিকৃতি বা চিত্র নিয়েও রয়েছে ঐতিহাসিক ইতিহাস। ১৮৮৯ সালের ৫ মে, শিলাইদহের পদ্মা নদীতে ভেসে থাকা ঠাকুর পরিবারের ‘পদ্মা বোটে’ বসে চিত্রশিল্পী জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর (রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা) লালন সাঁইজির একটি পেনসিল স্কেচ আঁকেন। এটিই লালনের জীবদ্দশায় আঁকা একমাত্র প্রামাণ্য স্কেচ, যা বর্তমানে ভারতের যাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। এই স্কেচে দেখা যায় এক বৃদ্ধ সাধক—দাঁড়ি, চুল ও চাদরে আবৃত এক পরম গম্ভীর মানবিক সত্তা।
২০০৫ সালের ২৭ নভেম্বর ইউনেস্কো (UNESCO) বাউল গানকে “Masterpiece of the Oral and Intangible Heritage of Humanity” (মানবতার মৌখিক ও বিমূর্ত ঐতিহ্যের অনন্য মাস্টারপিস) হিসেবে ঘোষণা করে। এর মাধ্যমে লালন সাঁইজির গান ও বাউল দর্শন বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদায় ভূষিত হয়।

৬. বিশ্বপরিমণ্ডলে লালন: আন্তর্জাতিক প্রভাব ও অনুবাদকগণ

লালন সাঁইজি কেবল কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া বা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকেননি। তাঁর সুর ও দর্শন কাঁটাতার পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়।

রবীন্দ্রনাথ ও অ্যালেন গিন্সবার্গ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর অক্সফোর্ডের বিখ্যাত ‘হিবার্ট বক্তৃতায়’ (Hibbert Lectures) লালনের দর্শন বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছিলেন। মার্কিন ‘বিট জেনারেশন’-এর প্রখ্যাত কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ (Allen Ginsberg) ১৯৬০-এর দশকে ভারতে এসে লালনের দর্শনে গভীরভাবে প্রভাবিত হন। তিনি লালনের কাব্যশৈলী অনুকরণ করে “After Lalon” নামে একটি বিখ্যাত কবিতা রচনা করেন।

ড. ক্যারোল সলোমন ও ‘City of Mirrors’

মার্কিন গবেষক ড. ক্যারোল সলোমন (১৯৪৮-২০০৯) লালনের টানে বারবার বাংলাদেশে ছুটে এসেছেন। তিনি বাউলদের আখড়ায় ঘুরে লালনের গানের প্রামাণ্য পাঠ নির্ণয় ও ইংরেজি অনুবাদে জীবন উৎসর্গ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর, তাঁর সংগৃহীত ও অনূদিত ১৩৭টি গান নিয়ে নিউইয়র্কের মর্যাদাপূর্ণ অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় দ্বিভাষিক গ্রন্থ:
“City of Mirrors: Songs of Lalon Sai”
এই গ্রন্থটি সম্পাদনা করেন গবেষক সাইমন জাকারিয়া এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জিয়ান ওপেনশাও। এটি বিশ্বসাহিত্যে লালন চর্চায় এক অমূল্য সংযোজন।

অন্যান্য আন্তর্জাতিক উদ্যোগ

  • মুচকুন্দ দুবে: ভারতের সাবেক কূটনীতিক ও গবেষক মুচকুন্দ দুবে লালনের ১০৫টি গান হিন্দিতে অনুবাদ করে দিল্লি সাহিত্য একাডেমি থেকে প্রকাশ করেন ‘লালন শাহ ফকির কী গীত’ নামে।
  • দেবযানি চহলিহা: মণিপুরি নৃত্যের কিংবদন্তি দেবযানি চহলিহা লালনের গান অসমীয়া ভাষায় অনুবাদ করেন (লালন সাঁইর গীত)।
  • অন্যান্য বিদেশী গবেষক: মাসাহিকো তোগাওয়া (জাপান), ব্রাদার জেমস, ফাদার মারিনো রিগন প্রমুখ বিভিন্ন ভাষায় লালন দর্শন ছড়িয়ে দিয়েছেন।

৭. সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র ও শিল্পকলায় লালন সাঁই

লালনের জীবন ও দর্শন বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে গভীরভাবে উর্বর করেছে। বহু কবি, ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার লালনকে কেন্দ্র করে শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেছেন।
  • উপন্যাস:
    • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় রচনা করেন বিখ্যাত উপন্যাস ‘মনের মানুষ’
    • রণজিৎ কুমার রচনা করেন ‘সেনবাউল রাজারাম’
    • পরেশ ভট্টাচার্য লেখেন ‘বাউল রাজার প্রেম’
  • ছোটগল্প: সুনির্মল বসু (১৯৩৬) লেখেন ‘লালন ফকিরের ভিটে’ এবং শওকত ওসমান (১৯৬৪) রচনা করেন ‘দুই মুসাফির’
  • নাটক: ড. সাইমন জাকারিয়া লালনের প্রামাণ্য জীবনের ওপর ভিত্তি করে রচনা করেন বিখ্যাত নাটক ‘উত্তরলালনচরিত’
  • চলচ্চিত্র ও তথ্যচিত্র:
    • ১৯৭২ সালে সৈয়দ হাসান ইমাম পরিচালনা করেন চলচ্চিত্র ‘লালন ফকির’
    • ১৯৮৬ সালে শক্তি চট্টোপাধ্যায় একই নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।
    • ১৯৮৮ সালে এম. হামিদ নির্মাণ করেন তথ্যচিত্র ‘দ্যাখে কয়জনা’
    • ১৯৯৬ সালে তানভীর মোকাম্মেল নির্মাণ করেন বিখ্যাত তথ্যচিত্র ‘অচিন পাখি’ এবং ২০০৪ সালে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘লালন’ (যেখানে লালনের চরিত্রে অভিনয় করে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান রাইসুল ইসলাম আসাদ)।
    • ২০১০ সালে গৌতম ঘোষ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করেন ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনায় ‘মনের মানুষ’
    • ২০১১ সালে হাসিবুর রেজা কল্লোল নির্মাণ করেন বাউল জীবনভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘অন্ধ নিরাঙ্গম’

