গান গাই আমার মনরে বুঝাই লিরিক্স | Gan gai amar moner bujhia lyrics | শাহ আব্দুল করিম

বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের সাধনামূলক ও আত্মনিবেদনধর্মী সৃষ্টির মধ্যে “গান গাই আমার মনরে বুঝাই” এক অনন্য লোকসংগীত। বাউল দর্শনে গান কেবল সুরের বিনোদন নয়, বরং তা চঞ্চল ও বিভ্রান্ত মনকে বশে আনার প্রধান উপায় এবং পরমাত্মার সাথে যোগাযোগের সেতু। সুরের ভেতরেই নিজের জপমালা, পরম প্রেম এবং অস্তিত্বের সার্থকতা খুঁজে পাওয়ার এক নিখাদ আর্তি এই গানের ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে।

গানের বিস্তারিত তথ্য

তথ্যবিবরণবিস্তারিত তথ্য
গানের নামগান গাই আমার মনরে বুঝাই
গীতিকার ও সুরকারশাহ আবদুল করিম
সংগীতধারাবাউল সংগীত / মরমি ও দেহতত্ত্ব
মূল উপজীব্যসংগীতকে সাধনার মাধ্যম জ্ঞান, মনের স্থিরতা ও ঐশ্বরিক বিরহ
আঞ্চলিক প্রভাবভাটি অঞ্চল (সুনামগঞ্জ, সিলেট)
গ্রন্থ / সংকলনশাহ আবদুল করিম রচনাসমগ্র

গান গাই আমার মনরে বুঝাই লিরিক্স

গান গাই আমার মনরে বুঝাই
মন থাকে পাগলপারা
আর কিছু চায়না মনে গান ছাড়া ।।

গানে বন্ধুরে ডাকি গানে প্রেমের ছবি আঁকি
পাব বলে আশা রাখি না পাইলে যাব মারা
আর কিছু চায়না মনে গান ছাড়া ।।

গান আমার জপমালা গানে খুলে প্রেমের তালা
প্রাণ বন্ধু চিকন কালা অন্তরে দেয় ইশারা
আর কিছু চায়না মনে গান ছাড়া ।।

ভাবে করিম দ্বীনহীন আসবে কি আর শুভদিন
জল ছাড়া কি বাঁচিবে মীন ডুবলে কি ভাসে মরা
আর কিছু চায়না মনে গান ছাড়া ।।

Gaan Gai Amar Monre Bujhai Lyrics

Gaan gai amar monre bujhai
Mon thake pagolpara
Ar kichu chayna mone gaan chara.

Gane bondhure daki gane premer chhobi aki
Pabo bole asha rakhi na paile jabo mara
Ar kichu chayna mone gaan chara.

Gaan amar jopmala gane khule premer tala
Pran bondhu chikon kala ontore dey ishara
Ar kichu chayna mone gaan chara.

Bhave Karim dinhin asbe ki ar shubhodin
Jol chara ki banchibe min duble ki bhase mora
Ar kichu chayna mone gaan chara.

গানের মূল ভাব

“গান গাই আমার মনরে বুঝাই” গানটির মূল নির্যাস হলো সংগীতের মাধ্যমে মানবমনকে বশীভূত করা এবং পরমাত্মার সান্নিধ্য অন্বেষণ। মানুষের ইন্দ্রিয়পরায়ণ মন স্বভাবতই অস্থির ও ‘পাগলপারা’। পার্থিব কোনো সম্পদ বা যুক্তিতে এই মন শান্ত হতে চায় না; একমাত্র সুরের আরাধনাই পারে তাকে স্থির করতে।
বাউল সাধকের কাছে গান হলো ‘জপমালা’ অর্থাৎ জপ-তপের সমতুল্য। সুরের মাধ্যমেই হৃদয়ের গোপন দরজার ‘প্রেমের তালা’ খুলে যায় এবং অন্তরের গভীরে বসে থাকা পরম সত্তা (‘চিকন কালা’) ইশারা প্রদান করেন। জল ছাড়া মাছ যেমন বাঁচে না, সুর ও পরমাত্মার সান্নিধ্য ছাড়া সাধকের অস্তিত্বও তেমনই অর্থহীন—গানটিতে এই গভীর আত্মিক সত্যই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

চরণ ও স্তবক বিশ্লেষণ

১. মনের অস্থিরতা ও সুরের আশ্রয়

  • “গান গাই আমার মনরে বুঝাই / মন থাকে পাগলপারা / আর কিছু চায় না মনে গান ছাড়া॥”
    মানুষের মন প্রতিনিয়ত পার্থিব মোহের দিকে ধাবিত হয়। সাধক সেই চঞ্চল মনকে প্রবোধ দেওয়ার জন্য গানের শরণাপন্ন হন। একপর্যায়ে সুর ছাড়া অন্তরের আর কোনো ক্ষুধা অবশিষ্ট থাকে না।

