১৭ নভেম্বর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক অনন্য নাম উস্তাদ ইমরাত খানেরর জন্মবার্ষিকী। নিভৃত ও মেধাবী এই শিল্পী তাঁর নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা এবং গভীরতার মাধ্যমে নিজেকে সময়াতীত এক মহারথীর আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ইমদাদখানি বা ইটাওয়া ঘরানার অন্যতম প্রধান সাধক হিসেবে তিনি শুধু একজন স্বনামধন্য সেতারবাদকই ছিলেন না; সমকালীন সুরবাহার শিল্পীদের মধ্যেও তিনি ছিলেন শীর্ষস্থানীয়, যে বাদ্যযন্ত্রকে তিনি নতুন মর্যাদায় বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
উস্তাদ ইমরাত খান ১৯৩৫ সালের ১৭ নভেম্বর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই মনে হয়েছিল, সঙ্গীত যেন তাঁকে নিজের সবচেয়ে নিবেদিত রক্ষকের দায়িত্ব দিয়েছে। তাঁর পরিবার ছিল শাস্ত্রীয় সংগীতের পরিমণ্ডলে সুপ্রসিদ্ধ—তাঁর বাবা উস্তাদ ইনায়াত খাঁ এবং বড় ভাই উস্তাদ বিলায়েত খাঁ দু’জনেই ছিলেন অসাধারণ শিল্পী। এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠার ফলে তিনি শুধু সঙ্গীত শিখেননি; বরং সঙ্গীতকে জীবনযাপনের মতো করে বেঁচে ছিলেন।
অনেক সমকালীন শিল্পীর থেকে তাঁকে আলাদা করেছে তাঁর দুইটি দুর্বোধ্য বাদ্যযন্ত্র—সেতার ও সুরবাহার—উভয়ের চমৎকার দক্ষতা। গভীর ও ধ্যানমগ্ন সুরের সুরবাহার আজকাল খুব কমই শোনা যায়; কিন্তু তাঁর হাতে এ বাদ্যযন্ত্র যেন নিজস্ব এক অনুভূতির জগৎ তৈরি করত। তাঁর ধীর, মননশীল আলাপ, বিস্তৃত মীড় এবং বাজনায় আধ্যাত্মিক গভীরতা সুরবাহারকে বিশেষ অর্থবহ অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিল।
তাঁর প্রভাব ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে। তিনি দীর্ঘ সময় বিদেশে শিক্ষকতা করেন এবং বিভিন্ন দেশের ছাত্রছাত্রীদের ভারতীয় রাগসংগীতের সূক্ষ্মতা পরিচয় করিয়ে দেন।
এভাবে তিনি শুধু পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারক নয়; বরং ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের এক আন্তর্জাতিক দূত হয়ে ওঠেন।
তাঁর ছাত্ররা আজও স্মরণ করেন তাঁর শান্ত, অন্তর্মুখী ব্যক্তিত্বকে। তাঁর চরিত্রের স্বভাব ছিল তাঁর সঙ্গীতের মতো—নম্র কিন্তু দৃঢ়, চিন্তাশীল কিন্তু নিবেদিত। তাঁর কাছে সঙ্গীত ছিল শুধু পেশা নয়; বরং আত্মোর্ধ্ব অনুসন্ধানের এক পথ।
সন্মান ও স্বীকৃতি—তবে তাঁর প্রাপ্য আরও বেশি ছিল
বহু সংগীতবোদ্ধা মনে করেন, উস্তাদ ইমরাত খান রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আরও বেশি পাওয়ার যোগ্য ছিলেন। তবে একজন শিল্পীর প্রকৃত পরিচয় পুরস্কারে নয়; বরং তাঁর রেখে যাওয়া সুরের উত্তরাধিকারেই নিহিত থাকে—যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ছড়িয়ে পড়ে।
২০১৮ সালে তাঁর প্রয়াণের মাধ্যমে এক যুগ নিঃশব্দে শেষ হয়। তবে প্রকৃত শিল্পীরা কখনও হারিয়ে যান না। তাঁদের সুর থেকে যায়—রেকর্ডিংয়ে, ছাত্রদের মধ্যে, আর অসংখ্য শ্রোতার হৃদয়ে।
জন্মবার্ষিকীতে আমরা উস্তাদ ইমরাত খানকে স্মরণ করি—
একজন গুরু হিসেবে,
একজন অনুসন্ধানী হিসেবে,
একজন ঐতিহ্যের রক্ষক হিসেবে,
এবং সর্বোপরি—
একজন কালজয়ী শিল্পী হিসেবে।
উস্তাদ ইমরাত খান শুধু সঙ্গীত বাজাননি—তিনি একাগ্র মন নিয়ে সঙ্গীতকে জীবনের মতো করে ধারণ করেছিলেন।