৮. লালন গবেষকদের দৃষ্টিতে সাঁইজির দর্শন ও বর্তমান সংকট

লালনকে চেনার ও জানার জন্য বহু পণ্ডিত ও গবেষক তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছেন।
  • শ্রীবসন্ত কুমার পাল, মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন (হারামনি), কবি জসীমউদ্দীন, ড. উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, ড. আনোয়ারুল করীম, ড. আবুল আহসান চৌধুরী, আহমদ শরীফ, অন্নদাশঙ্কর রায়, সুধীর চক্রবর্তী, শক্তিনাথ ঝা, সাইমন জাকারিয়া প্রমুখ গবেষক প্রাণান্ত শ্রম দিয়ে লালন চর্চাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
কিন্তু বর্তমান সময়ে লালন চর্চা ও বাউল ঐতিহ্য এক গভীর সংকটের মুখোমুখি।
১. বাণিজ্যিকীকরণ ও সুর বিকৃতি: মিডিয়া ও বাণিজ্যিক মঞ্চে লালনের গানের ভাব, সাধনা ও ঐতিহ্যগত আদি সুর পরিবর্তন করে বিকৃত করার অপচেষ্টা চলছে।
২. ভুয়া পদের প্রচার: বহু বেনামী বা অন্যের রচিত গানকে লালনের নামে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।
৩. মৌলবাদী আক্রমণ: ড. উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য যথার্থই বলেছিলেন, শরীয়তবাদী ও উগ্র মানসিকতার মানুষেরা লালনকে কোনোদিনই ভালো চোখে দেখেনি। আজও বিভিন্ন স্থানে বাউলদের ওপর হামলা, চুল কেটে দেওয়া বা বাউল আখড়া ভেঙে দেওয়ার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটে।
আইনগ্রন্থ প্রণেতা সিরাজ প্রামাণিক বলেছেন, লালন হলেন বাঙালির মানবিকতার মহান আইকন। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দিব্যদ্যুতি সরকার এবং গবেষক কাজল রশীদ শাহীন যথার্থই উল্লেখ করেছেন, লালন এখন আর কেবল ছেঁউড়িয়ায় সীমাবদ্ধ নন, তিনি বিশ্ব অভিবাসনের যুগে সর্বজনীন আত্মিক শান্তির প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।
কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালনের আখড়ায় রক্ষিত রঙিন প্রতিকৃতি
কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালনের আখড়ায় রক্ষিত রঙিন প্রতিকৃতি

পথ হারালে ফিরে আসতেই হবে সাঁইজির ধামে

কুমারখালীর সন্তান হিসেবে, এই মাটির রক্ত ও ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে আমি সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই—আমাদের অস্তিত্বের মূল শক্তিই হলো এই বহুত্ববাদ, আমাদের এই অসাম্প্রদায়িক চেতনা।
ফকির লালন সাঁইজী আমাদের কোনো সংকীর্ণ ধর্মীয় গণ্ডির মধ্যে আঁটকে রাখেননি। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে সব ভেদাভেদ ভুলে মানুষকে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে অন্তরের ‘মনের মানুষ’-কে জাগ্রত করতে হয়।
আজ দোলপূর্ণিমার এই পুণ্য তিথিতে, সাঁইজির স্মরণে আমাদের শপথ নিতে হবে:
আমরা কুমারখালী তথা সমগ্র বাংলাদেশের মাটিকে কোনো মৌলবাদী, উগ্র বা বৈষম্যবাদী অপশক্তির হাতে কলঙ্কিত হতে দেব না। আমাদের পূর্বপুরুষ কাঙ্গাল হরিনাথ, মীর মোশাররফ, রবীন্দ্রনাথ এবং লালন সাঁই যে অসাম্প্রদায়িকতার রক্তিম মশাল আমাদের হাতে তুলে দিয়ে গেছেন—তা আমরা চিরকাল প্রজ্বলিত রাখব।
জীবন ও রাজনীতির ঝোড়ো হাওয়ায় যখনই আমরা দিকবিদিক শূন্য হয়ে পড়ব, যখনই ঘৃণা ও হানাহানি আমাদের অন্ধ করে দিতে চাইবে—তখনই আমাদের তাকাতে হবে ওই দূর আকাশের দিকে, যেখানে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছেন আমাদের গাইডিং স্টার—ফকির লালন সাঁই। পথ হারালেই আমাদের ফিরে যেতে হবে সাঁইজীর ছেঁউড়িয়ার ধামে, তাঁর বাণীর কাছে, তাঁর সুরের কাছে। তিনিই আমাদের পথ দেখাবেন।
জয় হোক মানুষের, জয় হোক অসাম্প্রদায়িক বহুত্ববাদের!
সাঁই দয়াময়।
সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

সুফি ফারুক ইবনে আবুবকর

Tags :

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।