২. সংগীতের মাধ্যমে রূপের আরাধনা

  • “গানে বন্ধুরে ডাকি গানে প্রেমের ছবি আঁকি / পাব বলে আশা রাখি না পাইলে যাব মারা…”
    গান এখানে ঈশ্বরের সাথে কথোপকথনের ভাষা। সুরের আলপনা দিয়ে হৃদয়ের ক্যানভাসে তিনি প্রিয়তমের রূপ কল্পনা করেন। পরমকে পাওয়ার এই আশা ভঙ্গ হলে সাধকের আত্মিক মৃত্যু অবধারিত।

৩. জপমালা ও অন্তরের উন্মোচন

  • “গান আমার জপমালা গানে খুলে প্রেমের তালা / প্রাণ বন্ধু চিকন কালা অন্তরে দেয় ইশারা…”
    প্রথাগত ধর্মীয় আচার বা মালা ঘোরানোর চেয়ে সাধক নিজের রচিত গানকেই পরম জপমালা মনে করেন। বৈষ্ণব ধারার ‘চিকন কালা’ (শ্রীকৃষ্ণ বা পরমাত্মা)-র রূপক ব্যবহার করে বোঝানো হয়েছে যে, সঠিক সুরে হৃদয় সঁপে দিলেই ভেতর থেকে ঐশ্বরিক সাড়া মেলে।

৪. জল ও মীনের চিরন্তন রূপক

  • “ভাবে করিম দ্বীনহীন আসবে কি আর শুভদিন / জল ছাড়া কি বাঁচিবে মীন ডুবলে কি ভাসে মরা…”
    ভণিতায় সাধক নিজেকে সম্পূর্ণ নিঃস্ব ও দীন হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। নদী বা জলের সাথে মাছের যে সম্পর্ক, সাধকের সাথে পরমাত্মার সম্পর্কও ঠিক তাই। জল ছাড়া মাছ যেমন ছটফট করে প্রাণ হারায়, পরম প্রেমের ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হলে বাউলের বেঁচে থাকা অসম্ভব।

গানের সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

  • ঐতিহ্যবাহী রূপকের ব্যবহার: ‘জপমালা’, ‘প্রেমের তালা’ এবং ‘জল ও মীন’-এর মতো প্রাচীন মরমি ও বৈষ্ণব রূপকগুলোকে সহজ গ্রামীণ ভাষার আবহে নতুন ব্যঞ্জনা দেওয়া হয়েছে।
  • সহজিয়া দর্শন: কোনো জটিল তাত্ত্বিক কচকচানি ছাড়াই সুরের সাথে আত্মার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের কথা প্রাঞ্জলভাবে ব্যক্ত হয়েছে।
  • ভণিতা ও দৈন্যভাব: পদাবলী ও বাউল রীতির অনুকরণে নিজের নাম ব্যবহার করে অহংকারহীন এক সমর্পিত ভাব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

সংগীততাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য

  • ভাটি সুরের উদাসীনতা: গানটি প্রথাগত বাউল সুরের শান্ত ও প্রবহমান লয়ে গীত হয়।
  • লোকজ বাদ্যযন্ত্রের সংমিশ্রণ: একতারা, দোতারা, মন্দিরা ও ঢোলের হালকা ও মিষ্টি ছন্দে গানটি পরিবেশন করা হয়, যা শ্রোতার অন্তরে এক আত্মমগ্ন পরিবেশ সৃষ্টি করে।

সাংস্কৃতিক গুরুত্ব

২০০১ সালে একুশে পদকপ্রাপ্ত বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের এই গানটি বাউল ঐতিহ্যের মূল দর্শনকে ধারণ করে। লালন সাঁইয়ের পর বিংশ শতাব্দীতে সাধারণ মেঠো সুরের মাধ্যমে গভীর মানবদর্শন ও আধ্যাত্মিক আর্তি প্রকাশের যে ধারা করিম বজায় রেখেছিলেন, এই গানটি তারই এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

উৎস ও তথ্যসূত্র

  1. শাহ আবদুল করিম রচনাসমগ্র, ড. জাফর আহমেদ খান ও বইপত্র, সিলেট।
  2. শাহ আবদুল করিম স্মারকগ্রন্থ, সম্পাদনা: সুমনকুমার দাশ, অন্বেষা প্রকাশন।
  3. বাংলা বাউল সাহিত্যের ইতিহাস ও উপাদান, লোকসংস্কৃতি গবেষণা বিভাগ।

 

 

Tags :

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

জনপ্রিয় খবর

জনপ্রিয় বিভাগ

আমাদের সম্পর্কে

সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN হলো সংগীতপ্রেমীদের জন্য একটি অনলাইন জ্ঞান ও তথ্যভান্ডার। এখানে থাকছে গানের কথা ও বাণী, শিল্পী ও সংগীত ব্যক্তিত্বের তথ্য, গানের ধরন, সংগীত শিক্ষা, ইতিহাস, রিভিউ এবং সংগীতজগতের সাম্প্রতিক নানা বিষয়। সংগীতকে জানা, শেখা ও ভালোবাসার একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।

ইমেইল করুন:

Press Release: pr@bn.musicgoln.com

Complaint: complaint@bn.musicgoln.com

Contact: +8801775895618

© ২০২৬ সঙ্গীত গুরুকুল, GOLN। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।